kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঢাকার যানজটে বছরে ক্ষতি ৩৫০০০ কোটি টাকা

আরিফুর রহমান   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঢাকার যানজটে বছরে ক্ষতি ৩৫০০০ কোটি টাকা

বাসা থেকে বেরিয়ে যত দ্রুত সম্ভব গন্তব্যে পৌঁছতে ঢাকার মানুষের চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না। হেঁটে, বাসে, ব্যক্তিগত গাড়িতে কিংবা স্কুটারে দ্রুততম সময়ে পৌঁছতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কাও করে না অনেকে।

যানজট এড়িয়ে দৈনন্দিন যাতায়াতে নগরবাসীর এত ব্যস্ততার পরও জীবনের মূল্যবান অনেক সময় খেয়ে ফেলছে ঢাকার যানজট। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যানজটে আটকা পড়ে অপচয় হওয়া কর্মঘণ্টা, ওই সময়ে যানবাহনের পুড়ে যাওয়া বাড়তি জ্বালানির মূল্য এবং তাতে নগরবাসীর যে স্বাস্থ্যহানি ঘটছে এর আর্থিক মূল্য বছরে ৪৬০ কোটি ডলার বা ৩৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। দেড় কোটি মানুষের আবাসস্থল ঢাকার ১০ লাখ মানুষ বছরে এই পরিমাণ অর্থ আয় করে। অর্থাৎ ঢাকার ১০ লাখ কর্মজীবী মানুষ বছরজুড়ে যে অর্থ আয় করে, তা খেয়ে ফেলে এই শহরের যানজট।

ইউএনডিপি বলেছে, বাংলাদেশের রাজধানীর বেশির ভাগ নাগরিকই মনে করে, প্রয়োজনের তুলনায় এখানে গণপরিবহনের সংখ্যা অনেক কম। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি ও তিন চাকার গাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে ইউএনডিপির ৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে ঢাকার যানজট প্রসঙ্গ। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়টিও উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চার পথ সংকুচিত। নাগরিকের মৌলিক অধিকার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুরোহিত ও সংখ্যালঘুদের হত্যা এবং জঙ্গি হামলার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ইউএনডিপি বলছে, ঢাকায় বসবাসরত মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট করে ফেলছে যানজট। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ, শিক্ষার্থীসহ কমবেশি সবাই যানজটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজধানীবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে এই যানজট। এর ফলে প্রতিনিয়তই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে, যার সামগ্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। যানজটের মাত্রা কমিয়ে আনতে গণপরিবহনের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়টিও ইউএনডিপির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাতে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুরোহিতকে হত্যার বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চার পথ সংকুচিত বলেও ইউএনডিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইউএনডিপির এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক হাওলিয়াং জু স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন ও নারীদের ক্ষমতায়নে অসাধারণ সাফল্য অর্জনের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

ঢাকার যানজটে ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে এর আগে সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থা অনেক গবেষণা করেছে। নতুন করে ইউএনডিপি গবেষণাটি তৈরি করেছে। ইউএনডিপির আগে যেসব গবেষণা সংস্থা যানজট নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে তার সব প্রতিবেদনই আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উঠে এসেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, রাজধানীতে যানজটের কারণে বছরে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকা। এতে বলা হয়েছে, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন নগরবাসীর ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকার যানজটে ক্ষতি নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি গত মাসে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে যানজটে প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যানজটে ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে এলেও বড় ধরনের ক্ষতি যে হচ্ছে তা নিয়ে সবাই একমত। যার যার গবেষণাপদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। তবে যানজটে ক্ষতি কমিয়ে আনতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজধানীতে বসবাসরত প্রায় সব নাগরিকই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যানজট কী জিনিস। প্রতিদিনই যানজটের তীব্রতা বাড়ছে। ফলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। তিনি বলেন, ঢাকার যানজট কমাতে বর্তমান সরকারসহ বিগত সরকারগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অনেক পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হয়নি। যে মন্ত্রণালয় আগে প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, তাকে আগে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে যতগুলো প্রকল্প চলমান, এর একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সমন্বয় নেই। সমন্বয়হীনতার মধ্য দিয়েই এসব উন্নয়নকাজ চলছে। ফলে যানজট কমাতে কোনো ভূমিকা রাখছে না সড়ক ও উড়াল সড়ক। শামসুল হক বলেন, রাজধানীতে যতগুলো উড়াল সড়ক নির্মিত হয়েছে তা যথেষ্ট। নতুন করে আর উড়াল সড়কের দরকার নেই। সরকারের এখন উচিত আগে যেসব পরিকল্পনা ও কৌশল নেওয়া হয়েছে, সেগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা। আর তাতে গণপরিবহনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শক্ত হাতে পেশাদারি মনোভাব নিয়ে কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বুয়েটের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী মানুষের মাত্র ৬ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে। অথচ এই গাড়িগুলো সড়কের ৮০ শতাংশ জায়গা দখল করে। অন্যদিকে ঢাকার ৭৫ শতাংশ মানুষ চলাচল করে বাসে, যা মোট সড়কের ২০ শতাংশেরও কম জায়গা ব্যবহার করে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) গত বছর তাদের এক গবেষণায় বিশ্বের সবচেয়ে অযোগ্য ১০টি শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রেখেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে। একটি শহরের অভ্যন্তরীণ অপরাধের মাত্রার পাশাপাশি পরিবহন যোগাযোগের বিষয়টিও আমলে নিয়ে বসবাসের জন্য ‘অনুপযুক্ত’ বা ‘অযোগ্য’ শহরের নাম প্রকাশ করে ইআইইউ।


মন্তব্য