kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইউপি চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা

রূপগঞ্জে চাঁদা না পেয়ে মোশা বাহিনীর তাণ্ডব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রূপগঞ্জে চাঁদা না পেয়ে মোশা বাহিনীর তাণ্ডব

মোশারফ হোসেন মোশা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মোশা বাহিনীর প্রধান মোশারফ হোসেন মোশার দাবিকৃত পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় পূজামণ্ডপে হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁদার টাকা না দিয়ে ঘটনার প্রতিবাদ করায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে গুলি করলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

এ সময় মোশা বাহিনীর হামলায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। সোমবার রাতে উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া পূর্বপাড়া পূজামণ্ডপে এ ঘটনা ঘটে।

পূর্বপাড়া পূজা উদ্যাপন কমিটির সদস্য হরিপদ, রিপন, ললিত চান, আজিত, প্রণেশ্বর বলেন, ‘প্রতিবছরই দুর্গাপূজা উপলক্ষে নাওড়া পূর্বপাড়া পূজামণ্ডপে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসব শুরু হওয়ার আগেই স্থানীয় মোশারফ ওরফে মোশা আমাদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। পূজা কমিটির লোকজন ঘটনাটি কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ রফিকুল ইসলাম রফিককে জানায়। চেয়ারম্যান সন্ত্রাসী মোশাকে চাঁদাবাজি থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে শাসিয়ে দেন। সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যান স্থানীয় এমপি, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক ও দলীয় নেতাকর্মীরা। এ সময় চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিককে পূজামণ্ডপে প্রবেশে বাঁধা দেয় মোশারফ ও তার বাহিনীর লোকজন। একপর্যায়ে সংসদ সদস্যের সামনেই মোশা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিককে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়, যদিও গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। চেয়ারম্যানের লোকজন প্রতিবাদ করায় মোশা বাহিনীর লোকজন তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় অন্তত ১০ জন আহত হয়। ’

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, ডিবির ওসি নারায়ণগঞ্জ মাহমুদুল ইসলাম, রূপগঞ্জ থানার ওসি ইসমাইল হোসেন। বর্তমানে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। মোশারফ হোসেন মোশার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন থানায় তিনটি হত্যামামলাসহ দেড় ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। গত দুই বছর আগে র‌্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মোশারফ হোসেন মোশা।

এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, ‘আমি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানাই। ’ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবিও জানান তিনি।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ওসি ইসমাইল হোসেন বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার নাওড়া এলাকায় গত কয়েক বছর মোশা নিরীহ মানুষের জমি দখল করে আসছে। এ ছাড়া নানা অপকর্মে জড়িত তিনি। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন বোল পাল্টে সে দলের কর্মী বনে যায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মোশা যুবলীগ নেতা পরিচয়ে আবির্ভূত হয়। মূলত জমি দখল করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যায় সে। এরপরই গঠন করে সন্ত্রাসী বাহিনী। তার বাহিনীতে ৩০০ সদস্য আছে বলে জানা গেছে। এদের অনেকেই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। মোশারফের সন্ত্রাসী বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করে মোশার ভাই আলী আজগর ওরফে খুনি আলী আজগর, বদিউজ্জামান বদি, সাখাওয়াতুল্লাহ ওরফে ইয়াবা সাখাওয়াত ও আনোয়ার হোসেন ওরফে ধলকুর আনোয়ার। এই বাহিনীর সদস্যরা চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্ম করলেও কেউ এর প্রতিবাদ জানালে মামলা, হামলা, মারপিট এমনকি জীবননাশের ঘটনাও ঘটে। গজারিয়ার এক ব্যক্তি জানায়, মোশা ও তার বাহিনী তাদের ৯৮ শতাংশ জমি জাল দলিল করে বালু ভরাট করে দখল করেছে। এলাকার অন্য এক কৃষক জানায়, মোশার বাহিনী তাদের ৮০ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে।

মোশাররফ বাহিনীর অপকর্ম : গত কয়েক বছর আগে মোশাররফ বাহিনীর হামলায় গুরুতর আহত হন রূপগঞ্জের নাওড়া এলাকার কালীপ্রসাদ ও সুশীল। দুই লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে মোশাররফ বাহিনীর সদস্যরা তাদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। পরে প্রাণের ভয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যান কালীপ্রসাদ ও সুশীল। গত দুই বছর আগে মোশাররফ বাহিনীর সদস্য মোতালিব, বদিউল, সাখাওয়াত, আনোয়ার, মজিবরসহ আরো ১৫-২০ জন সন্ত্রাসী পিস্তল, রামদা, বল্লম ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নাওড়া গ্রামের মোক্তার হোসেনের বাসায় ঢুকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। কিন্তু চাঁদা দিতে না চাইলে সন্ত্রাসী মোশাররফ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে ত্রাস সৃষ্টি করে। এ সময় মোক্তার হোসেনকে হত্যার হুমকি দেয় এই বাহিনী। সন্ত্রাসীরা মোক্তারের চাচাতো ভাই নবী হোসেনের ঘরে ঢুকেও ভাঙচুর চালায়। সেখান থেকে তারা নগদ ৭০ হাজার টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ দুই লাখ ৪০ হাজার টাকার মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। একই বছরের ২৯ মার্চ দুপুরে এলাকার আমির হামজার বাসায় একই কায়দায় হামলা চালায় মোশাররফ বাহিনী। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমিরের বাসায় ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালপত্র নিয়ে যায়। ওই ঘটনায়ও রূপগঞ্জ থানায় মামলা হয়। ২০১২ সালের ৬ মে বড় বেরাইদে নাজিম উদ্দিন তাঁর নিজের জমিতে ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাটের সময় বাধা দেয় মোশাররফ বাহিনীর লোকজন। এ সময় চাঁদার দাবিতে তারা একটি ড্রেজারে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দুটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এতে প্রায় আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে রূপগঞ্জ থানায় করা ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়।


মন্তব্য