kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ধর্মীয় উৎসব

এক মণ্ডপে ৬০১ প্রতিমা

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এক মণ্ডপে ৬০১ প্রতিমা

বাগেরহাটের শিকদার বাড়ির পূজামণ্ডপ। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাগেরহাট সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের শিকদারবাড়ি এখন আরাধনা আর ভক্তকুলের প্রাণবন্ত মিলনমেলা। শিকদারবাড়ি পারিবারিক মণ্ডপে এ বছর দেব-দেবীর ৬০১টি প্রতিমা সাজিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

মণ্ডপে প্রতিমার মাধ্যমে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগে বিভিন্ন দেব-দেবীর আবির্ভাব দেখানো হয়েছে। প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে মহাভারত ও রামায়ণের কাহিনী।

প্রতিবছর দুর্গোৎসবে শিকদারবাড়ি ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপ তৈরি করে থাকে। গত বছর ৪৫১টি প্রতিমা সাজিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। প্রতিবছর মণ্ডপে প্রতিমার সংখ্যা বাড়ানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিকভাবে অধিকসংখ্যক প্রতিমা নিয়ে এটিই সবচেয়ে বড় পূজামণ্ডপ। আর আয়োজকরা বলছেন, এশিয়ার মধ্যে হাকিমপুর শিকাদারবাড়ি পারিবারিক পূজামণ্ডপে সবচেয়ে বেশি প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে।

এ বছর দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যলোকে বাবার বাড়িতে আসছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পঞ্চমীতে দেবীর বোধন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় মহাষষ্ঠী, শনিবার মহাসপ্তমী, রবিবার মহাষ্টমী, সোমবার মহানবমী ও মঙ্গলবার দশমী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজা শেষে দেবী দুর্গা পুনরায় ঘোড়ায় চড়ে ফিরে যাবেন।

গতকাল শিকদারবাড়ি পূজামণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, পূজার বিশাল প্যান্ডেলজুড়ে বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কয়েকটি সারিতে মূল প্যান্ডেলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে প্রতিমা। কারিগররা তাঁদের হাতের নিপুণ ছোঁয়া আর রং-তুলিতে অপরূপ সাজে প্রতিমা সাজিয়েছেন। এসব প্রতিমা কখনো যুদ্ধংদেহি, আবার কখনো শান্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দুর্গার সৃষ্টি, সমুদ্রমন্থন, রামচন্দ্রের অকালবোধন, কুরুক্ষেত্রের মাঠে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ভীষ্মদেবের যুদ্ধ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, মহামায়ার দৈব বাণী, ক্ষিরদ সাগরে নারায়ণ অনন্ত শয্যায় শায়িত, জগন্নাথদেবের রথযাত্রা, কৃষ্ণের রাসলীলা, নৌকাবিলাস প্রভৃতি বিষয় প্রতিমার মাধ্যমে প্রস্ফুটিত করা হয়েছে।

এমনকি কবি সুকান্ত, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এবং বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকেও দেখানো হয়েছে প্রতিমার মাধ্যমে। পূজা প্যান্ডেলের পাশে পুকুরে ৪০ ফুট উচ্চতার চিত্রকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কৈলাশ পর্বত। সেখানে ওই পর্বতের ওপর ধ্যানরত অবস্থায় দেখানো হয়েছে মহাদেবকে।

শিকদারবাড়ির দুর্গাপূজার আয়োজক পল্লী চিকিৎসক দুলাল শিকদার জানান, তাঁর বাড়িতে দুর্গোৎসবের এসব জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। ধর্ম সম্পর্কে মানুষের জানার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিমার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনী তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা মণ্ডপে এসে দেব-দেবীর প্রতিমা দর্শন করে একদিকে ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারছে, অন্যদিকে আনন্দ পাচ্ছে।

দুলাল শিকদারের দাবি, এশিয়া মহাদেশের কোথাও একই প্যান্ডেলে এত বেশি দেব-দেবীর প্রতিমা সাজিয়ে কেউ দুর্গোৎসবের আয়োজন করেনি। সর্বাধিক প্রতিমা সাজিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন করতে পেরে তিনিও আনন্দিত। আগামী বছর আরো বেশি করে প্রতিমা সাজিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন করতে চান তিনি।

প্রতিমার কারিগর বিজয় বাছাড় জানান, ১৫ জন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ছয় মাস ধরে পরিশ্রম করে দেব-দেবীর ৬০১টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। নানা রঙে আর নানাভাবে প্রতিমা সাজানো হয়েছে। এসব প্রতিমা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে বলে তিনি আশা করছেন।

কেশবলাল দাস, হরিপদ পাল, দীপংকর দাস, কানাই লাল মণ্ডল, মায়া রানী পাল, স্বপ্না রানী মজুমদারসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেশ কয়েকজন দর্শনার্থী জানায়, মানুষের মুখে শুনে তারা হাকিমপুর শিকদারবাড়ি পূজা দেখতে আসে। এখানে এসে দেখে তাদের মনে হয়েছে পূজা প্যান্ডেলে যেন স্বর্গ থেকে দেব-দেবী নেমে এসেছেন। ধর্ম সম্পর্কে তারা অনেক কিছু জানতে পেরেছে। দেব-দেবীর প্রতিমা দেখে তারা মুগ্ধ। এ ধরনের বড় আয়োজন করলে সনাতন ধর্ম সম্পর্কে মানুষ আরো বেশি করে জানতে পারবে বলে তারা মনে করে।

এ বছর বাগেরহাট সদর, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, মংলা, রামপাল, ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও চিতলমারী উপজেলায় ৬০২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মণ্ডপগুলোকে বিভিন্ন সাজে সাজানো হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে পূজা, আরতি, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

শিকদারবাড়ি পূজার আয়োজকরা জানিয়েছেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর প্রধান অতিথি হিসেবে মহাষষ্ঠী পূজা এবং পরদিন ৮ অক্টোবর নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের প্রধান অতিথি হিসেবে মহাসপ্তমী পূজা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস জানান, জেলায় এ বছর ৬০৩টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যাতে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় এ জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে ৪৯৭ কেজি করে সরকারি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় জানান, দুর্গোৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপে পুলিশ, আনসার, গ্রাম পুলিশ এবং কমিউনিটি পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন মণ্ডপে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পূজার সময় পুলিশের মোবাইল ও প্যাট্রল টিম কাজ করবে। সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যা করা দরকার তা-ই করা হবে।


মন্তব্য