kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিলুপ্ত ছিটে স্মার্ট কার্ড

সেই বঞ্চনা, এই মর্যাদা

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সেই বঞ্চনা, এই মর্যাদা

জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড হাতে দাশিয়ারছড়াবাসী। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘মোর এক ঠ্যাং কবরোত গেইছে। কোনো দিন ভোট দিবার পাই নাই।

ছিটমহলোত চোরের মতো বাস করেছি। এলা কাডকোনা হাতোত পায়য়া মনে হইল হামরা দ্যাশের নাগরিক হইছি। ’ কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার ৯০ বছরের বৃদ্ধা জয়নব বেওয়া এখন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড হাতে পেয়ে তিনি ভীষণ খুশি, সম্মানিত।

সেসব দিনের কথা মনে করতে গিয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল মছিরন বেগমের। মর্যাদার জীবন ছিল না তখন। মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেও ভাসমান ছিল তাঁর পরিবার। এরপর ছিটমহলকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ফলে মছিরন বেগমের জীবন ও মর্যাদা এখন ভিন্ন। জাতীয় পরিচয়ের স্মার্ট কার্ড হাতে নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘এত দিন হামাক কাঁইয়ো মানুষ মনে করে নাই। কত লাঞ্ছনা ভুগছি। এলা মনে হয় হামার দুখের দিন শ্যাষ হইছে। ’

গতকাল সোমবার দুপুরে দাশিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সুজনেরকুটি গ্রামের ১০ নারী ও ১০ পুরুষের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ এই কার্ড তুলে দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘স্মার্ট কার্ড নারিগকত্ব পরিচয়ের অনন্য দলিল। আপনারা এটি যত্ন করে রাখবেন। সরকার আপনাদের উন্নয়নে অনেক কিছু করছে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। ’

গত বছরের ১ আগস্ট বিলুপ্ত হয় ছিটমহল। এর পর থেকে বদলে যেতে শুরু করে বিলুপ্ত ছিটমহল। এর বাসিন্দারা হয়তো ভাবতে পারেনি, ভূমিবন্দি জীবনের শৃঙ্খল থেকে কোনো দিন মুক্তি পাবে। গত বছরের ১৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তাদের দেখতে আসেন। এলাকার উন্নয়নের দায়িত্ব নেন।

এইতো সেদিনের কথা : ছিটমহলের বাসিন্দারা গোপনে ভারতে গিয়ে কাজ করত। সেখানে গিয়ে তারা দেখত, ভারতের নাগরিকরা রেশন কার্ড পাচ্ছে। অনেকে সুযোগ-সুবিধা পাছে। ওই সময় ঘরে ফিরে তাদের আফসোস হতো, যদি তারাও বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারত। এসব এখন কেবলই দুঃসময়ের স্মৃতি। এখন সুসময়; দেশের নাগরিক হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা পেতে শুরু করেছে তারা।

ফলে জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড পেয়ে ভীষণ খুশি এখানকার অধিবাসীরা। দাশিয়ারছড়ার দুই হাজার ৫৬২ জন নাগরিককে স্মার্ট কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক হাজার ৩০৬ জন নারী ও এক হাজার ২৫৬ জন পুরুষ। এসব ভোটারকে ফুলবাড়ী সদর, কাশিপুর ও ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তারা আগামী ৩১ অক্টোবর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।

জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন জানান, ছিটমহল বিনিময়ের এক বছরের মাথায় বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার অধিবাসীরা ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েই পাচ্ছে স্মার্ট কার্ড এনআইডি। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তারা নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ১০ ডিজিটের এই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করতে পারবে। পরবর্তী সময়ে ফুলবাড়ী উপজেলায় এক লাখ ১৪ হাজার ৩১৯ জন নাগরিকের হাতে স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। স্মার্ট কার্ড বিতরণের সময় দশ আঙুল ও আইরিশের প্রতিচ্ছবি সংগ্রহ করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ভোটারদের হাতে থাকা আগের লেমিনেটেড আইডি কার্ড ফেরত দিতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাবেক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খান বলেন, ‘আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তিনি আমাদেরকে ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের চিরতরে অবসান ঘটিয়ে গত বছর স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এক বছরের মাথায় প্রথমবারের মতো স্মার্ট কার্ড তুলে দিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার দিয়েছেন। এ আনন্দ শুধু আমাদের নয়, গোটা দেশবাসীর। ’

স্মার্ট কার্ড নাগরিকত্ব পরিচয়ের অনন্য দলিল : এদিকে দাশিয়ারছড়া বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর হাতে জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড তুলে দেওয়ার পর তাদের উদ্দেশে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘স্মার্ট কার্ড বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। কাজেই যত্নের সাথে রাখতে হবে এ মূল্যবান কার্ড। এ কার্ড কাউকে দেওয়া যাবে না বা হারিয়ে গেলে এ কার্ড পেতে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হবে। এ কারণে এটি সংরক্ষণে অনেক বেশি সাবধান হতে হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এই কার্ড অন্যের হাতে গেলে অপব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। আপনারা সরকারের সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করুন। আর এসব সুযোগ যথাযথ কাজে লাগাতে হলে নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলুন। ’

প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রচেষ্টায় ছিটমহল বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে ১ আগস্ট ছিটমহলবাসী স্বাধীন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী জাতীয় পরিচয়পত্র লাভের গৌরব অর্জন করল। ’

নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, দাশিয়ারছড়ার দুই হাজার ৫৬২ জন নাগরিককে স্মার্ট কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে নারী এক হাজার ৩০৬ জন এবং পুরুষ এক হাজার ২৫৬ জন। এসব ভোটারকে ফুলবাড়ী সদর, কাশিপুর ও ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এসব মানুষ ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।

এনআইডি প্রকল্পের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান সালেউদ্দিন জানান, এই স্মার্ট কার্ডে তিন স্তরবিশিষ্ট ২৫টি নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। এটি নকল করা অসম্ভব। এ কার্ডের মাধ্য নাগরিকরা সরকারের ২০টি সেবা গ্রহণ করতে পারবে।

জেলা প্রশাসন ও জেলা নির্বাচন অফিস যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমানের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ, কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ, কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, এনআইডি প্রকল্পের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান সালেউদ্দিন, জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম প্রমুখ।


মন্তব্য