kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কুমারীপূজা

অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা

রাজধানীর রামকৃষ্ণ মঠে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপূজা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সকাল থেকে ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। তাতে কি! মহা অষ্টমীতে যে ‘কুমারীপূজা’।

প্রাণের সেই উৎসবে যোগ দিতে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ভক্ত-পূজারিরা দলে দলে ছুটে আসেন পূজামণ্ডপের দিকে। শঙ্খের ধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার বিভিন্ন স্থানের রামকৃষ্ণ মিশনের মতো ঢাকার গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে কুমারীপূজা উদ্যাপিত হয়েছে।

মাতৃভাবে কুমারী কন্যাকে জীবন্ত প্রতিমা করে তাতে জগজ্জননীর উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করাই কুমারীপূজা। আজ সোমবার শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীতে ষোড়শ উপাচারের সঙ্গে ১০৮টি নীলপদ্মে পূজিত হবেন দেবী  দুর্গা। হিন্দু ধর্মগুরুদের মতে, নবমী পূজায় যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে নিজেকে আহুতি দেওয়া হয়। ১০৮টি বেল পাতা, আম কাঠ, ঘি দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়। ধর্মের গ্লানি আর অধর্ম রোধ, সাধুদের রক্ষা, অসুরের বধ আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবছর দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা ভক্তদের মধ্যে আবির্ভূত হন। শুভ বিজয়ার মাধ্যমে জাগতিক প্রাণীকে শোনান সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী। সনাতন ধর্ম মতে, নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলে সম্পদ লাভ হয়।

গতকাল সকালে বিহিতপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গাপূজার মহা অষ্টমী। সারা দিন পূজামণ্ডপগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। প্রতিটি মন্দিরেই কয়েক দফা করে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা মহা অষ্টমীতে নবরূপে ধরায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে অধিষ্ঠিত দেবীকে নানা উপাচারে আরাধনা করে সব অনাচার, সংকট মোচন ও বিশ্ববাসীর শান্তি প্রার্থনা করেন ভক্তরা। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে শুরু হয় মহা অষ্টমীর বিহিত পূজা। সকাল ১১টায় শুরু হয় কুমারীপূজা। পরে রাত পেরিয়ে ভোর ৫টা ৩৯ মিনিট থেকে ৬টা ২৭ মিনিটের মধ্যে মহা অষ্টমী ও মহানবমীর তিথির সংযোগ সময়ে সন্ধিপূজার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘মহা অষ্টমী’।

‘জয় শ্রীশ্রী কুমারী মাতা কি জয়! জয় শ্রীশ্রী দুর্গা মা কি জয়!’—এমনই জয়ধ্বনি আর বিনম্র শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে মহা অষ্টমীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কুমারীপূজা উদ্যাপিত হয়েছে। পূজায় কুমারীরূপী দেবী দুর্গার জীবন্ত প্রতিমার কাছে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির সূচনা কামনা করেছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। সারা দেশের রামকৃষ্ণ মিশনের মতো ঢাকার গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে গতকাল সকালে পূজার আয়োজন করা হয়। সকাল পৌনে ১১টায় কুমারীপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মণ্ডপে ভক্তদের ভিড় দেখা যায় সকাল থেকেই। ভক্তরা ‘কুমারী দেবীর’ চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রাণিকুলের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করেন। অন্য ধর্মের লোকজনকেও উপস্থিত হতে দেখা যায় বিভিন্ন মণ্ডপে।

আয়োজকরা জানায়, এবারের কুমারীর নাম সর্বাণী ভট্টাচার্য বিদ্যা। সে এসেছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার আউপাড়া থেকে। নারায়ণ ভট্টাচার্য ও অনিতা ভট্টাচার্যের মেয়ে সর্বাণী আউপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। ঘড়ির সময় ঠিক ১১টায় ‘দুর্গা মা কি জয়’ ধ্বনিতে পূজা পরিচালনা করেন প্রধান পরিচালক গুনেশ চৈতন্য। তাঁর সঙ্গে ‘তন্ত্রধারক’ ছিলেন স্বামী স্থিরানন্দ। এর আগে সকালে বিদ্যাকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয় এবং ফুলের মালা, নানা অলংকার ও প্রসাধনে নিপুণ সাজে সাজিয়ে তোলা হয়। কুমারীপূজায় দেবীর মঞ্চে অধিষ্ঠানের আগে মন্ত্রোচ্চারণ ও ফুল-বেলপাতার আশীর্বাদ পৌঁছে দেওয়া হয় সবার কাছে। কুমারীপূজার ১৬টি উপকরণ দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস—এ পাঁচটি উপকরণ দিয়ে কুমারীকে পূজা করা হয়। মা কুমারীকে সিংহাসনে বসানোর আগে তার আগমনবার্তা নিয়ে ভক্তিমূলক গান পরিবেশন করা হয়। এ সময় শঙ্খের ধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে মাতৃরূপিণী কুমারী মাকে পরিয়ে দেওয়া হয় পুষ্পমাল্য। মাল্য প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে যেন মায়ের শরীরে রাখা বিভিন্ন অলংকার আরো অলংকৃত হয়ে ওঠে ভক্তকুলের আনন্দ-উল্লাসে। আধাঘণ্টা ধরে চলে পূজা। শেষে পুষ্পাঞ্জলি ও প্রার্থনায় অংশ নেন পুণ্যার্থীরা।

ভক্তদের পূজা গ্রহণ শেষে বিশ্রাম ঘরে বসে বিদ্যা সাংবাদিকদের বলে, ‘সবাই আমাকে পুজো দিয়েছে, খুবই ভালো লাগছে। আমি সবাইকে আশীর্বাদ করেছি, যেন তারা ভালো থাকে। ’ বিদ্যার মা অনিতা ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমার মেয়ে দেবীরূপে আবির্ভূত হয়েছে। বড় হয়ে আমার মেয়ে দেবীর মতোই অসুরবিনাশী কাজ করে পৃথিবীর মঙ্গল করবে। ’

মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ধ্রুবেশানন্দ মহারাজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের নারীদের ওপর অত্যাচার যেন কম হয়, সে জন্য আমরা কুমারীরূপে মায়ের আরাধনা করেছি। আমাদের সকলের মধ্যে থেকে যেন আসুরিক ভাব দমন এবং একই সঙ্গে দৈবশক্তি তথা মাতৃশক্তি জাগরিত হোক, এটাই মূল কথা। ’

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী পূজামণ্ডপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পূজামণ্ডপ, রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, কলাবাগান সর্বজনীন পূজা ও গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা পরিষদের পূজামণ্ডপ, জয়কালী মন্দির রোডের রামসীতা মন্দির, রাজারবাগ বরদেশ্বরী কালীমন্দির, সূত্রাপুরের গৌতম মন্দির, অভয় দাস লেনের ভোলানন্দগিরি আশ্রম, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, লক্ষ্মীবাজার ও বনগ্রাম রোড পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের জমকালো আয়োজন করা হয়েছে।

তিথি অনুযায়ী, আজ সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর মহানবমী অনুষ্ঠিত হবে। মহানবমীতে ভক্তরা মায়ের কাছে দেশ, জাতি ও বিশ্বের সব জীবের মঙ্গল কামনায় আশীর্বাদ চাইবেন। আজও পূজা শেষে অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগ আরতির আয়োজন থাকবে। আর মাত্র একটি রাত। আগামীকাল মঙ্গলবার শুভবিজয়া শেষ হওয়ার পরই দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গে ফিরে যাবেন স্বামীর ঘরে। চোখের জলে ভাসিয়ে যাবেন তাঁর ভক্তকুলকে। কিন্তু এর পরও এ উৎসব মনে করিয়ে দেয় একটি অসাম্প্রদায়িক পৃথিবীর কথা, যেখানে সর্বদাই হারবে অসুর আর জয় হবে সত্যের।


মন্তব্য