kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তিন বেদে কন্যার বিয়ে

জীবন বদলানোর কারিগর

ওমর ফারুক ও তায়েফুর রহমান   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জীবন বদলানোর কারিগর

বেদেজীবন বদলে গিয়ে এখন নতুন জীবনে বেদে কন্যারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সম্ভব। মানুষের পাশে দাঁড়ালে।

মানুষের মর্ম বুঝলে। সর্বোপরি মানুষকে মানুষ মনে করলে। বদলে যায় জীবন, বাড়ে মর্যাদা। মাছেনা খাতুন (১৮), মজিরন আক্তার (১৮) ও লিমা বিবি (১৯)। তিনজনই বেদে কন্যা। বেদে পরিবারে জন্ম নিলেও এখন তাঁরা সাপ হাতে তাবিজ-কবজ ফেরি করেন না। তাঁরা এখন গার্মেন্ট কন্যা। আর দশজন মেয়ের মতোই কাজ করে স্বাবলম্বী।

কিভাবে তাঁদের জীবন বদলে গেল? কে তাঁদের পাশে দাঁড়ালেন? সেই গল্প একটু পরে বলা যাবে। তার আগে একটা সুখবর দেওয়া যাক। গতকাল শুক্রবার সাভারের ঈদগাহ মাঠে জাঁকজমকভাবে ওই তিন বেদে কন্যার বিয়ে হয়েছে। বর ও কনের সবার বাড়িই সাভারের পোড়াবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায়।

বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। বিয়ের দাওয়াত পেয়ে উপস্থিত ছিল পোড়াবাড়ীর পুরো গ্রাম, যা বেদেপল্লীর বাসিন্দারা কল্পনাও করতে পারেনি। আর এই বিয়ের আয়োজন, তিন কন্যাকে স্বাবলম্বী করার নেপথ্যের কারিগর পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান।

জানা যায়, অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। তখনই বেদেদের কষ্টের জীবন তাঁকে পীড়িত করে। অবহেলা ও গ্লানি থেকে তাদের বাঁচানোর উদ্যোগ নেন। তাদের জন্য

গড়ে দেন একটি গার্মেন্ট। এখন সেখানে সিংহভাগ বেদে কাজ করে। হাবিবুর রহমান ভালোবাসা দিয়ে ও আর্থিক সংস্থান করে বেদেদের আর দশজনের মতো মর্যাদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তিন বছর আগে মাছেনা খাতুন, মজিরন আক্তার ও লিমা বিবির বাল্যবিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। তখন তাদের বয়স ছিল দুজনের ১৫, একজনের ১৬ বছর। বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়ে অতিরিক্তি ডিআইজি হাবিবুর রহমান বেদেপল্লীতে নজির সৃষ্টি করেছিলেন। এখন তাঁদের বয়স হয়েছে তাই নিজ হাতে বিয়ে দিলেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিয়ে উপলক্ষে গতকাল সাভারের ঈদগাহ মাঠে লেগেছিল আনন্দের ঢেউ। পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানেই হয়েছে বিয়ে। পুরো গ্রামবাসী এসেছিল বিয়ের দাওয়াতি মেহমান হয়ে। ঢাকা থেকেও গেছে কয়েকজন মেহমান। বিয়ের কেনাকাটা থেকে কন্যাদান, অতিথি আপ্যায়ন—সব কিছুই হয়েছে হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে। বিয়ে পড়ান কাজি মাওলানা আব্দুল হাবিব। বিয়ের পর পুলিশ ও উত্তরণ ফ্যাশনের উদ্যোগে নবদম্পতিদের উপহার হিসেবে নগদ অর্থ ও আসবাব দেওয়া হয়েছে। বিয়েতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান ও এম এ মালেক, ঢাকা জেলা প্রশাসক সালাউদ্দিন, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান প্রমুখ।

হাবিবুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের নিয়ম হলো কোরবানির ঈদের পর যেসব মেয়ে বিবাহযোগ্য হয় তাদের বিয়ে দেওয়া। তাদের বাল্যবিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিলে আমরা বুঝিয়ে বিয়ে ভেঙে দিতে পেরেছিলাম। যাদের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাদের সঙ্গেই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর বিয়ে দেওয়া হলো। ’

জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, যে তিনজনের বিয়ে হচ্ছে তাঁরা সবাই গার্মেন্টে কাজ করেন। তাঁদের স্বামীদের একজন গাড়িচালক, একজন সেলসম্যান, অন্যজন গার্মেন্টে কাজ করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তাঁরা কেউ পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি।

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে ওরা আমার মেয়ের মতোই। তাদের রীতি অনুযায়ী বিয়ে হচ্ছে। দিন যতই যাবে তারা সাধারণের কাতারে এসে দাঁড়াবে। এখন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তাদের জন্য একটি গার্মেন্ট করে দিয়েছি, সেখানে কাজ করে তারা সংসার চালাতে পারছে। আগের মতো ঝাড়ফুঁক করে সংসার চালাতে হচ্ছে না। ’

মজিরন আক্তারের বাবা মোস্তাকিন মিয়া বলেন, ‘আমি ছিলাম কন্যা দায়গ্রস্ত বাবা। এত ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে হবে সেটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমি পুলিশ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। ’

মোস্তাকিন মিয়া আরো বলেন, ‘তিন বছর আগে মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইছিলাম। তখন ঢাকার পুলিশ সুপার ছিলেন হাবিবুর রহমান। বাল্যবিয়ের খবর শুনে তিনি আমার বাড়ি আসেন। আমাদের বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বুঝিয়ে সেদিন বিয়ে হতে দেননি। আজ ১৮ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, যা খুব আনন্দের। যে পাত্রের কাছে সেদিন বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, ওই পাত্রের সঙ্গেই বিয়ে হলো। ’

লিমা বিবির মা অভাবী বিবি বলেন, ‘জীবনে এত খুশি হইনি। আইজ আমাগো জীবনে আনন্দের দিন। আমার মাইয়াডারে নিজের মাইয়া মনে কইরা হাবিব স্যারে সব আয়োজন করছেন। নতুন বরের হাতে তুইলা দেবেন আমার মাইয়াডারে। ’

পোড়াবাড়ী সমাজকল্যাণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক রমজান আহমেদ বলেন, ‘হাবিবুর রহমান ঢাকার এসপি থাকা অবস্থাতেই বেদেদের জীবনমান উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তাঁর হাত ধরেই বদলে যেতে শুরু করে বেদেপল্লী। উত্তরণ নামের একটি পোশাক তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয় এখানে, যেখানে কাজ করছে অসংখ্য বেদে নারী। নিজেরাই হয়েছে সচ্ছল। আমরা বলেছি, বর-কনের সুন্দর জীবন যাপনের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিয়েছেন হাবিব স্যার। তাদের প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বিয়ের আয়োজন এখন, তা নিয়েই সরগরম গোটা এলাকা। যেখানে হাবিবুর রহমান স্যার আমাদের মধ্যমণি। ’


মন্তব্য