kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জলবায়ু তহবিলের টাকায় অবাস্তব সব প্রকল্প

► পর্যাপ্ত সমীক্ষা ছাড়াই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪০০ প্রকল্প
► বাড়ছে মেয়াদ ও ব্যয়, সুফল পাচ্ছে না মানুষ

আরিফুর রহমান   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের ১৭ কোটি টাকা দিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরির কাজ শুরু হয় বছর তিনেক আগে। গার্ডেনের সামনের অংশে ৩৫ ফুট চওড়া একটি রাস্তা নির্মাণের সিদ্ধান্ত ছিল বন বিভাগের।

কিন্তু কাজ শুরু করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ের পাশ দিয়ে এত চওড়া রাস্তা তৈরি এক কথায় অসম্ভব। রাস্তার এক পাশে লেক অন্য পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। আর রাস্তা ছাড়া বোটানিক্যাল গার্ডেনও হবে অর্থহীন। তাই প্রকল্পটি এখন বাদ দেওয়ার কথা বলছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। অথচ এরই মধ্যে এক কোটি ১০ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে।

গত এপ্রিলে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টি বোর্ডের ৩৯তম সভায় সর্বসম্মতভাবে প্রকল্পটি বাদ দেওয়া হয়। আরো সিদ্ধান্ত হয়, খরচ না হওয়া টাকা অন্য কোনো জেলায় বোটানিক্যাল গার্ডেন কিংবা ইকো পার্ক স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। বৈঠকের কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। ট্রাস্টি বোর্ডের ৪০তম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় গত মাসে। তবে সেখানে বড় ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব জ্ঞান রঞ্জন শীল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আমাদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে। আমরা পর্যালোচনা করে প্রকল্প অনুমোদন দেই। প্রকল্পের বাস্তবায়ন আমরা দেখি না। সেটি আমাদের এখতিয়ারও নয়। তবে যেকোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে সমীক্ষা করে দেখা উচিত। ’

বৈঠকের কার্যপত্র সূত্রে আরো জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের চার কোটি টাকা দিয়ে বন বিভাগ ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় বিলোনিয়া বিটে একটি ইকো পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয় গত বছর। উদ্দেশ্য ছিল, সেখানকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ইকো ট্যুরিজম উন্নয়ন এবং জনসাধারণের বিনোদনের ব্যবস্থা করা। এর ছয় মাস পর বন বিভাগ জানায়, ইকো পার্ক স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচন ঠিক হয়নি। ওই স্থানটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত লাগোয়া হওয়ায় যেকোনো সময় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকবে। এখন ইকো পার্কটি ফেনী পৌরসভায় করতে চায় বন বিভাগ। এরই মধ্যে কেটে গেছে অনেকটা সময়।

ট্রাস্টি বোর্ডের ৩৯তম বৈঠকে আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্পের স্থবিরতা নিয়ে আলোচনা হয়। বোর্ডের সদস্যরা কয়েকটি প্রকল্পের শম্বুক গতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কার্যপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত যেসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল তার অনেকগুলো এখনো শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। ফলে ওই সব প্রকল্পের মেয়াদের পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সুফল পাচ্ছে না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন সেলের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার জাকির হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্রাস্ট ফান্ডের টাকায় যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, তার সবই রাজনৈতিক বিবেচনায়। ওই সব প্রকল্প বিষয়ে কোনো সমীক্ষা করা হয় না। সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে কথা বলারও প্রয়োজন বোধ করে না তারা। ঢাকায় বসে প্রকল্প বানানো হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এসব প্রকল্পের সম্পর্ক কী—এ বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবরোধে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর সীমানা সংরক্ষণ, বর্জ্য পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প গত বছরের জুনে অনুমোদন দেয় ট্রাস্টি বোর্ড। কিন্তু প্রায় এক বছর পর বাস্তবায়নকারী সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর নানা জটিলতা দেখিয়ে এখন বলছে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ফলে ট্রাস্টি বোর্ডের এপ্রিল মাসের সভায় এ প্রকল্পটিও বাতিল করে দেওয়া হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ২০০৯ সালে অনুমোদন পেয়েছিল ঢাকার গুলশান, বারিধারা ও ধানমণ্ডি এবং চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ ও খুলশী এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প। খরচ ধরা হয় ১৯ কোটি টাকা। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ করতে না পারায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে এখন ২২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে না পারায় ট্রাস্টি বোর্ডের ৩৯তম সভায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বোর্ডের সদস্যরা নানা দিক পর্যালোচনা করে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেন।

এ ছাড়া ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে চলমান দুর্গম হাওর এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন, উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ ও বাঁকখালী নদীর তীর প্রতিরক্ষা প্রকল্প, রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলায় যমুনেশ্বরীর ডান তীর সংরক্ষণ, চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় হালদা নদীর বাম তীরে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক কাজ, গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়ায় খাল পুনর্খনন, বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জে নলুয়া ইউনিয়নে পোল্ডার নির্মাণের কাজও যথা সময়ে শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি, অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প গ্রহণ, বিস্তারিত সমীক্ষা না করাসহ বিভিন্ন কারণে ট্রাস্ট ফান্ডের সুফল সাধারণ মানুষ পায় না।

জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে তিন হাজার কোটি টাকা দিয়ে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ নামে আলাদা একটি ফান্ড গঠন করে। তাতে প্রথম তিন বছর বাজেট থেকে ৭০০ কোটি টাকা করে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠতে শুরু করায় সরকার পরের বছর থেকে বরাদ্দ কমাতে থাকে। চলতি বছর এ তহবিলে মাত্র ১০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। জলবায়ু অর্থ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেছেন। সরকারের অন্য সব প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক) কিংবা পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া হলেও জলবায়ু তহবিলের প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা করা হয় না। এমনকি সরকারের অন্য সব প্রকল্পে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) নজরদারি করলেও ট্রাস্ট ফান্ডের প্রকল্পে তা করে না। তাই জলবায়ু তহবিল বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।


মন্তব্য