kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মুছার খোঁজে পুরস্কার ঘোষণা স্ত্রী বললেন ‘নতুন নাটক’

তদন্তকারীর সামনে আসছেন বাবুল আক্তার

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মুছার খোঁজে পুরস্কার ঘোষণা স্ত্রী বললেন ‘নতুন নাটক’

কামরুল ইসলাম মুছা

সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন আসামি কামরুল ইসলাম মুছাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এ ঘোষণাকে ‘পুলিশের নতুন নাটক’ বলে উল্লেখ করেছেন তাঁর স্ত্রী পান্না আক্তার।

পান্না বলেন, ‘সাড়ে তিন মাস আগে ২২ জুন সকাল ৭টার দিকেই মুছাকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। এর পর থেকেই তিনি নিখোঁজ।

এখন নতুন করে তাঁকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা কী করতে চাইছেন বুঝতে পারছি না। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মুছাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার। তিনি বলেন, ‘মিতু হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। যাদের ধরতে পেরেছি তাদের দেওয়া তথ্য মতে, মুছার নেতৃত্বে একটি দল এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। মুছার নির্দেশে ও তদারকিতে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে। সে নিজে দিয়েছে, নাকি অন্য কারো কাছ থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সেটা জানা জরুরি। মুছা গ্রেপ্তার না হওয়ায় এ বিষয়ে কিছুই জানা সম্ভব হচ্ছে না। সে যাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সে লক্ষ্যে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে। ’

এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল বাহার বলেন, মুছাকে পাওয়া গেলেই খুনের নির্দেশদাতার নাম পাওয়া যাবে। এ কারণে মুছাকে গ্রেপ্তার করা জরুরি। তিনি বলেন, মামলাসংক্রান্ত তথ্য দিতে বা মামলার বিষয়ে কথা বলতে মামলার বাদী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার শিগগিরই চট্টগ্রামে আসবেন এবং তিনি মামলার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন।

মিতু খুনের মামলাটি তদন্ত করছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। এ মামলার বিষয়ে কথা বলতে বাদী বাবুল আক্তার স্বেচ্ছায় আসছেন, নাকি তাঁকে ‘ধরে’ আনা হচ্ছে জানতে চাইলে হাসতে হাসতে কামরুজ্জামান বলেন, ‘কী যে প্রশ্ন করেন! উনি আসুক। কথা বলি। ’

মুছাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারের ঘোষণা নিয়ে চট্টগ্রামে খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেই মৃদু হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর একটি থানার ওসির দায়িত্ব পালনরত এক কর্মকর্তা বলেন, পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার! কিন্তু ওকে কি আদৌ পাওয়া যাবে? অন্য এক ওসি বলেন, এই মুছা কাহিনী অনেক দূর গড়াতে পারে। মিতু হত্যাকাণ্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে মুছার নিখোঁজরহস্যের জট। কেন এমন বলা হচ্ছে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, এর বেশি মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

এদিকে মুছাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণার তথ্য শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন তাঁর স্ত্রী পান্না আক্তার। গতকাল কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে তিন মাস ১৪ দিন আগে ২২ জুন সকাল ৭টার দিকে মুছাকে বন্দর থানা এলাকা থেকে আটক করে নিয়ে গেছে পুলিশ। ওই দিন আমাকেও কিছু দূর নেওয়া হয়েছিল। পরে ছেড়ে দেয় পুলিশ। ’ মুছাকে আটকের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বন্দর থানার ওই বাসায় আমরা নতুন উঠেছিলাম। নূরুন্নবীর মাধ্যমে বাসা ঠিক করা হয়েছিল। আমার নিজের মোবাইল নম্বর ছিল না। নতুন সেট কেনা হয়েছিল। ওই দিন ভোরে আমাদের বাসায় সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা গিয়ে অন্য একটি মোবাইল থেকে মুছার সঙ্গে কথা বলতে আমাকে বাধ্য করেন। মুছার সঙ্গে তখন আমাদের ওই মোবাইল ফোন দিয়েই যোগাযোগ হতো। মুছা যখন ফোন করে তখন পুলিশের উপস্থিতি যেন সে বুঝতে না পারে সে জন্য আমাকে ও সেখানে উপস্থিত নূরুন্নবীকে পুলিশ কড়াভাবে নিষেধ করে। ওই সময় ফোন করে মুছা বাসায় আসছিলেন। আর আমি দুই বাচ্চাকে নিয়ে কাঁদছিলাম। মুছা ফোন করলেন, মোবাইলের লাউডস্পিকার দিয়ে কথা হলো। মুছা বুঝতে পারলেন না বাসায় পুলিশ এসেছে। কথা বলার কিছু সময় পর মুছাকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। ’

পান্না বলেন, ‘মুছাকে পুলিশই আটক করেছে। আর তিনি পুলিশের হেফাজতেই আছেন। কিন্তু জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না। আর এখন পুলিশ তাঁকে আটকের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করছে। ’ মুছাকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর আইনের আশ্রয় নেননি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে পান্না বলেন, ‘তখন মুছাসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে আটক করেছিল পুলিশ। বেশ কয়েক দিন আটক রাখার পর অন্যদের ছেড়ে দেয়। এ জন্য ওই সময় আইনের আশ্রয় নেওয়ার মতো অবস্থা আমাদের ছিল না। ’ এত দিনেও কেন আইনের আশ্রয় নেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চেষ্টা করেছি; কিন্তু আমাকে পুলিশের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। আমি অসহায় হয়ে পড়েছি। ’ কী ধরনের চাপ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুছাকে আটকের পর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম। সর্বশেষ গত ২৫ জুলাই আরেক দফা সংবাদ সম্মেলনের চেষ্টা করেছিলাম। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন না করতে চাপ দেওয়া হয়। ’

মুছাকে আটকের বিষয়ে তাঁর স্ত্রীর অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ‘আইন অনুযায়ী কেউ যদি কোনো অভিযোগ করেন, তাহলে সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। উনি (পান্না আক্তার) প্রমাণ করুন যে পুলিশ মুছাকে আটক করেছে। আর আমি প্রমাণ করতে পারব, মুছাকে পুলিশ আটক করেনি। ’

মুছাকে পুলিশ আটক করেছে এমন কী প্রমাণ আছে জানতে চাইলে পান্না আক্তার বলেন, ‘আমি ভিডিও করে কিংবা কারো বক্তব্য রেকর্ড করে রাখতে পারিনি। সেই পরিস্থিতিও ছিল না। আমার সামনে যা হয়েছে, যা দেখেছি, শুনেছি, তা-ই বলছি। স্বামীকে আটকের বিষয়ে মিথ্যা বলার কী আছে। ’

মুছা শিকদারকে আটকের বিষয়ে স্ত্রীর দাবি সমর্থন করেন নগর পুলিশের অনেক পদস্থ কর্মকর্তা। ওই সময় যাঁদের আটক করা হয়েছিল তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও জেনেছে। আটককৃতরা মুছাকে দেখেছেনও। কেউ কেউ মুছার সঙ্গে একই কক্ষে থাকার তথ্যও তাঁদের স্বজনদের বলেছেন। কিন্তু পুলিশের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হচ্ছেন না। এমনকি নগর পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মধ্যে যাঁরা মুছাকে আটকের সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁরাও বিষয়টি এখন অস্বীকার করছেন। তবে বেশির ভাগ কর্মকর্তার ভাষ্য মতে, মুছা এখন রহস্যজনক নিখোঁজ। কর্মকর্তারা এটাও মনে করেন, ঘোষিত পুরস্কারের টাকা কারো পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

প্রসঙ্গত, গত ৫ জুন সকালে নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার সময় দুর্বৃত্তের গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন তৎকালীন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। শুরুতে পুলিশ জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার কথা বললেও পরে খুনের ঘটনার নাটকীয় মোড় নেয়। এ ঘটনার জের ধরে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি চাকরিচ্যুত হন।


মন্তব্য