kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বগুড়ায় দুই জঙ্গির আত্মসমর্পণ

দশ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

লিমন বাসার, বগুড়া   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বগুড়ায় দুই জঙ্গির আত্মসমর্পণ

বগুড়া শহীদ টিটু মিলনায়তনে গতকাল আত্মসমর্পণকারী জঙ্গির হাতে পুনর্বাসনের জন্য পাঁচ লাখ টাকার চেক তুলে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। র‌্যাব-১২-এর উদ্যোগে জঙ্গিবাদ বিরোধী সমাবেশ ও জঙ্গি আত্মসমর্পণের এ আয়োজন করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) দুই সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে। নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে বগুড়ার আব্দুল হাকিম (২২) ও গাইবান্ধার মাহমুদুল হাসান বিজয় (১৭)।

বগুড়ার শহীদ টিটু মিলনায়তনে গতকাল বুধবার জঙ্গিবাদবিরোধী সুধী সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে জেএমবির এই দুই সদস্য। এ সময় অন্ধকার রাস্তা ছেড়ে সৎ জীবনযাপনের জন্য সরকারের পূর্বঘোষিত পুরস্কারের পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকার চেক তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আমরা কাউকে হত্যা করতে চাই না। আমরা চাই সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, সব মানুষ ভালো থাকবে। প্রধানমন্ত্রীও চান না কেউ বিপদে পড়ুক, কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হোক। আর সেটা চান না বলেই এই কাজ সম্ভব হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে ক্ষমতা তাতে সামান্য কয়েকজন জঙ্গিকে ইচ্ছে করলে যেকোনো সময় যেকোনো স্থান থেকে ধরে নির্মূল করতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেটা চান না। ’

জঙ্গিদের উদ্দেশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা যারা বিপথগামী, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সব ব্যবস্থা করা হবে। আত্মসমর্পণের দরজা সব সময় খোলা থাকবে। তা না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজে বের করে নিয়ে আসবে। ’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসব জঙ্গির মদদদাতা, অর্থদাতা ও উসকানিদাতারা ঘাঁপটি মেরে আছে। আমরা তাদের চিহ্নিত করেছি। এবার খুঁজে বের করব। ’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, বিনা কারণে রক্তপাত ইসলাম সমর্থন করে না। শান্তির ব্যানার ব্যবহার করে যারা দেশে অশান্তি করছে সেই শকুনিদের ডানা ও কলিজা ছিঁড়ে ফেলা হবে। র‌্যাব তার জন্মলগ্ন থেকে জঙ্গি দমনে কাজ করছে। এ পর্যন্ত এক হাজার ২১৬ জনকে আটক হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬৪৩ জনের সরাসরি জেএমবি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন র‌্যাব-১২ অধিনায়ক শাহাবুদ্দিন খান, বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম ওমর, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মমতাজ উদ্দিন, ইমাম-মুয়াজ্জিন সমিতির সভাপতি মুফতি আব্দুল কাদের, আত্মসমর্পণ করা জঙ্গি বিজয়ের মা আক্তার জাহান ও আবদুল হাকিমের বড় ভাই আব্দুল হালিম।

র‌্যাব-১২ বগুড়া কম্পানির অধিনায়ক মেজর এ এফ এম আজমল হোসেন খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, বিজিবি নওগাঁর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জাহিদ হাসান, র‌্যাবের পরিচালক (মিডিয়া) মুফতি মাহমুদ খান এবং র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে শুরুতে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে আত্মসমর্পণ করা দুই জঙ্গিও বক্তব্য দেয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আবদুল হাকিমের মা সুফিয়া বেগম দাবি করেন, গত ১৪ জুলাই হাকিমকে বগুড়া র‌্যাব-১২-এর ক্যাম্পে সোপর্দ করা হয়। এত দিন ধরে হাকিম র‌্যাব হেফাজতেই ছিল। তাঁকে র‌্যাবে সোপর্দ করার বিষয়টি স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ এলাকাবাসীও জানে।

আব্দুল হাকিম : জেএমবির জঙ্গি আব্দুল হাকিমের বাড়ি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামে। বাবার নাম আব্দুর রহমান। শুরুতে সে ব্র্যাক স্কুলে পড়ালেখা করে। এরপর ভর্তি হয় কামারপাড়া সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর কুষ্টিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। দুই বছর লেখাপড়ার পর ভিহিগ্রাম এডিইউ সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০১৩ সালে দাখিল পাস করে। ২০১৫ সালে আলিম পাস করে। হলি আর্টিজান হামলায় নিহত জঙ্গি খাইরুল ইসলাম তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তারা আগে একই সঙ্গে ফাজিল মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেছে। খাইরুলের প্ররোচনায় হাকিম জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে।

আব্দুল হাকিম জানায়, জঙ্গি তৎপরতায় খাইরুল তার চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিল। এ কারণে খাইরুল যখন জঙ্গি হামলায় অংশ নেয় হাকিম তখনো প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। তাকে রাজধানীর মিরপুরের একটি আস্তানায় নিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদী পুঁথিগত শিক্ষা ও অস্ত্র চালনার পাশাপাশি শারীরিক কসরত শেখানো হতো। আস্তানায় অনেক জঙ্গি নেতার আসা-যাওয়া ছিল। তিনজন প্রশিক্ষক তাদের যুদ্ধের ব্যাপারে ক্লাস নিতো। কিন্তু হলি আর্টিজান হামলার পর জঙ্গিদের নৃশংসতা সে মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে ওই ভুল পথে আর পা না বাড়িয়ে আত্মসমর্পণ করেছে।

মাহমুদুল হাসান বিজয় : মাহমুদুল হাসান বিজয়ের জন্ম গ্রামের একটি অতি সাধারণ পরিবারে। বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার হাটভরতখালী গ্রামে। বাবা সেকেন্দার আলী বেঁচে নেই। শিক্ষা জীবনের শুরুতে সে খণ্ড খণ্ডভাবে মূল ধারা ও মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছে। ২০১১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। পরে সে মুফতি জসীম উদ্দিন রহমানির ওয়াজ ও বই পড়ে ধর্মীয় উগ্রবাদে আকৃষ্ট হয়ে জেএমবিতে যোগ দেয়। সে বোনারপাড়া, মহিমাগঞ্জ, সারিয়াকান্দি ও বগুড়া শহরে জেএমবির একাধিক সভায় যোগ দিয়েছে। প্রশিক্ষণও নিয়েছে। এ ছাড়া ঘুরে ঘুরে অস্ত্র কেনার জন্য ইয়ানত সংগ্রহ করত। প্রশিক্ষণে তাকে বোঝানো হয়েছে যে জিহাদের মাধ্যমে সরাসরি জান্নাত লাভ করা সম্ভব।

বিজয় জানায়, জঙ্গি প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে শিয়া মুসলিম, খ্রিস্টান ও হিন্দু পুরোহিতদের টার্গেট করে হত্যা বা তাতে সহযোগিতার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে থ্রিমা ও ভিপিএন অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে সে অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য উত্তীর্ণ হয়। এ জন্য তাকে ঢাকায় যেতে বলা হয়। কিন্তু তার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে ভীত হয়ে সে আত্মসমর্পণ করে।


মন্তব্য