kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঢাকাবিষয়ক প্রকাশনা

আজিম বখেশর সংগ্রহশালা

আপেল মাহমুদ   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আজিম বখেশর সংগ্রহশালা

ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক আজিম বখেশর হাতে বই তুলে দেন গবেষক শাহজাহান মিয়া

৪০৭ বছরের প্রাচীন ঢাকার আদ্যপ্রান্ত জানতে চান? অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কাঙ্ক্ষিত তথ্যটি পাচ্ছেন না? কিছুটা হলেও সাহায্য পেতে পারেন আজিম বখেশর ঢাকা কেন্দ্রে। এখানে এক ছাদের নিচে ঢাকাবিষয়ক ছয় হাজার প্রকাশনা রয়েছে।

ঢাকার ইতিহাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসসংবলিত বই, পত্রিকাসহ নানাবিধ প্রকাশনার বিশাল ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে এখানে।

পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের মোহনীমোহন দাস লেনে অবস্থিত আজিম বখেশর ঢাকা কেন্দ্র। মাওলা বখ্শ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের আওতায় চলছে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চা প্রকল্প ঢাকা কেন্দ্র। ১৮ বছর আগে ফরাশগঞ্জের আদি বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিম বখ্শ গড়ে তুলেছেন এই ট্রাস্ট।

পুরান ঢাকার ইতিহাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছেন পশ্চিমবঙ্গের গবেষক অমলচন্দ্র ত্রিপাঠী। এ জন্য প্রায় এক যুগ ধরে তিনি ঢাকার খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব রেবতীমোহন দাসের আত্মজীবনী খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এ জন্য ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমারসহ  বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রন্থাগারে গেছেন। কিন্তু কোথাও দুষ্প্রাপ্য বইটির হদিস পাননি। এতে হতাশ হয়ে গবেষণাকাজটি বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। এর মধ্যে খবর পান পুরান ঢাকার একটি গ্রন্থাগারে এর একটি কপি রয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রের সেই গ্রন্থাগারে যোগাযোগ করে তিনি তা সহজে পেয়েও যান। শুধু রেবতীমোহন দাসের আত্মজীবনীই নয়, সেখান থেকে ঢাকাবিষয়ক আরো কিছু প্রকাশনা পেয়েছেন।  

জানা যায়, আজিম বখ্শ ১৯৯৭ সালে নিজ বাড়িতে দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন ঢাকাবিষয়ক বই-পুস্তক, ম্যাগাজিন, জার্নাল, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করছিলেন। পরে চিন্তা করলেন, কাজটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না দিলে তা হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছবে না। এ কারণে প্রয়াত বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত মাওলা বখ্শ সরদারের মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন ঢাকা কেন্দ্র।

মাওলা বখ্শ সরদার পঞ্চায়েত সরদারির পাশাপাশি পুরান ঢাকার একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর ছেলে আজিম বখ্শ বাবার পথ ধরে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী না হয়ে ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুসন্ধানী হয়ে গেলেন। তাঁর দাদা ঢাকার ২২ পঞ্চায়েত সরদার পেয়ার বখ্শ সরদারও ঢাকার ঐতিহ্য ও সামাজিক বিষয় নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্য, বই সংগ্রহের পাশাপাশি ঢাকার বনেদি পরিবার ও পঞ্চায়েত সরদারদের নিদর্শন এবং ছবি সংগ্রহে মনোনিবেশ করেন। তাঁর জীবনের ধ্যান-ধারণা এবং স্বপ্ন-সাধনায় পরিণত হয় ঢাকা কেন্দ্র। কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করলেই সেটা বোঝা যায়। আলমিরার তাকে থরে থরে সাজানো রয়েছে ঢাকাবিষয়ক নতুন-পুরনো নানা বই-পুস্তক, জার্নাল, স্মরণিকা, পত্রপত্রিকাসহ নানা প্রকাশনা। এর সংখ্যা সব মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার।

পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দা মো. করিম আনসারী বলেন, “পাকিস্তান আমলে ঢাকা পৌরসভার ১০০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হয়। সে অনুষ্ঠান উপলক্ষে আজিমুশ্বান নামে এক ব্যক্তি ‘ঢাকা পৌরসভার শতবর্ষ গ্রন্থ’ সম্পাদনা করেন। ইংরেজিতে প্রকাশিত এ শতবর্ষ গ্রন্থটির নাম শুনেছি অনেক। কখনো চোখে দেখিনি। একদিন ঢাকা কেন্দ্রে ঘুরতে এসে তাদের গ্রন্থাগারে দেখি পুরনো বইটি সাজানো রয়েছে। সেখানে বসে বইটি পড়ে মনের দীর্ঘদিনের আশা পূরণ করি। তা ছাড়া গ্রন্থাগারের একটি কক্ষে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর জটাধারী একটি রঙিন ছবি টাঙানো দেখতে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। ব্রিটিশ আমলে ছবিটি বাকল্যান্ড বাঁধের ওপরে সন্ন্যাসীকে বসা অবস্থায় তোলা হয়েছে। ”

ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিম বখ্শ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পারিবারিক অর্থায়নে ঢাকা কেন্দ্র প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকাবিষয়ক বই-পুস্তকের পাশাপাশি আমরা ঢাকার বনেদি পরিবার এবং সরদারদের নিদর্শন ও জীবনীমূলক প্রকাশনা সংরক্ষণ করছি। যাঁরা ঢাকাকে জানতে চান কিংবা ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করছেন, তাঁদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা হয়। যেকোনো পুরনো ও দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ফটোকপি দেওয়া হয়। ঢাকা কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে বসে যে কেউ যেকোনো বই পাঠদান করতে পারেন। ’

সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রের কার্যাবলি বৃহৎ আকারে শুরু করা হয়েছে। শুধু ঢাকা নগরী নয়, বৃহত্তর ঢাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতি রক্ষা এবং সংরক্ষণের কাজ করছে তারা। ঢাকার পাশাপাশি বিক্রমপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও জয়দেবপুরের অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রকাশনা এবং নিদর্শন সংগ্রহ করা হচ্ছে ঢাকা কেন্দ্রের জন্য। শুধু বইপত্র সংগ্রহই নয়, ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা কেন্দ্র থেকে ঢাকাবিষয়ক দুষ্প্রাপ্য বইয়ের পুনর্মুদ্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে তারা ঢাকা রচনাপঞ্জি সংকলন নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। ওই বইয়ে ঢাকাবিষয়ক বই-পুস্তক, ম্যাগাজিন, জার্নাল, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের একটি বিশাল তালিকা দেওয়া হয়েছে। এ দেশে এ ধরনের প্রকাশনা এটাই প্রথম।

ঢাকা কেন্দ্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হলো ‘ত্রৈমাসিক ঢাকা’ পত্রিকা। বিষয়ভিক্তিক পত্রিকাটি ইতিমধ্যে ঢাকাপ্রেমী পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য পেয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ঢাকার চলচ্চিত্র, পঞ্চায়েত সরদার, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, ঢাকার ব্যাংক প্রভৃতি বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি সংখ্যা ত্রৈমাসিক ঢাকা প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, পত্রিকাটি ভবিষ্যতে আরো বৃহৎ কলেবরে প্রকাশ করা হবে। পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি ঢাকা গবেষক ও প্রবীণ বাসিন্দাদের নিয়ে প্রায়ই ঢাকা কেন্দ্র আড্ডার আয়োজন করে থাকে। সেখানে একেক সময় একেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বিক্রমপুর গবেষক ও বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘরের কিউরেটর মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘এখানে না এলে কখনো চিন্তাও করতে পারতাম না, ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিম বখ্শ ঢাকার পুরনো ইতিহাস নিয়ে কত বড় কাজ করছেন। একজন মানুষ কতটা আন্তরিক হলে একটি শহরকে ভালোবেসে সে শহরের হাজার হাজার প্রকাশনা, নিদর্শন এক ছাদের নিচে জড়ো করতে পারেন। তাঁর এ মহতী কাজের প্রশংসা না করে বরং তাঁর মূল্যায়ন করা দরকার। ’

 


মন্তব্য