kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সহায়তার বাইরে ১০ লাখ জেলে পরিবার

মোশতাক আহমদ   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সহায়তার বাইরে ১০ লাখ জেলে পরিবার

দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলার ঢালচরের কাছে মেঘনা মোহনায় কয়েক বছর ধরে মাছ ধরেন চরফ্যাশনের নীলকমলের বাসিন্দা রজত কালু। একসময় নৌকার জাল টানার সহায়তাকারী ছিলেন।

এখন মাছ ধরার পুরো দায়িত্ব পান প্রায় সময়ই। মাছ ধরার জন্য একবার বাড়ি থেকে বের হলে ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত টানা সাগরে ভেসে ভেসে মাছ ধরেন। তবে এবার সরকারি ঘোষণায় সাগরে মা ইলিশ ধরা বন্ধ ঘোষণার পরই সোমবার চলে আসেন নদীতীরে। এবার সরকার মোট ২২ দিন ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণার পর তিনি ফিরে আসেন নদীতীরে। কিন্তু ঘোষিত ২০ কেজি করে বরাদ্দ করা চাল এই জেলে পরিবারের ভাগ্যে জোটেনি। কারণ সাগরে থাকার সময়ে তাঁর নাম কেউ তালিকায় দেয়নি। সরকারি জেলে তালিকায়ও তাঁর নাম নেই। তবে নাম তালিকাভুক্তির জন্য তিনি আবেদন করেছেন।  

রজত কালুর মতো ভোলার সাগর মোহনা ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন এমন অনেক জেলের পরিবার এবার সরকারি বিশেষ বরাদ্দের চাল পায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে ১১ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে জেলেরা সরকারি সাহায্যের ওপর তেমন একটা নির্ভর করত না। কষ্টেসৃষ্টে এই সময়টুকু পার করে দিত। কিন্তু এ বছর প্রায় এক মাস মাছ ধরা বন্ধ করায় চাল বরাদ্দ না পেয়ে অনেক জেলে পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলো অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটার আশঙ্কা করছে।

মৎস্য অধিদপ্তর থেকে তালিকাভুক্ত ১৩ লাখ ৮০ হাজার জেলেকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাছ ধরা বন্ধকালীন এ বছর সরকারি সহায়তা পাচ্ছে মাত্র সাড়ে তিন লাখ জেলে। সেই হিসাবে সরকারি বরাদ্দের বাইরে থেকে যাচ্ছে ১০ লাখ জেলে পরিবার। এভাবে বিশাল জেলে জনগোষ্ঠীকে সহায়তার বাইরে রেখে মাছ ধরা বন্ধ রাখায় এই উদ্যোগে কতটা সাফল্য আসবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে জেলেরা। তাদের মতে, একজন জেলেকেও অভুক্ত রেখে মাছ ধরা বন্ধ রাখার পদক্ষেপ সফল করা যাবে না।

জেলেদের বঞ্চিত হওয়ার এমন খবরের বিষয়ে অনেকটা একমত প্রকাশ করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আনিসুর রহমান। জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, মাছ শিকার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নতুন করে নেওয়া হয়েছে এমন নয়। সিদ্ধান্ত আগেরই। তবে ঘোষণাটা দেওয়া হয়েছে একটু বিলম্বে। কারণ সিদ্ধান্ত নিতে সবার মতামত নিতে হয়। তা ছাড়া এবার যেভাবে ইলিশ ধরা পড়ছিল তাতে হঠাৎ করে মাছ ধরা বন্ধ করা যাচ্ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা, দেশে ২০ লাখের মতো জেলে পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৮০ হাজার জেলেকে মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে আমাদের তালিকাভুক্ত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। কিন্তু মাছ ধরা বন্ধে জেলেদের সহায়তার পরিমাণ সন্তোষজনক পর্যায়ে আনতে আমরা মন্ত্রণালয় থেকে দেশের ২৫ জেলার ১১২টি উপজেলার তিন লাখ ৮৪ হাজার ৪২৬ জন জেলের জন্য ১৫ হাজার ৩৭৮ টন চাল চেয়েছিলাম। তাতে এসব জেলে এককালীন ৪০ কেজি করে চাল পেত। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ কমিয়ে তিন লাখ ৫৬ হাজার ৭২৩ জন জেলের জন্য সাত হাজার ১৩৪ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রতি জেলেকে দিয়েছে আমাদের চাহিদার অর্ধেক, ২০ কেজি করে। ’

সূত্র জানায়, প্রজননের সুবিধার্থে গত ১২ অক্টোবর থেকে আগামী ২ নভেম্বর পর্যন্ত সাগর ও নদী মোহনায় ইলিশ আহরণ বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে মাঠে নেমেছে কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও র‌্যাব। বিশেষ স্থানে হেলিকপ্টার দিয়ে সাগরে চিরুনি অভিযান পরিচালনার নির্দেশনাও আছে। বিমান থেকে ট্রলার চিহ্নিত করে কোস্ট গার্ডকে তথ্য দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোনো জেলের পক্ষে এখন আর সাগর বা মোহনায় মাছ ধরা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। ইলিশ আহরণের পাশাপাশি মজুদ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা টানা ২২ দিন বলবৎ থাকবে। ফলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরগুনা, খুলনা, পটুয়াখালী, চাঁদপুরসহ উপকূলজুড়ে হাজার হাজার ফিশিং বোট ও ট্রলার ক্যাপ্টেন, ক্রু, মাঝিমাল্লাসহ ঘাটে ফিরে এসেছে।

মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ৬৭ হাজার যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক বোট মৎস্য আহরণে নিয়োজিত। এর প্রায় ৭০ শতাংশই ইলিশ শিকার করে থাকে। যেসব জেলে পরিবার সরকারি সহায়তা পাচ্ছে না বা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই তাদের আগামী প্রায় একটি মাস কাটবে নিদারুণ কষ্টে। অনেকের মতে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সংসার চালানো ছাড়া তাদের উপায় থাকবে না।

জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলেদের সহায়তার ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ততার বিষয়টি আমাদের মাথায় আছে। আগামীতে এ বিষয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাব। ’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ১৩ লাখ জেলে তালিকাভুক্ত হলেও সবাই গভীর সাগরে মাছ ধরতে যায় না। আর কেবল গভীর সাগর বা মোহনায় মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে করণীয় নিয়ে গত ৯ অক্টোবর থেকে দেশি-বিদেশি ১৪ জনের একটি টিম সাগরে নতুন করে গবেষণা মিশন শুরু করেছে। এ মিশনের অন্যতম কাজ হবে সাগরের বাংলাদেশ অংশে ইলিশের উৎপাদন ও আহরণ বৃদ্ধিতে করণীয় নির্ধারণ করা। এই বিশেষজ্ঞ দলে দুজন মালয়েশিয়ান ছাড়া সবাই বাংলাদেশের।


মন্তব্য