kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


৭৪ ব্যক্তির কাছে ১৩০০ কোটি টাকা

রাজস্ব পাওনা

ফারজানা লাবনী   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



৭৪ ব্যক্তির কাছে ১৩০০ কোটি টাকা

প্রভাবশালী ৭৪ ব্যক্তির কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর বাবদ পাওনা প্রায় এক হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তাঁরা হিসাবমতো রাজস্ব পরিশোধ করছেন না; স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দেশ-বিদেশের ব্যাংকে রাখা অর্থ ও আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব এনবিআরে জমা দিচ্ছেন না।

সম্প্রতি এসব ব্যক্তির তালিকা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এনবিআর।

এই পরিপ্রেক্ষিতে গত রবিবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয় এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে ওই সব ব্যক্তির কাছ থেকে জরিমানাসহ বকেয়া ও নিয়মিত রাজস্ব ৩০ নভেম্বরের মধ্যে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, এই ৭৪ ব্যক্তির তালিকায় চারজন টেলিভিশন চ্যানেল মালিকসহ ১১ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, প্রথম সারির একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় একজন গবেষক, একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটার ও ৯ জন শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক রয়েছেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান; ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক দুই মেয়র, বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বাংলা দৈনিকের সম্পাদক, একজন টিভি উপস্থাপকও আছেন এ তালিকায়।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে বেশ কয়েকবার তাগাদা দেওয়ার পর অনেকে বকেয়ার কিছু অংশ পরিশোধ করেছেন। আয়কর রিটার্নে জমা দেওয়া তথ্য সংশোধনের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হলেও আমলে নেননি অনেকে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী চলতি করবর্ষের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এই ৭৪ ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দেশ-বিদেশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা অর্থ ও আয়-ব্যয়ের হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। এরপর জরিমানাসহ বকেয়া ও নিয়মিত রাজস্ব ৩০ নভেম্বরের মধ্যে আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব কাজের জন্য এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট গোয়েন্দা ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে ১১ সদস্যের টাস্কফোর্স কমিটি করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কাজ শুরু করবে টাস্কফোর্স।

এনবিআর সূত্র জানায়, ৭৪ ব্যক্তির মধ্যে ৪১ জনই ব্যবসায়ী। তাঁদের মধ্যে ১১ জন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী। একজনের কাছে এনবিআরের পাওনা ২৭১ কোটি ৭২ লাখ ৪৪ হাজার ১০০ টাকা। অর্থমন্ত্রীর সম্মতিতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে এনবিআর। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পাওনা ও নিয়মিত রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরেক ব্যবসায়ীর কাছে এনবিআরের পাওনা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। তিনি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক। দেশ-বিদেশে তাঁর আরো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাঁর কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে এনবিআরের তিন গোয়েন্দা শাখা একযোগে কাজ করছে।

অন্য তিন টেলিভিশন চ্যানেল মালিকের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ের জন্য এনবিআরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনার মতিউর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি একজনের কাছ থেকে ১৯ কোটি টাকা ও অন্য দুজনের কাছ থেকে ৪২ কোটি টাকা আদায় করেন। তাঁদের কাছে আরো প্রায় দেড় শ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। পরিশোধের জন্য ১৫ দিনের সময় এপ্রিল মাসে শেষ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদকে এনবিআরে তলব করা হয়েছিল। তিনি নিজে হাজির না হয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন সমঝোতার জন্য। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক ও তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবও তলব করা হয়। তাঁর আয়-ব্যয় ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব নতুনভাবে নির্ধারণ করে রাজস্ব আদায় করবে এনবিআর।

শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেট খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে এনবিআরের অভিযোগ, তিনি আয়কর রিটার্নে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ও সম্পদের হিসাব ঠিকমতো দেননি। ২০১৩ সালে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। পরে তিনি এনবিআরের চাহিদামাফিক হিসাব দাখিল করেন। তাঁর কাছে পাওনা রাজস্বের পরিমাণ নতুন করে নির্ধারণ করবে টাস্কফোর্স।

তালিকায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও রয়েছেন। ২০০৮ সাল থেকে খালেদা জিয়া কর পরিশোধে পে-অর্ডারের পরিবর্তে চেক জমা দিচ্ছেন। একটি চেকও এনবিআর নগদ করেনি। ফলে তিনি কর-খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত। এনবিআরের টাস্কফোর্স ২০০৮ করবর্ষ থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর কাছে বকেয়া (জরিমানাসহ) ও নিয়মিত রাজস্বের পরিমাণ ঠিক করবে। প্রয়োজনে বকেয়া আদায়ের জন্য মামলা করবে এনবিআর।

স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব গোপন করার অভিযোগ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও রয়েছে। অর্থপাচারের অভিযোগও আছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর নামে আর্থিক দুর্নীতির মামলা রয়েছে।

বিএনপি-মনোনীত ও বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মির্জ্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, আয়-ব্যয়, দেশ-বিদেশে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ পুনর্নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ রয়েছে। রাজউকের প্লটের জন্য তাঁরা আবেদনপত্রে রাজস্বসংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বলে সূত্র জানায়।


মন্তব্য