kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কাল থেকে ইলিশ শিকার মজুদ বেচাকেনা নিষিদ্ধ

শুরু হবে সর্বাত্মক অভিযান

তৌফিক মারুফ   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কাল থেকে ইলিশ শিকার মজুদ বেচাকেনা নিষিদ্ধ

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার থেকে শুরু করে পাশের শহীদ পার্কের মাঠের পেছন দিকের ফটকের সামনে পর্যন্ত ইলিশের ছড়াছড়ি। কেউ বড় থালায়, কেউ ডালায় সাজিয়ে হাঁক ছাড়ছেন ‘ইলিশ’ ‘ইলিশ’।

হালি কোনোটার দুই হাজার, কোনোটার পনেরো শ; আবার তিন হাজার টাকা দাম হাঁকছেন কেউ কেউ। দুই-তিন দিন ধরে ইলিশের জন্য ভিড় বাড়ছে।

যেমন বাড়ছে বিক্রেতা তেমনি ক্রেতাও।

পাশেই ঢাকার অন্যতম বড় বাজার টাউন হল বাজার ইলিশে সয়লাব। এর কিছুটা দূরে শহীদ পার্কে ইলিশের পসরা কেন? গতকাল সোমবার সকালে বিক্রেতা ময়নাল এমন প্রশ্ন শুনেই গলা বাড়িয়ে উত্তর দিলেন, ‘আইজকার দিন আর কাইলকার দিনই ইলিশ খাইয়া লন, যা লওয়ার লইয়া যান, পরশুকা তো আর পাইবেন না। ’

পাশের লেপ-তোশকের দোকানে বসা মধ্যবয়সী একজন জানতে চাইলেন, ‘মানে কী? ইলিশ শ্যাষ অইবো মানে?’

এবার ময়নাল বললেন, ‘১২ তারিখ থেইক্যা ইলিশ নিষিদ্ধ কইর‌্যা দিছে সরকার। বেচাও যাইবো না, কেনাও যাইবো না, ধরাও যাইবো না। ’ ময়নালের পাশে বসা অন্য জেলেরা জানাল, ‘পাইকারদের হাতে এখনো অনেক ইলিশ। কিন্তু হাতে সময় আছে আর এক দিন। এ সময়ের মধ্যে বিক্রি শেষ করতে হবে। তাই দল বেঁধে জেলেরা ইলিশ নিয়ে বসেছে। দামও কম। ’

কেবল ময়নালই নয়, রাজধানী বা শহর-বন্দরের ইলিশ বিক্রেতা থেকে শুরু করে জেলে পর্যন্ত সবারই এখন জানা হয়ে গেছে কাল ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডাঙায় আজই ইলিশের এক রকম শেষ দিন। এরপর টানা ২২ দিনের জন্য আধুনিক চেইনশপ থেকে শুরু করে হাট-বাজারে, পথে-ঘাটে বা ফেরি করে ইলিশ বিক্রির দৃশ্য আর চোখে পড়বে না। ইলিশ ধরা এবং পরিবহনেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকছে। যদি কারো বাসায় কিংবা কোনো রেস্তোরাঁয় আগে থেকে ইলিশ রাখা থাকে তাহলে হয়তো রক্ষা মিলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিগত কয়েক দশকে ইলিশের উৎপাদন দ্রুত কমে যাচ্ছিল। তবে কয়েক বছর ধরে উৎপাদন সহনশীল পর্যায়ে রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা কৌশল যেমন—জাটকা সংরক্ষণ, সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ আহরণ নিষিদ্ধ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বাস্তবায়নের কাজ জোরালোভাবে শুরুর সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। যেমনটা এবার খুব ভালোভাবেই টের পেয়েছে ইলিশপ্রিয় মানুষ। এবার ব্যাপক ইলিশ মিলেছে।

ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএফআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ইলিশ মাছ সারা বছরই কমবেশি প্রজনন করলেও সবচেয়ে বেশি প্রজনন করে অক্টোবর মাসের (আশ্বিন/কার্তিক) বড় পূর্ণিমার সময়। এ সময় ৬০ শতাংশের বেশি ইলিশই পরিপক্ব ও ডিম ছাড়ার উপযোগী অবস্থায় থাকে। তাই ইলিশ মাছের অবাধ প্রবেশ ও বিচরণ নিশ্চিতকরণের জন্য পাঁচটি নির্দিষ্ট এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অবাধ প্রজনন ও প্রাকৃতিকভাবে অধিক ডিম ও পোনা উৎপাদনের জন্য মৎস্য সংরক্ষণ আইন ১৯৫০-এর অধীনে এ সময়ে ইলিশ শিকার, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত বা কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হয়। আগে বিভিন্ন সময় ১১ দিন বা ১৫ দিন এ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এবার এই সময়সীমা ২২ দিন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ইলিশের আবাসস্থল নদী-মোহনার ইকোলজি বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র আরো গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ ছাড়া ইলিশের প্রধান চারটি প্রজননক্ষেত্র (ঢালচর, মনপুরা  মৌলভীরচর ও কালিরচর দ্বীপ) সমন্বিতভাবে প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায়ও একই সময় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিএফআরআই সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ১১ দিন ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকার সফলতার সমীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন, প্রায় এক কোটি ৬৩ লাখ ইলিশ শিকার থেকে রক্ষা পেয়েছিল; যা থেকে প্রায় চার লাখ ১৭ হাজার ৭৬৫ কেজি ডিম প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদিত ডিমের পরস্ফুিটনের হার ৫০ শতাংশ হিসেবে প্রায় দুই লাখ ৬১ হাজার ১০৩ কোটি রেণু উৎপাদিত হয়েছে এবং ওই রেণুর বাঁচার হার ১০ শতাংশ হিসেবে ধরে প্রায় ২৬.১০ কোটি পোনা/জাটকা ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইলিশের প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার শাহেরখালী থেকে হাইতকান্দি পয়েন্ট, ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার উত্তর তজুমদ্দিন থেকে পশ্চিম সৈয়দ আওলিয়া পয়েন্ট, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী পয়েন্ট ও চট্টগ্রামের কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর কুতুবদিয়া থেকে গণ্ডামারা পয়েন্ট পর্যন্ত মোট সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার সীমানাসহ আরো ২৭ জেলায় ইলিশ শিকার বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ওই সময়ে সারা দেশের মাছঘাট, মৎস্য আড়ত, হাটবাজার ও  চেইনশপে ব্যাপক অভিযান চালানো হবে; যাতে কোথাও ইলিশ আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন, মজুদ ও বিনিময় না হয়। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়সহ মৎস্য অধিদপ্তর, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, নৌ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা প্রশাসন একযোগে কাজ করবে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ২৭টি জেলা হচ্ছে—চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী জেলার নদনদী। সেই সঙ্গে দেশের সমুদ্র উপকূল এবং মোহনায়ও ওই ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে।


মন্তব্য