kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিএনপি পুনর্গঠনে তোড়জোড়

শফিক সাফি   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপি পুনর্গঠনে তোড়জোড়

কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো এবং জেলা-উপজেলার কমিটি পুনর্গঠনে তোড়জোড় শুরু করেছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।

এসব বৈঠকে শিগগিরই যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে অর্ধশত জেলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। বৈঠকগুলোয় উপস্থিত একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে দল পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘সাংগঠনিক পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সাংগঠনিক জেলাগুলোয় কাউন্সিল করে কমিটি গঠনের চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। ’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, দলকে সংগঠিত ও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করতে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ও জেলা কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য, একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন যুগ্ম মহাসচিবকে নিয়ে বৈঠক করেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। স্থায়ী কমিটির ওই তিন সদস্যের মধ্যে দুজন আবার ঢাকা মহানগর কমিটিরও নেতা। বৈঠকের একপর্যায়ে কার্যালয়ের নিচে অবস্থানরত যুবদলের নেতাদের ডেকে নিয়ে বিএনপিপ্রধান তাঁদের কাছে সংগঠনের বর্তমান অবস্থা জানতে চান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে থাকা এক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, হাইকমান্ড এত দিন যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরবকে সভাপতি ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তবে ওই রাতের বৈঠকে স্থায়ী কমিটির ওই দুই সদস্য ও এক যুগ্ম মহাসচিবের পরামর্শে টুকুকে সভাপতি ও ছাত্রদলের সদ্য সাবেক হওয়া কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীবুর রশিদ হাবীবকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি দেওয়ার পক্ষে মত দেন। খালেদা জিয়াও তাতে সায় দেন। একই সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পাদক, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রথম যুগ্ম সম্পাদক কাকে করা যায় তাও জানতে চান তিনি। নেতারা এ ক্ষেত্রে মহানগর যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম মজনু, বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আ ক ম মোজাম্মেল, যুবদল নেতা মাহবুবুল হাসান পিংকু ও এস এম জাহাঙ্গীরের নাম প্রস্তাব করেন। খালেদা জিয়া এদের মধ্য থেকে সমন্বয় করে কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেন। নীরবকে কেন্দ্রীয় কমিটির যুব বিষয়ক সম্পাদক করার কথাও বলেন তিনি। আগামী ১৫ অক্টোবরের আগে যুবদলের কমিটি ঘোষণা করতে নেতাদের পরামর্শ দেন বিএনপিপ্রধান।

এদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গ্রেপ্তার হওয়ার পর দাপ্তরিক কাজগুলো দেখাশোনা করছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। যুবদলের কমিটি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই রাত ১১টার দিকে তাঁর বনানীর বাসায় হামলা করে একদল বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মী।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটিও আসছে : স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটিও ঘোষণা করা হচ্ছে। জানা গেছে, খালেদা জিয়া হজে যাওয়ার আগেই স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। সে সময় ঘোষণা করার কথা থাকলেও হয়নি। সৌদিতে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করে এসব কমিটির একটি খসড়া করেন বিএনপিপ্রধান। তার আলোকে কমিটির তালিকায় তিনি ঘষামাজা করছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি পদে থাকছেন বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবু ও সাধারণ সম্পাদক পদে আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল। তবে ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আলীমও তদবির করছেন এ পদের জন্য। আর হজের আগে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ইয়াসিন আলী, প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ও সিনিয়র সহসভাপতি পদে মোস্তাফিজুর রহমান বা গোলাম সারোয়ারের নাম রাখা হলেও এবার সাংগঠনিক পদে সাইফুল ইসলাম ফিরোজকেই বিএনপিপ্রধান যোগ্য মনে করছেন বলে নেতারা জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ইয়াসিন আলীকে প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হতে পারে।

ছাত্রদলের কমিটি এখনই নয় : এদিকে ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলতি বছরের এই সময়ে সেই কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কিন্তু এখনই ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে ভাবছেন না বিএনপি চেয়ারপারসন। জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা, যিনি বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটি বিভাগীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন তিনি জানান, বর্তমান কমিটি ২০১৪ সালে হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি এসেছে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি। এখন কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি হলে যারা দেড় বছর পর নেতা হয়েছেন তাঁরা বঞ্চিত হবেন। তাই বিএনপিপ্রধান এখনই কমিটি নিয়ে ভাবছেন না।

এদিকে ছয় মাস পর বুধবার থেকে ফের বিএনপির তৃণমূল সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে অর্ধশত জেলার কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি হবে—চেয়ারপারসনের এমন বার্তা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার নয়াপল্টনে এক ‘রুদ্ধদ্বার’ বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেন।

জানা গেছে, বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে অন্তত ১২টিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে। আংশিক কমিটি দেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি জেলায় আহ্বায়ক কমিটিও হয়েছে। গত বছরের ৯ আগস্ট তৃণমূলে চিঠি পাঠিয়ে এক মাসের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয় কেন্দ্র। এরপর রাঙামাটি, সিলেট জেলা ও মহানগর, কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নীলফামারী এবং সৈয়দপুর জেলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়। এর আগেই নেত্রকোনো জেলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের পর সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগর, দিনাজপুর ও ঢাকা জেলার আংশিক কমিটি দেওয়া হয়।

গত ১৯ মার্চ দলের জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে জেলা পুনর্গঠন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়। ওই সময় খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নোয়াখালী, খুলনা জেলা ও মহানগর, চূয়াডাঙ্গা, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নওগাঁ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ অন্তত ১৪টি জেলা কাউন্সিল উপযোগী ছিল। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ওইসব জেলা অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

খালেদা জিয়া হজে যাওয়ার আগে সর্বশেষ বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জেলা ও মহানগরে সাংগঠনিক কমিটির আকার নির্ধারণ করা হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডে ন্যূনতম ১০০ জন করে সদস্য করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন কমিটি হবে ৫১ সদস্যের। থানা বা উপজেলা পর্যায়ের কমিটি হবে ৭১ সদস্যের। আর জেলা বা মহানগর কমিটি হবে ১৫১ সদস্যের। এর মধ্যে ৭৪টি হবে কর্মকর্তা পর্যায়ের পদ, বাকি ৭৬টি সদস্য পদ। অবশ্য জেলা-মহানগরে ১৭১ সদস্যের কমিটি করার ব্যাপারেও স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হয়েছে।

বুধবারের বৈঠকে থাকা বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম বলেন, ‘চেয়ারপারসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময় ৩০ নভেম্বরের আগেই আমরা কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের চেষ্টা করব। ’

 


মন্তব্য