kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চীন-বাংলা

২৫০০ বছরের বন্ধুত্ব

আপেল মাহমুদ   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



২৫০০ বছরের বন্ধুত্ব

১৯৫৬ সালে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই বাংলাদেশ সফরে এলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সৌজন্যে স্বাগত বক্তব্য দেন

চীনের সঙ্গে তৎকালীন বঙ্গভূখণ্ডের সুসম্পর্ক কয়েক হাজার বছরের। সেই অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

দুই ভূখণ্ডের শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিনিময় ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। গতকাল শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছেন। তাঁর এই সফরে দুই দেশের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদের ভিতই শক্ত হবে না, ঐতিহাসিক আড়াই হাজার বছরের বন্ধুত্বের পথ আরো সুগম হবে।

চীন-বাংলার সম্পর্কের সূত্রপাত করেছিলেন চীনা পর্যটক ফা হিয়েন। তিনি চীনের পূর্বাঞ্চলের চীন রাজবংশের ভিক্ষু ছিলেন। ৩৯৯ সালে ৬৩ বছর বয়সে তিনি ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় সিল্পক রোড’ ধরে চীনের ছাং আন প্রদেশ থেকে বাংলার উদ্দেশে রওনা হন। ওই রোডটি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। তিনিই চীনের প্রথম ব্যক্তি যিনি আজকের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। তিনি বাংলায় দুই বছর অবস্থান করে বুদ্ধের উপাসনা ও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। এ সময় বঙ্গ অঞ্চলে ৩০টি বৌদ্ধ মঠ এবং প্রায় দুই হাজার ভিক্ষু ছিলেন।

দ্বিতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে চীনের থাং রাজবংশের ধর্মগুরু হিউয়ান সাং ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন বৌদ্ধ ধর্মের পাঠ গ্রহণ করতে। তিনি বাংলায় পাঁচ বছর অবস্থান করে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বাসিন্দা বৌদ্ধ ধর্মের মহাপণ্ডিত শীলভদ্রের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর লেখা ‘গ্রেট থাং রেকর্ডস অন দি ওয়েস্টার্ন রিজিয়নস’ গ্রন্থে শীলভদ্র সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মের হাদিসে বর্ণিত আছে—‘জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন যাও। ’ কিন্তু ইসলাম ধর্ম প্রচারের আগে চীন দেশের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের জন্য বাংলাদেশে আসতেন। ধর্মভিক্ষু ফা হিয়েন দুই বছর এবং হিউয়ান সাং ১৭ বছর বাংলায় অবস্থান করে তার প্রমাণ দিয়েছেন।

চীনা ভিক্ষুদের কাছে তৎকালীন বাংলা ছিল ‘ওয়েস্টার্ন হেভেন’। যার টানে ই জিং নামে আরেকজন পর্যটক এখানে ভ্রমণে এসেছিলেন। ৬১৭ সালে তিনি চীন থেকে বাংলায় রওনা করেন। এরপর তিনি ৩০ বছর বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণ করেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি ভারতবর্ষের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ সময় উপমহাদেশ ঘুরে তিনি দুটি বই লিখেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল সংস্কৃত অভিধান।

বিক্রমপুরের বৌদ্ধ ধর্মগুরু অতীশ দীপঙ্কর ১১০০ শতাব্দীতে চীন-বাংলায় সংস্কৃতি বিনিময়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ৯৮২ সালে বিক্রমপুরের বজ্রজোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী অতীশ ২৯ বছর বয়সে বৌদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। তিনি তিব্বতের গুগ্য রাজ্যের রাজার আমন্ত্রণে ১০৩৮ সালে সেখানে বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি সেখানে প্রায় ১৬ বছর অবস্থান করে বৌদ্ধ ধর্মের ওপর দুই শতাধিক বই রচনা করেছিলেন। চীন ও তিব্বতের মানুষ সব সময় ভাবত, যদি কখনো অতীশ তাদের দেশ থেকে বাংলাদেশে চলে যান তাহলে হয়তো জগত্জুড়ে বৌদ্ধ ধর্মের উদীয়মান সূর্যটা উঠবে না। অতীশ দীপঙ্কর প্রথম বাঙালি ছিলেন যিনি চীনে প্রথম চা পান করেছিলেন।

‘বাংলাদেশ চীন ভ্রাতৃত্বের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, ২৫০০ বছর আগে থেকেই চীনের সিচুয়ান ইউনান প্রদেশের রেশম চাষ এবং বয়ন কৌশল পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতে প্রসারিত হয়। চা ও তিলের উৎপত্তি চীনের ইউনান ও কুয়েচৌ প্রদেশে। সেটাও পর্যায়ক্রমে চীন থেকে বাংলাদেশে স্থানান্তর হয়। বস্ত্রশিল্পে চীনের মতো বাংলাদেশের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। দুই দেশ প্রাচীনকালে চা ও বস্ত্রশিল্পের উৎকর্ষতা লাভ করে। চীনের লৌহসামগ্রী এবং তা গলন পদ্ধতি চীন থেকে বাংলাদেশে প্রসারিত হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে লাউ, কুমড়া, নাশপাতি, বেগুন, আখ প্রভৃতি চাষাবাদ চীনে স্থানান্তরিত হয়। অন্যদিকে ধান চাষাবাদ প্রথম শুরু হয়েছিল চীনের ইউনান আর ভারতের আসাম প্রদেশে।

চীন-বাংলার মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ১৪০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে মিং রাজাদের রাজত্বকালে। ১৪০৪ সালে চীনের রাজা জু দির রাজত্বকালে বাংলার সুলতান চীনে নিজস্ব দূত পাঠিয়েছিলেন। ১৪০৯ সালে এই দূতিয়ালির সংখ্যা বাড়তে থাকে। চীন রাজারাও বাংলায় দূত পাঠাতেন। সেটা বছরে ২০০ বার পর্যন্ত অতিক্রম করত। চীন আর বাংলার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি ঘটনা ঘটে ১৪১৪ সালে। তৎকালীন বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিনের ছেলে সুলতান সাইফুদ্দিন শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ ছিলিন নামে আফ্রিকার একটি জিরাফ চীনকে উপহার দেন। এ ধরনের প্রাণীর বিষয়ে তখন চীনবাসীর কোনো ধারণা ছিল না।

সুলতানি আমলে চৈনিক পর্যটক জেং হো দুইবার বাংলায় এসেছিলেন। তিনি দুনিয়া আবিষ্কারের নেশায় মেতেছিলেন। ১৪২১ থেকে ১৪৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৮ বছরে ৫০ থেকে ৬০টি নৌবহর নিয়ে তিনি ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলায় এসেছিলেন। তাঁর বহরে ছিল ২৭ থেকে ২৮ হাজার নাবিক। যাঁরা বাংলাসহ ৩০টি দেশে গিয়ে চীনের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিলেন। তা ছাড়া চীন সম্রাটের দূত হিসেবে হৌ শিয়েন তিনবার বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের ভ্রমণ বিবরণে লিখেন—‘আমরা সুমাত্রা থেকে ২০ দিনে চট্টগ্রাম পৌঁছি। সেখান থেকে ছোট নৌকায় ৫০০ লি বা ২৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সোনারগাঁ পৌঁছি। এরপর সুলতানের অতিথিশালায় উঠি। সেখানে হাজার হাজার মানুষের সামনে আমাদের গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। ’

ইতিহাসের অনেক পথপরিক্রমা শেষে ১৭ শতাব্দীতে চীন-বাংলাদেশের সম্পর্কের সুতোয় টান পড়ে মূলত ব্রিটিশদের আগ্রাসী শাসনের কারণে। কিন্তু সেটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। দেশ ভাগের পরপরই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের পর্যায়ে চলে যায়। পঞ্চাশের দশকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সফরের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ববাংলার সঙ্গে চীনের সুগভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার জাতীয় নেতা। চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিনি দুইবার চীন সফরে যান। সে সুবাধে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয় চীনের জাতীয় নেতা মাও জে দং, চৌ এন লাই, জু দে ও লিউ সাউছি প্রমুখের সঙ্গে।

১৯৬৩ সালে নয়া চীনের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বৌদ্ধ ধর্মযাজক শুদ্ধানন্দ মহাথেরোকে চীন ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তখন তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইকে অনুরোধ করেন বৌদ্ধ ধর্মের মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের দেহাবশেষের অংশবিশেষ যেন বাংলাদেশকে দেওয়া হয়। যার ফলে ১৯৭৮ সালের জুনে চীনা বৌদ্ধ সমিতি ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি পেইচিংয়ে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেই দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসে। বর্তমানে সেই ঐতিহাসিক দেহাবশেষটি ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মন্দিরে সংরক্ষিত আছে। এ বিনিময়টি ছিল বাংলাদেশ ও চীন মৈত্রীর এক অপূর্ব নিদর্শন।


মন্তব্য