kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জীবিত নবজাতককে মৃত ঘোষণা

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও ডাক্তারের অবহেলা দায়ী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও ডাক্তারের অবহেলা দায়ী

ফরিদপুরের ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে এক নবজাতককে মৃত ঘোষণা করা এবং প্রায় ছয় ঘণ্টা পর দাফনের সময় তাকে জীবিত পাওয়ার ঘটনায় গঠিত তিন তদন্ত কমিটির মধ্যে দুটি কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন গঠিত কমিটি গতকাল রবিবার ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক বেগম উম্মে সালমা তানজিয়ার কাছে এবং সিভিল সার্জন গঠিত কমিটি সিভিল সার্জন অরুণ কান্তি বিশ্বাসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এ প্রতিবেদনের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।

জেলা প্রশাসনের ছয় সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম। তিনি বলেন, এ ঘটনার জন্য কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে চরম উদাসীনতা ও গাফিলতি এবং ওই সময়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের অবহেলাকে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে কমিটি বেশ কিছু বিষয়ের উল্লেখ করে বলেছে—১. হাসপাতালে আসন না থাকা সত্ত্বেও রোগী ভর্তি করে পরে তা বাতিল করা হয়। বাচ্চা প্রসবের পর আবার রোগীকে সিটে ওঠানো হয়। এর মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে চরম উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়; ২. ওই হাসপাতালে কোনো ইনডোর চিকিৎসক নেই। গাইনি বিভাগে দিনে চিকিৎসক থাকলেও রাতের জন্য কোনো চিকিৎসক নেই। গাইনি বিভাগের ব্যবস্থা যথোপযুক্ত নয়; ৩. হাসপাতালে নিবন্ধিত গাইনোকোলজি বিভাগ আছে, কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক নেই এবং ৪. স্থায়ী সার্বক্ষণিক চিকিৎসক পদায়ন না করে গাইনোকোলজি বিভাগটি চালু রাখা সঠিক নয়।

অন্যদিকে সিভিল সার্জন গঠিত তিন সদস্যের কমিটির নেতৃত্ব দেন ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের কনসালট্যান্ট ঊষা রঞ্জন চক্রবর্ত্তী। তিনি জানান, গতকাল দুপুরে প্রতিবেদনটি সিভিল সার্জনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

সিভিল সার্জন জানান, কমিটি ওই দিনের ঘটনাসহ হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে তদন্ত করেছে। কমিটি সমস্যা চিহ্নিত করা ও সুপারিশসহ মোট ১০টি বিষয় শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ওই হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, সেবিকা, আয়া বা নৈশপ্রহরী কেউই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। হাসপাতালে গাইনি বিভাগের অনুমতি থাকলেও নিয়মিত গাইনি চিকিৎসক নেই। প্রসূতি বিভাগের ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে ডা. রিজিয়া আলম, তাঁর সহকারী ডা. মোসলেমা হোসেন, ডা. আফরোজা পারভীন এবং তিনজন নার্স মিঠু রানী সূত্রধর, আসিয়া খাতুন ও আখিনূর আক্তার এবং ক্লিনার হাসি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন। ফটক নিরাপত্তা প্রহরীর দায়িত্ব পালনেও অবহেলা রয়েছে।

দুটি তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. আ স ম জাহাঙ্গীর চৌধুরী টিটো বলেন, ‘প্রতিবেদন পেয়েছি। কিন্তু পর্যালোচনা করার সুযোগ পাইনি। নির্বাহী কমিটির জরুরি সভা আহ্বান করে প্রতিবেদন দুটি আলোচনা করে পরে মতামত দিতে পারব। ’

নবজাতককে মৃত ঘোষণা-সংক্রান্ত ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশনায় রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. মো. রহিম বক্সকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।

প্রসঙ্গত, ফরিদপুর শহরের কুঠিবাড়ী কমলাপুর এলাকার বাসিন্দা ফরিদপুর জেলা ক্রিকেট দলের সাবেক সদস্য নাজমুল হুদা মিঠুর স্ত্রী অ্যাডভোকেট নাজনীন আক্তার পপিকে গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে স্বজনরা শহরের ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে গাইনি বিভাগে চিকিৎসক রিজিয়া আলম শয্যা সংকটের কথা বলে তাঁকে ভর্তি নিতে চাননি। একপর্যায়ে পপি ওই চিকিৎসকের কক্ষেই একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন। চিকিৎসক রিজিয়া আলম নবজাতকটিকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। পরে শিশুটি জীবিত রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। একপর্যায়ে হেলিকপ্টারযোগে শিশুটিকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শিশুটি ২৫ সেপ্টেম্বর মারা যায়।


মন্তব্য