kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সংসদে বিল পাস

এনজিও ব্যুরোর ক্ষমতা বাড়ল

জঙ্গি অর্থায়ন কমার আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এনজিও ব্যুরোর ক্ষমতা বাড়ল

কওমি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের নাম ভাঙিয়ে অনেক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) বিদেশ থেকে অনুদান এনে সেই টাকা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের পেছনে খরচ করলেও এত দিন আইনি দুর্বলতার কারণে ওই সব এনজিওর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এখন থেকে কোনো এনজিও বিদেশ থেকে টাকা এনে জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে খরচ করার প্রমাণ মিললে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এতে ওই এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এনজিও ব্যুরোকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এনজিও ব্যুরোকে নিবন্ধন বাতিল করার পূর্ণ

ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রেখে গত বুধবার সংসদে বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন বিল, ২০১৬ পাস হয়েছে।

নতুন এ আইন বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিদেশি অনুদান ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনবে এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গি অর্থায়ন ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর কর্মকর্তারা। তবে এনজিও খাতের অনেকেই মনে করেন, এ আইন তাদের কাজের পরিধি সীমিত করবে।

পাস হওয়া বিলে দেশের সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি সংস্থা অশোভন মন্তব্য করলে এবং রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড চালালে ওই এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এনজিও ব্যুরোকে। ওই বিলে আরো বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীন কোনো নিষিদ্ধ ঘোষিত বা তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে অনুদান নিতে পারবে না। কোনো এনজিও বিদেশ থেকে অনুদান আনতে গেলে তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান নারী, শিশু, মাদক ও অস্ত্রপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব ক্ষেত্রে এনজিও ব্যুরো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাসহ নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। রাষ্ট্রপতি বিলটিতে সই করলে এটি আইনে পরিণত হবে।

এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, বিলটি পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের কাজের পরিধি আরো বেড়েছে। একই সঙ্গে তাদের হাতে কতটুকু ক্ষমতা রয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়েছে বিলে। আগে এটি অস্পষ্ট বা সংকুচিত ছিল। আইনটি কার্যকর করা গেলে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন কমে আসবে বলে মনে করেন এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তারা।

তবে সংসদে পাস হওয়া বিল নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি, পশ্চিমা বিশ্ব ও দেশের এনজিও প্রতিনিধিরা। বিএনপি নেতাদের মতে, সরকার এনজিওদের নিয়ন্ত্রণে নিতেই এই আইন পাস করেছে। আইনটি পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার এনজিওদের কণ্ঠরোধ করল বলেও মন্তব্য বিএনপি নেতাদের। অন্যদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা সফরের সময়ও বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ বিলের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছে। তখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধিরা উদ্বেগ জানিয়ে বলেছিলেন, বিলটি পাস হলে এনজিওগুলোর কাজের সুযোগ কমে যাবে, তাদের স্বাধীনতা খর্ব হবে। বিভিন্ন সময় বিদেশি প্রতিনিধিরাও বিষয়টি সরকারের কাছে তুলেছিলেন। ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্দেশীয় বেসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ গত ফেব্রুয়ারিতে ‘ম্যাপিং বাংলাদেশস পলিটিক্যাল ক্রাইসিস’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তাতে ভিন্নমত দমনে বর্তমান সরকারের চেষ্টা হিসেবে বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ বিলের প্রসঙ্গ ছিল। ঢাকাভিত্তিক অনেক এনজিও ওই বিলকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা বলে মনে করে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল।

বিলটি সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেনসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, এর মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হবে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, ‘আইনে বলা আছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিদ্বেষমূলক ও অশোভন বক্তব্য দেওয়া যাবে না। প্রশ্ন হলো বিদ্বেষমূলক ও অশোভনের সংজ্ঞা কী হবে। সংজ্ঞা তো নির্ধারণ করা হয়নি। আর স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নিয়ে কথা বললে সেটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হবে কি না তাও নিশ্চিত নয়। ’ এসব কারণে মানুষের কথা বলা ও গণতন্ত্র বিকাশের পথে এই আইন বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, এর আগে ১৯৭৮ সালে জারি করা ফরেন ডোনেশনস (ভলেন্টারি অ্যাকটিভিটি) রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স ও ১৯৮২ সালে জারি করা ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স বলে বাংলাদেশে এনজিও পরিচালনা ও বিদেশি অনুদান নেওয়া হতো। সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশ দুটি আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে গেলে এ দুটি বিল একত্র করে এ বিলটি আনা হয়।

নতুন আইনে এনজিও পরিচালনা ও বিদেশি অনুদান নেওয়ার ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাসত্মবায়ন না করারও বিধান রাখা হয়েছে। বিলের বিধান অনুযায়ী, একটি এনজিও ১০ বছরের জন্য নিবন্ধন পাবে। তবে আইন অমান্য করলে যেকোনো সময় নিবন্ধন বাতিল বা স্থগিত করা যাবে। এনজিওতে বিদেশি উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ছাড় নিতে হবে। বিদেশি অনুদান একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসেবে থাকতে হবে। ব্যয়ের হিসাব অডিট করার পর এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালকের কাছে দিতে হবে। এনজিওবিষয়ক ব্যুরো এসব বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করবে। এই আইন না মানলে প্রথমে সতর্ক করা হবে। নিবন্ধন বাতিল ও জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে বিলে।

এতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী, সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা বা কর্মচারী, এ আইনের অধীন নিবন্ধিত এনজিও বা সংস্থার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করতে পারবেন না। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তালিকাভুক্ত কিংবা নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা সত্তাও বিদেশি অনুদান নিতে পারবে না। এ ছাড়া বিলে নিবন্ধন বাতিল বা কার্যক্রম স্থগিত, বিধি প্রণয়ন ক্ষমতা, নির্বাহী আদেশ জারিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।


মন্তব্য