kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চিকিৎসা

গরিবের ভরসা ডিসপেনসারি

আপেল মাহমুদ   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



গরিবের ভরসা ডিসপেনসারি

মিরপুরে লালকুঠি বাজারে সরকারি বহির্বিভাগ ডিসপেনসারির সামনে রোগীর ভিড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি বাড়ির সামনে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুর দীর্ঘ লাইন। চেহারা আর বেশভূষায় চরম দারিদ্র্যের ছাপ।

যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ নিয়ে তারা সাতসকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছে। একটু একটু করে লাইন এগোচ্ছে। পেছনে এসে দাঁড়াচ্ছে আরো কিছু মানুষ। ওরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। কিন্তু অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার সামর্থ্য ওদের নেই। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ডিসপেনসারিতে বিনা পয়সায় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের পাশাপাশি ওষুধ পেতে ওদের এই অপেক্ষা।

রাজধানীর মিরপুর পুরাতন কলোনিতে লালকুঠি বাজারে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি আধাপাকা ঘর হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ১৯৫০ সাল থেকে। স্থানীয় লোকজনদের কাছে হাসপাতালটির পরিচিতি হয়েছে ডিসপেনসারি হিসেবে। সরকারি খাতায় এর নাম জিওডি (সরকারি বহির্বিভাগ ডিসপেনসারি)। চিকিৎসা নিতে এখানে প্রতিদিন সকাল থেকে ভিড় জমায় গরিব রোগীরা। তারা দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে।

মিরপুর দ্বিতীয় কলোনির প্রবীণ বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন খান বললেন, ‘প্রায় ৬৫ বছর ধরে ডিসপেনসারিটি এলাকার গরিব রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, এখানকার ডাক্তার ও কম্পাউন্ডাররা ওষুধ হিসেবে লাল রঙের মিকচারের পাশাপাশি বিভিন্ন ভিটামিন ট্যাবলেট দিতেন। সময়ের ব্যবধানে চিকিৎসাসেবার ধরন পাল্টেছে। এখন মিকচার ও ভিটামিনের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে ট্যাবলেট, সিরাপ, ক্যাপসুল কিংবা ইনজেকশন। ’

সরেজমিনে লালকুঠি ডিসপেনসারিতে গিয়ে দেখা গেল—শুধু মিরপুর নয়, আশপাশের আমিনবাজার, কাফরুল, পল্লবী থেকেও অনেক রোগী এখানে আসছে। আগতদের অধিকাংশের টাকা খরচ করে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। এমনকি ২০ টাকা খরচ করে সিরাপ কেনার সাধ্যও নেই অনেকের। আমিনবাজারের সফুরা খাতুন বললেন, ‘শুধু ব্যবস্থাপত্র নয়, এখান থেকে বিনা পয়সায় ওষুধও পাই। এই ডিসপেনসারির কারণেই আমাদের মতো গরিব অহায় মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে না। ’

লালকুঠি ডিসপেনসারির দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তানিয়া জহির জানান, প্রায় তিন বছর ধরে তিনি এখানে বদলি হয়ে এসেছেন। এখানে বিনা পয়সায় গরিব রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে পেরে তিনি নিজেকে গর্বিত মনে করেন। বলতে গেলে চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করার উপযুক্ত পরিবেশ এসব ডিসপেনসারিতেই পাওয়া যাচ্ছে। বস্তিবাসী এমন অনেক রোগী আছে, যারা ১০-২০ টাকা খরচ করে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার সামর্থ্য রাখে না। তারা বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ওষুধপত্র পাচ্ছে এখান থেকে।

এই চিকিৎসক আরো জানান, মিরপুরের ডিসপেনসারিতে আগতদের অধিকাংশই পেটের পীড়া, চর্মরোগ, গর্ভবতী নারীদের চেকআপ, জ্বর ও ঠাণ্ডাজনিত হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত। তবে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তদের সংখ্যাই বেশি। যতদূর সম্ভব তাদের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বিনা পয়সায় ওষুধ দেওয়া হয়। অনেক সময় জটিল রোগীদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রেফার করা হয়। তাতে করে তারা আরো উন্নত চিকিৎসা পেয়ে থাকে।

ঢাকা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, মিরপুরের মতো আরো ১৫টি ডিসপেনসারি রয়েছে রাজধানীতে। মতিঝিল, গেণ্ডারিয়াসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এসব ডিসপেনসারির অবস্থান। নিউ ইস্কাটনে একটি ডিসপেনসারি চালানো হচ্ছে পরীক্ষামূলকভাবে। উত্তরা মডেল টাউনে আরেকটি ডিসপেনসারি খোলার পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে। মূলত দরিদ্র অসহায় মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্যই এর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। দিন দিন রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার এসব ডিসপেনসারির দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে। এ ধরনের কয়েকটি ডিসপেনসারি ঘুরে এর সত্যতাও পাওয়া গেছে।

গেণ্ডারিয়া ডিসপেনসারির সামনে কথা হলো বৃদ্ধ আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘সংসারে আমার কেউ নেই। ভিক্ষাবৃত্তি করে কোনোভাবে জীবনধারণ করছি। অনেক দিন ধরেই হাঁপানি ও পেটের ব্যথায় কাতর হয়ে আছি। টাকা খরচ করে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। শেষে একজনের কথামতো এই ডিসপেনসারিতে চিকিৎসা নিয়ে মোটামুটি সুস্থ হয়েছি। মাঝেমধ্যে ডাক্তার দেখাতে এখানে আসি। এখানে কোনো টাকা-পয়সা লাগে না। আমার মতো আরো অনেক ছিন্নমূল মানুষ এখানে চিকিৎসা নিচ্ছে। ’

সিভিল সার্জন ডা. মো. আবদুল মালেক মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব ডিসপেনসারি দিনের পর দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে একেকটি ডিসপেনসারিতে দুই থেকে তিনজন এমবিবিএস ডাক্তার চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন একজন কম্পাউন্ডার ও দুই থেকে তিনজন নার্স-আয়া। প্রতিটি ডিসপেনসারিতে বছরে প্রায় সাত লাখ টাকার ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ঢাকায় বছরে চার থেকে পাঁচ লাখ রোগী এসব ডিসপেনসারিতে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। ’

আবদুল মালেক মৃধা জানান, ডিসপেনসারিতে বিনা মূল্যে যেসব ওষুধ দেওয়া হচ্ছে তা বেশ কার্যকর। এখান থেকে নকল ও নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহের সুযোগ নেই। এ কারণে সাধারণ মানুষ ডিসপেনসারিগুলোর চিকিৎসাসেবার ওপর ক্রমেই আরো বেশি আস্থাশীল হয়ে উঠছে। বাড়ছে রোগীর সংখ্যাও।

প্রসঙ্গত, অতীতে দেশের প্রায় প্রতিটি জমিদার এস্টেটে একটি করে ডিসপেনসারি থাকত। সেগুলোর পরিচিতি ছিল দাতব্য চিকিৎসালয় হিসেবে। জমিদারদের তহবিল থেকে এগুলোর খরচ চালানো হতো। বড় বড় জমিদাররা কলকাতা থেকে পাস করা ডাক্তার খণ্ডকালীন হিসেবে নিয়োগ দিতেন। তখন দেশে প্লেগ, যক্ষ্মা, কলেরা, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ লেগেই থাকত। জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত ডিসপেনসারিগুলো সেসব মহামারি রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখত। ১৯৫০ সালের পর জমিদারি প্রথা বিলোপ হলে ডিসপেনসারিগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় সরকারিভাবে দেশে কিছু ডিসপেনসারি চালু করা হয়।

 


মন্তব্য