kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন

অপব্যবহারের আশঙ্কা, রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা এনজিওদের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সংসদে সদ্য পাস হওয়া বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলছেন, ওই আইনের মাধ্যমে একজন মানুষের কথা বলার অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার হরণ করা হয়েছে।

তাঁরা দাবি করেন, এই আইন সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। গতকাল রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করা হয়।

বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন ২০১৬ গত বুধবার পাস হয়েছে সংসদে। এর একটি ধারায় কোনো দেশের সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন মন্তব্য করলে কোনো এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা এনজিও ব্যুরোকে দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এনজিও প্রতিনিধিরা বলেন, সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন মন্তব্য করলে এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতাসংক্রান্ত ধারাটি খসড়ায় না থাকলেও রাতের আঁধারে তা ঢোকানো হয়েছে। এই ধারাটির অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। প্রতিনিধিরা আরো বলেন, সরকার কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে একতরফাভাবে আইনে ১৪ নম্বর ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন জার্মানভিত্তিক সংস্থা টিআইবির সভাপতি সুলতানা কামাল। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী শাহীন আনাম, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রমুখ। আইনটি গেজেট আকারে জারি হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করে বক্তরা আইনটি পরিবর্তন ও সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।

লিখিত বক্তব্যে সুলতানা কামাল বলেন, ‘এই আইনটি পাস হওয়ার আগে বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধির মতামত নেওয়া হলেও একটি ধারা নিয়ে কারো মতামত নেওয়া হয়নি। সেটি হলো সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন মন্তব্য করলে ওই এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করে দেবে সরকার। ’ সুলতানা কামাল বলেন, আইনের এই ধারাটি অগণতান্ত্রিক, ঝুঁকিপূর্ণ ও অবাস্তব। বিলটিতে সম্মতি না দিতে এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে জবাব আসার পর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি।

শাহীন আনাম বলেন, ‘নতুন আইনে বলা হয়েছে, এখন থেকে কোনো ব্যক্তি দাতব্যমূলক কোনো কাজের জন্য বিদেশ থেকে টাকা পাঠালে তাকে এনজিও ব্যুরোতে নিবন্ধন করতে হবে। একই অনুদান পাঠাতে এনজিও ব্যুরোর অনুমতি নিতে হবে। এতে ব্যক্তিস্পৃহা কমে আসতে পারে। ’ কিছু এনজিও জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করছে—এটা স্বীকার করে তিনি বলেন, এ জন্য ঢালাওভাবে সবাইকে অভিযুক্ত করা ঠিক নয়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিদেশ থেকে অনুদান শুধু এনজিওরা আনে না; সরকার, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরাও অনুদান আনে। তাহলে তাদেরকে এই আইনে ঢোকানো হলো না কেন? তারা কি আইনের বাইরের মানুষ?’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংসদ নিয়ে টিআইবি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তার ওপর ভিত্তি করে সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আমি আমার চিন্তা ও মত প্রকাশের চর্চা করেছি। সে বক্তব্য অপরাধ হলে আমার ব্যক্তিগত বিচার হবে। সেটা না করে পুরো এনজিওর ওপর আইনটি চাপিয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা হয় না। ’

খুশী কবির বলেন, ‘আইনে বলা আছে সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন মন্তব্য করলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। প্রশ্ন হলো বিদ্বেষমূলক ও অশালীন এর সংজ্ঞা কী? এই সংজ্ঞা কে ঠিক করবে? দেখা গেল আমি আমার মত প্রকাশ করলাম; কিন্তু সরকার সে সমালোচনাকে বিদ্বেষমূলক বা অশালীন হিসেবে বিবেচনায় নেবে। এতে আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হবে। ’

আন্তর্জাতিক সংস্থা কেয়ারের বাংলাদেশ প্রতিনিধি জিমি তেরজি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে একমত। এই আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হবে। এতে মানুষের মতো প্রকাশ সংকুচিত হয়ে আসবে। ’

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আইনের ১৪ অনুচ্ছেদে নারী ও শিশু পাচার, মাদক ও অস্ত্র পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকলে সেটিকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কারো বিরুদ্ধে এর একটি প্রমাণিত হলে এনজিও ব্যুরো ওই এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এনজিও ব্যুরোর সে ম্যান্ডেট আছে কি না। নেই। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধীদের বিচার হবে। ’ তিনি বলেন, ‘একটা এনজিওতে ৬০০ জন কর্মী কাজ করে। ওই এনজিওর যদি একজন কোনো অপরাধ করে, তাহলে ওই একজনের জন্য ৬০০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কেন?’

লিখিত বক্তব্যে সুলতানা কামাল বলেন, ‘আইনে এনজিওদের সনদ বাতিলের যে বিধান রাখা হয়েছে তা শুধু অস্পষ্ট, স্বেচ্ছাচারমূলক নয়; এটি চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত সংবিধানের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। আমরা তীব্রভাবে এই আইনের নিন্দা জানাচ্ছি এবং বিলটিতে সম্মতি না দিতে রাষ্ট্রপতিকে আহ্বান জানিয়েছি। ’


মন্তব্য