kalerkantho


গুলশান হত্যাযজ্ঞ

হাসনাত জড়িত কি না নিশ্চিত নয় পুলিশ

গ্রেপ্তার হওয়া কারো সংশ্লিষ্টতা মেলেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হাসনাত জড়িত কি না নিশ্চিত নয় পুলিশ

গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার তাহমিদ হাসিব খানের জামিনের পর পুলিশ বলছে, একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হাসনাত রেজা করিম ওই ঘটনায় জড়িত কি না সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটেরও প্রধান।  

গুলশান হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গত ৩ আগস্ট তাহমিদ ও হাসনাতকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখায় সিটিটিসি ইউনিট। তারপর দুজনকে একাধিকবার হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ (রিমান্ড) করা হয়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাতকে গত ১৩ আগস্ট এ হামলার মামলায় আসামি করা হয়। তবে কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাহমিদ সন্দেহভাজন হিসেবেই গ্রেপ্তার ছিলেন। গত রবিবার তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশান হামলার ঘটনার পর তাহমিদ, হাসনাতসহ এক ডজন ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে তিন মাসের তদন্তে এখনো ঘটনার সঙ্গে তাদের কারো সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। অভিযানে নিহত হলি আর্টিজানের কর্মী সাইফুল ইসলাম ও জাকির হোসেন শাওনেরও সম্পৃক্ততা পাননি তদন্তকারীরা। এমনকি আহত অবস্থায় আটক দুজনের হদিসই মিলছে না।

ব্রিফিংয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, তাহমিদ গুলশান হামলা মামলার আসামি নন। তদন্তে এখন পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে তাঁর জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্য গোপন ও অসহযোগিতার কারণে তাঁকে ৫৪ ধারায় আটক করা হয়েছিল। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে ফের তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হবে।

হাসনাত করিম সম্পর্কে মনিরুল ইসলাম বলেন, হাসনাত করিম গুলশান হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন আসামি। তিনি ওই ঘটনায় জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁকে টিআইএফ সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। ওই প্রতিবেদন এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া তাঁর জবানবন্দি মিলিয়ে সিদ্ধান্তে আসা যাবে তিনি (হাসনাত) জড়িত কি না।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান আরো বলেন, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গুলশান হামলার ঘটনায় তদন্ত করছে। হামলার ঘটনায় জড়িত মাস্টারমাইন্ডদের কয়েকজন ইতিমধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে মারা গেছে। এ ছাড়া তদন্তে যাদের নাম এসেছে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পলাতক মারজান, জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব, চকলেট ওরফে বাশারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করতে পারলে এ ঘটনার পুরো রহস্য উন্মোচিত হবে।  

আজিমপুরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত তানভীর কাদেরীর ছেলে রাসেলের জবানবন্দির বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশানে হামলাকারীদের বিষয়ে পুলিশ আগে যেসব তথ্য পেয়েছিল তার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে রাসেলের দেওয়া বর্ণনা থেকে। আদালতে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে গুলশান হামলা সম্পর্কে কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর আগে পুলিশের কাছে যেসব তথ্য ছিল, তা ছিল গোয়েন্দা তথ্য। আর কল্যাণপুরের অভিযানে আহত রাকিবুল হাসান রিগ্যানকেও গুলশান হামলার মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।  

সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র কোন পথে এসেছে, জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, অস্ত্র কার কাছে এসেছে, কিভাবে এসেছে সেটা ইতিমধ্যে জানা গেছে। কিন্তু নেপথ্যের ব্যক্তি কে, তা এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। গুলশান হামলার জন্য তৃতীয় একটি দেশ থেকে ভারত হয়ে দুই ধাপে প্রায় ২০ লাখ টাকা এসেছিল। এই টাকা গ্রহণ করে চকলেট ওরফে বাশারুজ্জামান।

গুলশান হামলার ঘটনায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সর্বশেষ ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ওই ভিডিওতে তাহমিদ রহমান সাফি নামের একজনের নাম পাওয়া গেছে। সে সাবেক নির্বাচন কমিশনার শফিউর রহমানের ছেলে। নব্য জেএমবি সদস্য সাফির পালিয়ে সিরিয়ায় চলে গেছে। ভিডিওতে যে কণ্ঠ শোনা গেছে তাও সাফিরের। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের পক্ষে সে ওই ভিডিও প্রকাশ করে। তবে তাতে সিরিয়ার যে ছবি দেখা গেছে, সাফি তা এডিট করে যুক্ত করেছে। ভিডিওটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাতে যে ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করা হয়েছ, তা পরে যুক্ত করা হয়েছে। গত ৫ জুলাই গুলশান হামলাকারীদের প্রশংসা করে আইএসের নামে যে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছিল তাতেও সাফি অংশ নিয়েছিল। তখনই তার পরিচয় জানা যায়। দেশে এলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

নব্য জেএমবি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে কিছু তরুণ সহিংসতায় জড়িত হয়ে পড়েছে। তারা নব্য জেএমবিকে একটি আদর্শিক সংগঠন মনে করছে। যদিও জঙ্গিদের কোনো আদর্শ নেই। নব্য জেএমবিকে সমূলে বিনাশ করতে না পারলে সুযোগমতো তারা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এ জন্য গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর যে গণসচেতনতা তৈরি হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে হবে।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক কমান্ডার মেজর (বরখাস্ত) জিয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, কারো কারো ধারণা, মেজর জিয়া দেশের বাইরে আছেন। কিন্তু প্রায় দুই মাস আগে তাঁকে ঢাকার আশপাশে কোনো একটি জায়গায় দেখা গেছে বলে এক ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। দেশেই কোথাও আত্মগোপনে আছেন তিনি। তবে কোন এলাকায় আছেন তা জানা যায়নি।

কারো সংশ্লিষ্টতা মেলেনি : তাহমিদের জামিনের পর সিটিটিসি ইউনিটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা গত রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নব্য জেএমবির নিহত ও শনাক্ত হওয়া কয়েকজন জঙ্গি ছাড়া আর কারো এখন পর্যন্ত এ মামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। ’ সম্প্রতি সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, ঘটনার সঙ্গে নিহত রেস্তোরাঁকর্মী শাওন ও সাইফুলের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যায়নি।  

গত ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন। অভিযানের আগে ও পরে রেস্তোরাঁ থেকে ৩৫ জন জীবিত অবস্থায় বের হয়েছে। তাদের একজন রেস্তোরাঁর সন্দেহভাজন কর্মী শাওন। স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত শাওন পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আরেক সন্দেহভাজন কর্মী সাইফুল অভিযানের সময়ই নিহত হয়। অক্ষত যে ৩২ জনকে উদ্ধার করা হয় তাদের মধ্যে পাঁচজন বিদেশি। উদ্ধারের পর হাসনাত ও তাহমিদকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার দাবি করে। তবে উভয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার পর থেকেই তাঁদের হদিস মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত গত ৩ আগস্ট পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার দেখায়।

সেই বাড়ির মালিকদেরও সংশ্লিষ্টতা মেলেনি : সূত্র জানায়, গত ১৬ জুলাই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রোভিসি অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহসানকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে আদালতের নির্দেশে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গুলশান হামলায় জড়িতদের বাসা ভাড়া দেওয়া এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই অভিযোগে তাঁর ভাগ্নে আলম চৌধুরী ও ভবনের ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান তুহিনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। গিয়াসের বারিধারার বাসায়ই ভাড়া ছিল গুলশান হামলায় জড়িত জঙ্গিরা।

তবে গ্রেপ্তার তিনজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মেলেনি জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার প্রমাণ। সম্প্রতি গিয়াস জামিন পেয়েছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।

একইভাবে জঙ্গিদের কাছে বাসা ভাড়া দেওয়ার অভিযোগে ঢাকার পশ্চিম শেওড়াপাড়ার একটি বাড়ির মালিক নুরুল ইসলামকেও ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তবে ওই বাসায় জঙ্গিরা সংগঠিত হলেও ঘটনার সঙ্গে নুরুল ইসলাম জড়িত ছিলেন না বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

‘জঙ্গির অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই’ : উদ্ধার অভিযানের পর পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে উদ্ধার করা হয় হলি আর্টিজানের পাচক সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের লাশ। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার সময় জঙ্গিদের সহায়তা করা ছাড়াও তাদের সঙ্গেই ছিল সে। তবে পরবর্তী তদন্তে সাইফুলের জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। গত ২৩ সেপ্টেম্বর পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে বেওয়ারিশ হিসেবে তার লাশ দাফন করা হয়। এ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ তার স্বজনরা। সাইফুলের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামে। তার মামাতো ভাই আবু সাঈদ বলেন, ‘আমার ভাই জঙ্গি ছিল না। পুলিশও এটা স্বীকার করছে। এর পরও তারা আমাদের লাশ দিল না। আমরা এই জঙ্গির অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই। ’

হলি আর্টিজানের আরেক কর্মী শাওনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার নয়াপাড়ায়। গত ১০ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শাওনের মৃত্যুর পর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার মা মাসুদা বেগম এখনো কেঁদে বলছেন, ‘সবাই এমনভাবে বলছে, যেন আমার ছেলে জঙ্গি। কিন্তু ও তো জঙ্গি না। জঙ্গির অভিশাপ নিয়া ওকে মরতে হলো। যারা এমন করছে আমরা তাদের বিচার চাই। ’

কয়েকজনের হদিস নেই : গুলশান হামলার পর আহত অবস্থায় দুজনকে আটকের তথ্য পাওয়া যায়। জাকিরুল ইসলাম (২৫) ও নাজরুল সারেন (২০) নামের এ দুজনকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ৫ জুলাই দুজনকেই ১০২ নম্বর ক্যাজুয়াল্টি ব্লকে পুলিশ হেফাজতে ভর্তি করা হয়। ১৩ জুলাই তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। হাসপাতালে নথিপত্রে তাদের কোনো ঠিকানা নেই। শুধু বাহক হিসেবে গুলশান থানার এসআই তাহেরের নাম লেখা আছে। তবে পরে তারা কোথায় গেছে, তা কেউ বলতে পারছে না। গুলশান থানার এসআই আবু তাহের বলেন, ‘আমি দুজনকে ভর্তি করেছিলাম। তাদের একজন বাবুর্চি ছিল, পরে মারা গেছে। আরেকজনের কী হয়েছিল জানি না। হয়তো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ’

হামলা মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা সিটিটিসি ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম গত সপ্তাহে বলেন, ‘জাকিরুল ইসলাম ও নাজরুল সারেন এমন নামে কাউকে আমরা আটক করিনি। ’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৬ জুলাই আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকা থেকে মিলন হোসাইন নামের এক স্কুল শিক্ষককে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। মিলন নিহত জঙ্গি শফিকুল ওরফে উজ্জলের বন্ধু বা সহযোগী। তবে উজ্জলের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও এখনো মিলনের কোনো জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার খোঁজ পাননি তদন্তকারীরা।  


মন্তব্য