kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রণতি

মায়ের চোখের সামনে বিশ্বজিৎ

আশরাফ-উল-আলম, ভোজেশ্বর থেকে ফিরে   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মায়ের চোখের সামনে বিশ্বজিৎ

শ্বেতপাথরে নির্মিত বিশ্বজিতের ভাস্কর্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

এর চাইতে আর কোনো বড় কষ্ট নেই যে মা-বাবাকে সন্তানের লাশ বহন করতে হয়েছে। তাই বলে কি মা-বাবার কাছে সন্তানের মুখ মরে যায়? বুকের ধন কখনো মরে না।

রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে নিরীহ বিশ্বজিৎ দাস হত্যার ঘটনা এখনো সবার হৃৎপিণ্ডে দাগ কেটে আছে। কেমন আছেন বিশ্বজিতের মা-বাবা? কিভাবে কাটে তাঁদের সকাল সন্ধ্যা? কিভাবে চলে সংসার। বিশ্বজিতের দিনমজুরিতে চলত সংসার। কিন্তু এখন? সন্তান হারানো শোকাতুর পরিবারটির ভেতরটুকু ভাষায় প্রকাশের নয়। তার পরও সান্ত্ব্তনা যতটুকু হয়, তুলনায় ক্ষুদ্র হলেও বাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়েছে জীবন্ত সেই বিশ্বজিতের শ্বেতপাথরের ভাস্কর্য।

শরীয়তপুর জেলা সদর থেকে নড়িয়া উপজেলায় যেতে ভোজেশ্বর বাজারের পাশে মসুরা আদর্শ গ্রাম। বাড়ির সামনে শ্বেতপাথরের একটি ভাস্কর্য। কালো কাচ দিয়ে আবৃত ইটের ভিত্তিস্তম্ভের ওপর হাত জোর করে আছে বিশ্বজিৎ দাস। হয়তো এই দৃশের পরিভাষাটা এমন—আর যেন কেউ এমন ভাস্কর্য না হয়।

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘অবরোধ’ ও ‘প্রতিরোধ’ নামের রাজনৈতিক কর্মসূচি কেড়ে নেয় বিশ্বজিতের জীবন। পুরনো ঢাকার জনসন রোডের সেই বীভৎস দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলে আঁতকে উঠতে হয়। কতিপয় ছাত্রলীগ নামধারী খুনির হাতে প্রাণ হারান খেটে খাওয়া অসহায় বিশ্বজিৎ।

সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসার নিদর্শন বিশ্বজিতের এই ভাস্কর্য। মৃত্যুর পরও তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে এটি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মা কল্পনা রানী দাস, বাবা অনন্ত চন্দ্র দাস ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়ান। মন ভরে তাঁকে দেখেন। সন্ধ্যায় নিয়মিত সন্ধ্যাবাতি দেন।

বিশ্বজিতের মৃত্যুর পর মা-বাবা পাগলপ্রায়। সময় অসময়ে বাড়ির সবার কাছে আবদার করেন বিশ্বজিৎকে দেখার জন্য। কিন্তু যে চলে গেছে পরপারে তাঁকে কি দেখানো সম্ভব। আর তাই বিশ্বজিতের বড় ভাই  উত্তম দাস সিদ্ধান্ত নেন একটি ভাস্কর্য স্থাপনের। বাড়ির পাশে বড় মন্দির। সেখানে পূজা হয়। পাশেই স্থাপন করা হয় বিশ্বজিতের ভাস্কর্য। রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য সম্প্রতি ভাস্কর্যের ওপরে টিনের চালা দিয়ে ঘর করে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বজিতের মা কল্পনা রানী দাস ও বাবা অনন্ত দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বজিৎকে অত্যন্ত ভালোবাসতাম। বিশ্বজিৎও আমাদের ভালোবাসত। স্থানীয় ভোজশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে সে। স্কুলে যখন পড়ত ছুটির পর ঘরে এসেই মা মা বলে চিৎকার করে ডাকত। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। এখন আর ডাকে না সে। যখন খারাপ লাগে তখন গিয়ে মূর্তিটার পাশে দাঁড়াই। কিছু সময় কাটাই। তার স্মৃতি ভেসে ওঠে। ভালোও লাগে তার মুখটাতো দেখতে পাই। ’

বিশ্বজিতের মা-বাবা জানান, তাঁদের ঘরে অভাব-অনটন সব সময় লেগেই থাকত। এ কারণে বিশ্বজিৎ, তাঁর ভাই ও এক বোন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। একদিন হঠাৎ করে ঢাকায় চলে যান বিশ্বজিৎ। বড় ভাই উত্তম দাসের টেইলারিং দোকানে কাজ শুরু করেন। অবরোধের মধ্যেই শাঁখারী বাজারের ওই দোকানে যাচ্ছিলেন রোজগারের জন্য। পথিমধ্যে বিনা কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়।

বিশ্বজিতের ভাস্কর্যতে তাঁর হাতজোড় করে রাখা হয়েছে কেন জিজ্ঞাসা করলে মা-বাবা জানান, বিশ্বজিৎকে যখন কুপিয়ে খুন করা হয় তখন বিশ্বজিৎ হাতজোড় করে খুনিদের বলছিলেন, ‘আমাকে মেরো না। আমি জামায়াত-শিবির করি না। আমি হিন্দু। আমি কাজ করে খাই। আমি কোনো রাজনীতি করি না। ’ কিন্তু কোনো কথাই শোনেনি খুনিরা। মা-বাবা বলেন, ‘তাই ভাস্কর্যে বিশ্বজিৎ হাতজোড় করে রেখেছে। ’

যে পরিবারের ঘরে খাবার থাকে না, সেই পরিবার ভালোবাসার নিদর্শন রাখার জন্য শ্বেতপাথরের ভাস্কর্য তৈরি করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাঁর মুত্যুর পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গিয়েছিলেন বিশ্বজিতের লক্ষ্মীবাজারের বাসায়। বিশ্বজিতের মায়ের হাতে তিনি দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ দিয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা। আর ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হক শামীম ও স্থানী সংসদ সদস্য দিয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা করে। সেখান থেকে ভাস্কর্যের ব্যয় মেটানো হয়েছে। বড় ছেলে তাঁর বন্ধুদের নিয়ে ঢাকার সাভার থেকে এই ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন। এখন পরিবার কিভাবে চলছে জানতে চাইলে মা-বাবা বলেন, ‘বিশ্বজিতের মৃত্যুর পর বসুন্ধরা গ্রুপ মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। নিয়মিত ওই টাকা আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। ওটা দিয়ে সংসার চালাই। সঙ্গে বড় ছেলের সামান্য আয়ও সংসার চালাতে সাহায্য করে। ’    

বিশ্বজিৎ শুধু পরিবারেরই নয়, গ্রামের সবার প্রিয় ছিলেন। বাড়িতে থাকলে সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। কখনো মন্দকাজ করেননি তিনি। গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র অনিক বলে, ‘বিশ্বজিৎকে আমরা  কাকা বলে ডাকতাম। কাকা খুব ভাল ছিল। আমাদের খুব আদর করত। ’  একই গ্রামের আক্তার হোসেন বলেন, ‘হাসি-খুশি, চঞ্চল বিশ্বজিৎ আসলে সবার প্রিয় ছিল। সবার আদরের ছিল। এভাবে বিনা কারণে খুন হতে হলো কেন এই প্রশ্ন সবার। ভাস্কর্যটি তাঁর সেইসব স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় সবাইকে। ’


মন্তব্য