kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উদ্যোগ

রক্তদানে ছোটেন তাঁরা

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রক্তদানে ছোটেন তাঁরা

কক্সবাজারের চকরিয়ায় স্বেচ্ছায় রক্তদানে সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

একজন মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজন হয়। এ জন্য এগিয়ে আসতে হয় অন্যকে।

এ কথা নতুন করে বলার হয়তো কিছু নেই। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি-বেসরকারি অনেক ব্লাডব্যাংক রয়েছে। তরুণ প্রজন্মও এখন অনেক সচেতন। রক্তের প্রয়োজন হলেই ছুটে যায় জীবন বাঁচাতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ক্যাম্পেইন করে। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ উপজেলায় এ উদ্যোগ খুব বেশি চোখে পড়ে না। তবে আশার কথা হলো, কক্সবাজারের চকরিয়ায় তরুণদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে চারটি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যারা স্বেচ্ছায় রক্তদান করছে, মানুষের জীবন বাঁচিয়ে তৈরি করছে মানবতার দৃষ্টান্ত।

চকরিয়ার জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। কয়েক বছর আগেও এখানকার প্রত্যন্ত এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে সময়মতো চিকিৎসাসেবা পাওয়া ছিল দুষ্কর। তবে এখন রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলেই সরব হয়ে ওঠে চার সামাজিক সংগঠন—‘পিস ফাইন্ডার’, ‘স্বাধীন মঞ্চ’, ‘মহামায়া ব্লাড ডোনেশন গ্রুপ’ ও ‘হূদস্পন্দন’। এই চার সংগঠনের প্রায় এক হাজার ব্লাড ডোনার রয়েছেন। কোথাও ডাক পড়লেই তাঁরা ছুটে যান এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন।

চার বছর আগে চকরিয়ায় প্রথমবারের মতো কার্যক্রম শুরু করে পিস ফাইন্ডার। এরপর বাকি তিন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। আলাদা হলেও এক সংগঠন আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হলেই ছুটে আসে তারা।

পিস ফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আদনান রামীম কালের কণ্ঠকে জানান, ২০১০ সালে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটান তিনি। এই সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন প্রায় ২০০ রক্তদাতা (ডোনার)। চকরিয়া, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা এসব রক্তদাতা ফেসবুক পেজের গ্রুপে রক্তের জন্য আহ্বান জানালেই সাড়া দেন।

আদনান রামীম বলেন, ‘২০১২ সালে অসুস্থ বাবা এবং মাকে নিয়ে বিপদে পড়ি। একসঙ্গে দুজনের জন্য আট ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় এদিক-ওদিক ছুটতে থাকি। পরে দেখি ফুফাতো ভাই বাবাকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছে, সঙ্গে আরো কয়েকজন হাসপাতালে গিয়ে বসে আছে রক্ত দেওয়ার জন্য। বাবাকে রক্ত দেওয়ার পর মায়ের কাছে গিয়ে সত্যিই চমকে গেলাম। মায়ের পাঁচ ব্যাগ রক্তই জোগাড় হয়ে গেছে। যারা রক্ত দিয়েছে তাদের কয়েকজন ছাড়া বাকি কাউকে আমি চিনি না। তারা কেউ আমার বন্ধুর বন্ধু বা তাদের পরিচিত অথবা স্বজন। সেই মানবিকবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই পিস ফাইন্ডার কাজ করছে। ’

ভরামুহুরীস্থ মহামায়া ব্লাড ডোনেশন গ্রুপের পরিচালক রনজয় দাশ কালের কণ্ঠকে জানান, ২০০২ সালে গ্রামের কিছু উৎসাহী যুবকের ইচ্ছায় প্রথমে ‘মহামায়া সংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনের মাধ্যমে সমাজকে শিক্ষিত, মাদকমুক্ত, কুসংস্কারমুক্ত করাসহ গ্রামটিকে জেলার আদর্শ গ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস নেওয়া হয়। এর পর থেকেই সংগঠনটি বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গ্রামের গরিব পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে আর্থিক সহায়তাসহ অসচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার উপকরণ বিতরণ শুরু করে। পরে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প বসিয়ে সেবা প্রদান এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১৪ জুন ‘মহামায়া ফ্রি ব্লাড ডোনেশন গ্রুপ’ নাম দিয়ে রক্তদান কর্মসূচি শুরু করেন সদস্যরা।

হূদস্পন্দনের অন্যতম নীতিনির্ধারক ক্লিনটন কিল্টু বলেন, ‘২০১৪ সালে প্রখ্যাত গায়ক ও চকরিয়ার কৃতী সন্তান সমরজিত্ রায় হূদস্পন্দন নামকরণ করেন সংগঠনটির। স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির কারণে সূর্যের হাসি ক্লিনিক ইতিমধ্যে সংগঠনের সদস্যদের সংবর্ধনাও দেয়। ২০১৬ সালের রমজান মাসে চট্টগ্রামের ‘সিটিজি অনলাইন ব্লাড ব্যাংক’-এর উদ্যোগে মুসলিম হলে দেশব্যাপী সব রক্তযোদ্ধাকে নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হূদস্পন্দনকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। নিয়মিত রক্তদান করে যাচ্ছেন সংগঠনের সদস্য অমরজিত্, ক্লিনটন, বাপ্পা, তনয়, প্লিনটন, রাজু, বিশাল, রিপন, সৈকত, টিটন, নিশান প্রমুখ।

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত পেকুয়ার শিশু মোহাম্মদ রুবেলের মা দিলুয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার তিন সন্তান একসঙ্গে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। তাদের একজনকে স্বাধীন মঞ্চের জিয়া উদ্দিন জিয়া চার মাস পরপর বি-নেগেটিভ রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর উছিলায় আমার সন্তান আজও পৃথিবীর আলো দেখছে। ’


মন্তব্য