kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভবদহের দুর্গতদের পুলিশের লাঠিপেটা

আহত অর্ধশতাধিক অবরোধ কর্মসূচি ভণ্ডুল

বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভবদহের দুর্গতদের পুলিশের লাঠিপেটা

নওয়াপাড়ায় গতকাল ভবদহে পানিবন্দিদের কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন আন্দোলনের নেতা রণজিত বাওয়ালী ও ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ইকবাল কবীর জাহিদ। ছবি : ফিরোজ গাজী

দুই মাস ধরে পানিবন্দি অবস্থায় অবর্ণনীয় দুর্গতির মধ্যে রয়েছে ভবদহের কয়েক লাখ মানুষ। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে তাদের দুর্দশার হাত থেকে রক্ষার দাবি জানাতে গতকাল বুধবার রাস্তায় নেমেছিল কয়েক হাজার লোক।

কিন্তু পুলিশের লাঠিপেটায় রক্তাক্ত হয়ে তাদের ফিরে যেতে হয়েছে।

যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের হামলায় আহত হয়েছে ৫০ জনেরও বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু।

দুপুরে স্থানীয় স্বাধীনতা চত্বর এলাকায় ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির কর্মসূচি শুরু করতেই পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ইকবাল কবির জাহিদ, কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব চৈতন্য পাল, সমন্বয়ক বৈকুণ্ঠবিহারী রায়ও। তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।  

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালন করার জন্য সকাল থেকে জলাবদ্ধ এলাকার মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে যশোর-খুলনা মহাসড়কের নওয়াপাড়ার প্রেমবাগ এলাকায় আসতে শুরু করে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সহস্রাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু প্রেমবাগ এলাকায় অবস্থান নেয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে দাবি জানিয়ে সংগ্রাম কমিটির নেতারা বক্তব্য দেওয়ার সময় পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করে।

কমিটির নেতাদের অভিযোগ, পুলিশ বিনা উসকানিতে পানিবন্দি এলাকার এসব মানুষের ওপর বেপরোয়া হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া কর্মসূচিতে জোগদানের পথেও বিভিন্ন  স্থানে বাধা দেওয়া হয়েছে।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিত বাওয়ালী জানান, পুলিশের লাঠিপেটায় তাঁদের নির্ধারিত সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি ভেস্তে গেছে। পুলিশ তাঁদের রাস্তায় দাঁড়াতেই দেয়নি।

পুলিশের লাঠিপেটায় আহতদের মধ্যে আরো রয়েছেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতা শচীন মণ্ডল, বিষ্ণু বিশ্বাস, রাজু আহমেদ, ইন্তাজ আলী ইনু, শরিফ উদ্দিন, বাহারুল ইসলাম, কিশোর অধিকারী প্রমুখ।

হামলার শিকার কয়েকজন নারী-পুরুষ জানান, তাঁরা কোনো দল করতে রাস্তায় আসেননি। তাঁদের ঘরে পানি, উঠানে পানি। পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। তাই স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার দাবি জানাতেই তাঁরা রাস্তায় এসেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, এই দুর্গত মানুষগুলোর ওপর কেন পুলিশ লাঠিপেটা করল?

সংগ্রাম কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব আহত চৈতন্য পাল জানান, তাঁরা নওয়াপাড়া স্বাধীনতা চত্বরে রাস্তার ওপরে বসে পড়লে পুলিশ হামলা চালায়। এ ছাড়া সংগ্রাম কমিটির নেতাদের উদ্দেশে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে পুলিশ। পরে জলাবদ্ধ এলাকার মানুষ স্থানীয় পশু হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশে আহত ইকবাল কবির জাহিদসহ নেতারা বক্তব্য দেন।  

ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন নিয়ে প্রশাসন তালবাহানা করে চলেছে। এ কারণে এ অঞ্চলের পাঁচ সহস্রাধিক নারী-পুরুষ অবরোধ কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসে। কিন্তু পুলিশ তাদের বাঁধা দেওয়ায় তারা রাস্তায় বসে পড়ে। এরপর পুলিশ বিনা উসকানিতে তাদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে। তিনি আরো বলেন, ‘রাস্তায় শুইয়ে ফেলে মানুষকে পেটানো হয়েছে। এ সরকারের আমলে পুলিশ যে আচরণ করেছে তা স্বৈরাচার সরকারকেও হার মানিয়েছে। ’

তবে দুর্গত মানুষের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভয়নগর থানার ওসি আনিসুর রহমান। তিনি দাবি করেন, ‘আন্দোলনকারীরা পুলিশের ওপর চড়াও হলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ’ জলাবদ্ধ এলাকার মানুষের জন্য সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে দাবি করে ওসি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে আবার সড়ক অবরোধ করার কী দরকার?’

উল্লেখ্য, যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলের তিন লাখের বেশি মানুষ জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। গত দুই মাসের জলাবদ্ধতার কারণে ভবদহ এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ। এর আগে থানা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাজপথে অবস্থান কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে। পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসন হয়নি।


মন্তব্য