kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জাতীয় পরিচয়ের স্মার্ট কার্ড যুগে বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জাতীয় পরিচয়ের স্মার্ট কার্ড যুগে বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে নির্বাচন কমিশন আয়োজিত স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার হাতে পরিচয়পত্র তুলে দেন। ছবি : পিআইডি

জাতীয় পরিচয়ের ‘স্মার্ট কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুরুতেই রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবি ও ১০ আঙুলের ছাপ দিয়ে নিজের স্মার্ট কার্ড গ্রহণ করেন তিনি।

এরপর জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যদের মাঝে এ কার্ড বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

গতকাল সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাসস জানায়, স্মার্ট কার্ড নকল করা সহজ হবে না, এমন আশাবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসি ও স্মার্ট কার্ড প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর (রাষ্ট্রপতি) স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে হস্তান্তর করেন। গতকাল বিকেলেই সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সেটি রাষ্ট্রপতিকে পৌঁছে দেন। এ সময় রাষ্ট্রপতির ১০ আঙুলের ছাপ ও আইরিশের প্রতিচ্ছবিও সংগ্রহ করা হয়।

সকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির স্মার্ট কার্ড হস্তান্তরের পরই সিইসি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত এই স্মার্ট কার্ড প্রকল্পের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর মাশরাফি বিন মর্তুজাসহ জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্য খেলোয়াড়দের হাতে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উন্নত কার্ডের মাধ্যমে সব রকম সেবা পাওয়া যাবে। ঘরে বসেই এখন অনেক কিছু করা সম্ভব হবে। যার সহায়ক হবে এই স্মার্ট কার্ড। তিনি আরো বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তব। আমরা সবাইকে এই কার্ড দিতে পারছি। এটি জাতি হিসেবে আমাদের আরো উন্নত করবে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক প্রযুক্তি আছে, সেসব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এ কার্ডের ডাটার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। কেউ যেন এ ডাটা ব্যবহার করে কোনো অপরাধ ঘটাতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ এবং বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর কিমিয়াও ফ্যান। অনুষ্ঠানে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিস’ শীর্ষক এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীন প্রকল্প সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করেন। ইসি সচিব সিরাজুল ইসলাম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। আজ সোমবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ড এবং কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল  দাশিয়ারছড়ার অধিবাসীদের মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হবে।

ইসি সূত্র জানায়, স্মার্ট কার্ড প্রদানের জন্য দেশের ১০ কোটি নাগরিকের তথ্য নিয়ে একটি ডাটাবেইস তৈরি করা হয়েছে। এর আওতায় ২০১৭ সালের মধ্যে ৯ কোটি নাগরিককে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান পেপার লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্র প্রতিস্থাপিত হবে।

সূত্র জানায়, বর্তমান বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে এই স্মার্ট কার্ড তৈরি হয়েছে। জাতীয় পরিচয়ের ডাটাবেইস ও স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রত্যয়নকারী কর্তৃপক্ষের সনদপ্রাপ্ত। এটি ট্রাভেল কার্ডসহ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাতীয় পরিচয়পত্র হিসেবে বিবেচিত হবে। স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র নাগরিকদের শ্রেণি, বয়স, অবস্থা-অবস্থান ও পেশাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।

এর মাধ্যমে সেবা প্রদানকারী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন ও অফলাইন, উভয় পদ্ধতিতে নাগরিকদের পরিচিতি সঠিকভাবে যাচাই করতে পারবে। ডাটাবেইসে অভিগম্যতা লাভের মাধ্যমে অনলাইনে এবং অফলাইনে চিপ/এমআরজেড/বারকোড/ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানারের মাধ্যমে সহজেই স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যাদি যাচাই করা সম্ভব। ইতিমধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ৬৪টি প্রতিষ্ঠান এর সেবা গ্রহণ শুরু করেছে বলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে আরো জানানো হয়, দেশে বর্তমান ভোটার সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। আট বছর আগে প্রথমবারের মতো আট কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮ জন নাগরিক লেমিনেটেড এনআইডি কার্ড পেয়েছে। কিন্তু এ কার্ড নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি জালিয়াতি করেছে। মেশিন রিডেবল স্মার্ট কার্ডে এ জালিয়াতি বন্ধ হবে। এর নিরাপত্তায় ২৫ ধরনের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ও স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে একজন নাগরিকের সব ধরনের তথ্য থাকবে। কার্ডধারীরা ব্যাংকিং, টিআইএন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্টসহ ২২ ধরনের সেবা পাবে।  

ইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রথম পর্যায়ে এনআইডি কার্ড বিনা মূল্যে দেওয়া হবে। তবে হারিয়ে গেলে নতুন একটি নিতে চাইলে নির্দিষ্ট অঙ্কের ফি দিতে হবে।

গতকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আত্মঘাতী জঙ্গিদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ছবিসংবলিত ভোটার তালিকার সঙ্গে তাদের আঙুলের ছাপ যাচাই করে অনেকের পরিচয় বের করা সম্ভব হয়েছে। এটি জঙ্গিবাদ নিরসন করে সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে ভূমিকা রাখবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ডাটাবেইস ও স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র এখন আমাদের জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নাগরিকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং কাজে লাগানো, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজে সময় বাঁচানো, তাত্ক্ষণিকভাবে পরিচয়ের তথ্যাদি যাচাই করার জন্য লিংক স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি মুহূর্তেই তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। ’

ব্যক্তির নাগরিক পরিচয় সম্পর্কিত তথ্য জানা থাকলে প্রকৃত ব্যক্তি কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতারণা, জালিয়াতি, সন্ত্রাস, অর্থপাচারসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা এতে করে কমবে। ’

১৮ বছর কম বয়সীদের স্মার্ট পরিচয়পত্র প্রদানে সরকার উদ্যোগ নেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে ১৮ কিংবা তার চেয়ে অধিক বয়সের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করা হচ্ছে। তবে যাদের বয়স ১৮ বছরের কম এবং যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য নয়, তাদেরও পরিচয় নিবন্ধন করে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ’

ঢাকায় কবে, কোথায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ : নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়, আজ সোমবার ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের উত্তরা থানার অন্তর্ভুক্ত ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর মডেল টাউন সেক্টর ১ ও ২-এর ভোটারদের মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হবে। বিতরণের স্থান উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রোড নম্বর ১ ও ২৭, সেক্টর-৭। আগামীকাল মঙ্গলবার একই স্থানে একই ওয়ার্ডের সেক্টর ১০-এর রানাভোলার (ডিসিসি অংশের) ভোটারদের মধ্যে এ কার্ড বিতরণ হবে। এ ওয়ার্ডের ভোটারদের মাঝে একই স্থান থেকে কার্ড বিতরণ চলবে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। শেষ দুই দিন বিতরণ করা হবে আবদুল্লাহপুরের ভোটার কার্ড।

আজ ঢাকার দক্ষিণ সিটির রমনা থানার বেইলি রোডের সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ থেকে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাকরাইল, রমনা ও মতিঝিল থানার অংশ এবং ডিআইটি কলোনির ভোটারদের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হবে। ১০ অক্টোবর পর্যন্ত একই স্থান থেকে পর্যায়ক্রমে ইস্কাটন গার্ডেন রোড, বেইলি স্কয়ার, বেইলি রোড, মগবাজার ইস্পাহানি কলোনি, আমিনাবাদ কলোনি ও ইস্টার্ন হাউজিং অ্যাপার্টমেন্ট, পশ্চিম মালিবাগ, মিন্টো রোড, নিউ ইস্কাটন রোড, সার্কিট হাউস রোড, মগবাজার এলিফ্যান্ট রোড এবং সিদ্ধেশ্বরী রোড ও লেনের ভোটারদের মাঝে এ কার্ড বিতরণ করা হবে। ১১ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সেগুনবাগিচা হাই স্কুলে ২০ নম্বর ওয়ার্ডের এবং ২২ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২১ নম্বর ওয়ার্ডের স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হবে।

নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, স্মার্ট কার্ড নিতে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ভোটারকে সশরীরে নির্দিষ্ট বিতরণকেন্দ্রে হাজির হতে হবে। মূল জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে আনতে হবে। যাঁরা ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন, কিন্তু এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি, তাঁদের মূল নিবন্ধন স্লিপ আনতে হবে। যাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা মূল নিবন্ধন স্লিপ হারিয়ে গেছে, তাঁদের থানায় ডিডি করে জিডির মূল কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। এনআইডির ওয়েবসাইট থেকেও এ বিষয়ে  সময়সূচি জানা যাবে।


মন্তব্য