kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা শুরু আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এখানে ওখানে সাদা কাশবন, নিরিবিলি পরিবেশের মধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপ। মণ্ডপে দশভুজা দুর্গা যেন মূর্ত।

এক রঙেই ফোটানো হয়েছে তার ছেলেমেয়ে লক্ষ্মী-সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের রূপ। মণ্ডপ অঙ্গনের ডানে-বাঁয়ে সবুজায়ন করা হবে। বয়ে যাবে ঝর্নাধারা। এই অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশেই বসুন্ধরা সর্বজনীন পূজা কমিটি পূজা আয়োজন করেছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। গড়ে তোলা মণ্ডপে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চলছিল সাজসজ্জার সব কাজ।

বাঁধা হচ্ছিল প্যান্ডেল। লাগানো হচ্ছিল সিসি ক্যামেরা। এই মণ্ডপে প্রতিমা দেখতে দেখতেই অনেকের চোখে বয়ে যায় আনন্দের বান। লোকে লোকারণ্য না হলেও আয়োজন দেখতে সেখানে চোখ রাখছে উৎসাহী অনেকেই।

বসুন্ধরা সর্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি পবিত্র সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে আমরা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এই শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছি। এবার প্রতিমা ও সাজসজ্জায় বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। ’

শুধু এই মণ্ডপ নয়, রাজধানীতে একে একে ২২৮টি মণ্ডপেই শুরু হয়েছে ভক্তদের আনাগোনা।   অপরূপ সাজসজ্জায় সন্ধ্যায় আলোময় হয়ে উঠছে মণ্ডপগুলো। নানা আলোয় প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দময়ীর রূপ। সেই আনন্দ ছন্দ তুলছে মনে। মনের ছন্দ প্রকাশ পাবে ঢাকের কাঠির তালে।

বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার। মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়েই শুরু হচ্ছে এই উৎসব। রাজধানীর ২২৮টি মণ্ডপে তাই উৎসবের আমেজ। হাজার হাজার ভক্ত আনন্দে ভাসছে দুর্গা প্রতিমার সামনে। আগামীকাল শনিবার মহাসপ্তমী। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, শাশ্বত শক্তির উৎস দেবী দুর্গার বোধন হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। আজ (শুক্রবার) ষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে এই উৎসব শুরু হবে। আগামী মঙ্গলবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসব।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণীতে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঐক্য, পরমতসহিষ্ণুতা আর ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এ দেশের মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রেখে জাতীয় উন্নয়নে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখতে হবে। তিনি আরো বলেন, ‘সব ধর্মের মূল বাণী মানবকল্যাণ। দুর্গোৎসব সত্য-সুন্দর আর মঙ্গলালোকে উদ্ভাসিত হোক, দূরীভূত হোক সব অশুভ আর পঙ্কিলতা। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং ধর্মের মূল বাণী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে উদ্বুদ্ধ করুক। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের আরাধনা শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসবই নয়, এটি আজ সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা আরো বলেন, “বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি। আমার প্রত্যাশা, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে উৎসব পালন করব। ”

সনাতন হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে, এ বছর পৃথিবীতে দেবীর আগমন ঘটছে ঘোটকে (ঘোড়ায়) চড়ে, আর দেবী প্রত্যাগমনও করবেন ঘোটকে চড়ে। এতে ঝড়, তুফান, বজ্রপাতসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে। তবে সনাতন বিশ্বাস মতে, দেবী তাঁর অশেষ কৃপায় সবাইকে রক্ষা করেন।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পূজা প্রাঙ্গণের কোথাও চলছিল প্রতিমার গায়ে অলংকার জড়ানোর কাজ। কোথাও চলছিল সাজসজ্জার কাজ। কোথাও চলছিল প্যান্ডেল তৈরি কিংবা আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে সনাতন সমাজকল্যাণ সংঘের (সসকস) উদ্যোগে আয়োজিত দুর্গাপূজার বিশাল আকৃতির মূল ফটক অতিক্রম করলেই চোখে পড়ে মণ্ডপ। মণ্ডপের বাইরে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপের সচিত্র কাঠামো নিয়ে তৈরি হয়েছে অন্য রকম প্রাচীর। ভেতরের দেয়াল ঘিরে রয়েছে অসুরের অমরত্ব লাভ, দেবপুরীতে অসুরের অত্যাচার ও দেবী দুর্গার অসুর বধের সচিত্র কাঠামো। ধানমণ্ডি, পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, সূত্রাপুরসহ জগন্নাথ হল ও অন্যান্য মণ্ডপে ছিল বর্ণিল আয়োজন।

ঢাকা মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি ডি এন চ্যাটার্জি কালের কণ্ঠকে বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে, উৎসবময় পরিবেশে এবার শারদীয় দুর্গাপূজা হচ্ছে। সব মণ্ডপেই সাজসজ্জার ও অন্য রকম আয়োজনের প্রতিযোগিতা রয়েছে।

মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে। আজ সেখানে ষষ্ঠী বিহিত পূজা হবে। সন্ধ্যায় থাকবে ভক্তিমূলক গানের অনুষ্ঠান।

রাজারবাগে শ্রীশ্রী বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান কমিটির উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে দুর্গাপূজার। রাজধানীর শ্রীশ্রী রমনা কালীমন্দির ও শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রম পরিচালনা পরিষদ আশ্রম প্রাঙ্গণে দুর্গোৎসবের শুরুতে আজ সকাল ৮টা ২০ মিনিটের মধ্যে ষষ্ঠাদির কল্পারম্ভ হবে। শ্রীশ্রী রমনা কালীমন্দির ও শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রম পরিচালনা পরিষদের দুর্গাপূজা উদ্যাপন কমিটির সদস্যসচিব সজীব বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এবার অন্যান্যবারের চেয়ে অন্য রকম আয়োজন করেছি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে থাকবে আরতি ও ভক্তিমূলক গানের অনুষ্ঠান। ভক্তরা আসতে শুরু করবে যষ্ঠী তিথি থেকেই। ’

বনানী, কলাবাগান, মিরপুর, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপে যষ্ঠীপূজা হবে আজ।

দুর্গাপূজা ঘিরে হিন্দু পরিবারগুলোতে চলছে পরিবারের সদস্য ও স্বজনের জন্য কেনাকাটা। ঘরে ঘরে চলছে খই, মুড়ি ও তিলের নাড়ু, নারিকেলি ও হরেক রকমের মিষ্টান্ন তৈরির পর্ব।

 


মন্তব্য