kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


স্বাস্থ্যসেবা

জীবন রক্ষায় লাল টিপ

তৌফিক মারুফ, হাতিয়া (নোয়াখালী) থেকে ফিরে   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জীবন রক্ষায় লাল টিপ

নোয়াখালীর হাতিয়ায় প্রসূতিদের লাল টিপে চিহ্নিত করে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কপালের লাল টিপ হাতে ধরে আছেন নূপুরী দাস। দেয়ালে টাঙানো একটা ফ্রেমে মানচিত্রের আদলে চিহ্নিত করা আছে বিশেষ স্থান।

তার ওপর বসানো আছে তারার মতো লাল টিপ। কৌতূহলী মনে প্রশ্ন—এত লাল টিপের ছড়াছড়ি কেন? ভাগ্যকে অনেকে কপাল বলে ডাকে। এই লাল টিপগুলো তবে কোনো সৌভাগ্য? ঠিক তাই, জানা গেল দেয়ালের লাল টিপগুলো নাকি জীবনরক্ষার প্রতীক। বাগধারাটা একটু বদলে নিয়ে বললে কেমন হয়—‘লাল টিপ প্রসূতির সৌভাগ্য’।    

এবার শোনা যাক স্বাস্থ্যকর্মী নূপুরী দাস এ বিষয়ে কী বলেন—‘আমরা মেয়েরা লাল টিপ পরে থাকি সৌন্দর্যের জন্য। কিন্তু লাল টিপগুলো আমার কাছে এই এলাকার প্রসূতি মায়েদের জীবনরক্ষার প্রতীক। বলতে পারেন এই টিপ ব্যবহার করে আমরা প্রসূতির জীবন বাঁচাই। প্রসূতি ও তাঁর গর্ভের সন্তানকে নিরাপদ রাখি। ’

উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে এ লাল টিপ পদ্ধতি দেখা যায়। এই পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসেবার মানগত পরিবর্তন এসেছে হাতিয়ার হরনি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেটিতে।

নূপুরী দাস ও তাঁর সহকর্মী সাধবী রায় আরো জানান, স্থানীয় প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যসেবাকে মানসম্পন্ন করার কৌশল হিসেবে তাঁরা লাল টিপ ব্যবহার করছেন। এলাকাকে মানচিত্রের আদলে বড় কাগজে এঁকে এর ভেতরে যতজন প্রসূতি ততটা লাল টিপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন প্রসূতি বাড়লে একটি লাল টিপ বাড়ে। আবার পাশের আরেকটি মানচিত্রেও সাজানো হয় এক মাসের মধ্যে যাদের প্রসব তারিখ নির্ধারিত রয়েছে তাদের সম্ভাব্য তারিখ, নাম, ফোন নম্বর ও ঠিকানা। এখানেও প্রতিজন প্রসূতির জন্য একটি করে লাল টিপ লাগানো আছে। কারো সন্তান প্রসব হয়ে গেলে তার জন্য রাখা টিপ তুলে ফেলা হয়।

তাঁরা আরো বলেন, ‘টিপ পদ্ধতি আমাদের এখানকার স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে টনিকের মতো কাজ দিচ্ছে। সব সময় ওই টিপগুলো আমাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে। সেই সঙ্গে আমাদের মনের ভেতরেও প্রতিটি লাল টিপের আড়ালে যে প্রসূতি মা রয়েছেন তাঁর চেহারা চোখে ভেসে ওঠে। আমরা ফোন করে কিংবা আমাদের সঙ্গে কাজ করা কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে ওই প্রসূতির খোঁজ নেই প্রতিদিন। ’ 

সাধবী রায় মানচিত্রে লাগানো টিপ গুনে গুনে বলেন, ‘এই সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের এই ইউনিয়নে ৩৭ জন প্রসূতি মায়ের প্রসবের তারিখ নির্ধারিত আছে। গত মাসে প্রসব হয়েছে ৪৩ জনের। আর ওই যে লাল টিপের পাশে আলাদা রং দিয়ে চিহ্ন দেওয়া আছে সেই সাতজন প্রসূতিকে বিভিন্ন জটিলতার কারণে আমরা এখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছি। ’

হাতিয়ার হরনি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মী হোসনেয়ারা বলেন, ‘এই লাল টিপের কল্যাণে আমরা এলাকার প্রসূতি মায়েদের প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবার মান বাড়াতে পেরেছি। টিপকে আমরা নির্দেশিকা চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করছি। আমরা ওই প্রতীকের দিকে তাকিয়ে আমাদের এই কেন্দ্রে কখন কোন প্রসূতি আসবে, কোন প্রসূতির কী সেবা প্রয়োজন হবে—সেগুলো সব আগে থেকে গুছিয়ে রাখতে পারি। আমরাও সব সময় প্রস্তুত থাকি। সব কিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখি। ’

চরকাঁকড়ার সাবেক জনপ্রতিনিধি মো. আবুল হাতেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই সেন্টারটির কারণে এখন আর এই এলাকার কোনো প্রসূতিকে দূরে যেতে হয় না কিংবা চিকিৎসা নিয়ে কোনো উত্কণ্ঠায় থাকতে হয় না। বরং ওই লাল টিপ ফলো করে এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরাই প্রতি প্রসূতি মায়ের খোঁজখবর নেন এবং চেকআপ করেন। ’

সেফ দ্য চিলড্রেনের নোয়াখালীর সিনিয়র ম্যানেজার মো. সালাউদ্দিন জানান, ইউএসএইডের মামণি কর্মসূচির মাধ্যমে এ কেন্দ্রেগুলোতে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের স্বাস্থ্যসেবা পরিচালিত হয়। সরকারের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর সেবার মান বাড়ানোসহ এর কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে মামণি কর্মসূচি।

মামণি প্রকল্পের মিডিয়া অ্যাডভাইজার মো. বেলাল উদ্দীন কালের কণ্ঠকে জানান, ইউএসএইডের আওতায় দেশের ছয় জেলার মোট ৩৩২টি সরকারি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে তাঁদের বিভিন্ন ধরনের সেবা কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে ২০৯টি কেন্দ্রে নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য প্রসূতি মায়েদের প্রসব-পূর্ব, প্রসব-পরবর্তী ও প্রসবকালীন সেবা দেওয়া হয়। সবগুলোতেই নরমাল ডেলিভারি কার্যক্রম হয় প্রয়োজনীয় সব আধুনিক যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও প্রশিক্ষিত সেবাকর্মী সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে। আর এই কেন্দ্রগুলোতে গত ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের গত মাস পর্যন্ত মোট ১৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪ জন প্রসূতিকে প্রসব-পূর্ব সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ২৪ ঘণ্টা ডেলিভারি হয় এমন ৭৫টি কেন্দ্রে প্রসব হয়েছে ২১ হাজার ৯১৯ জনের। যাদের সবার ক্ষেত্রেই সব কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে লাল টিপ পদ্ধতি। ফলে কেন্দ্রগুলোতে সেবার মানে উন্নতি ঘটেছে।

জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মা ও শিশু) ডা. মোহাম্মদ শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামণি কার্যক্রমের আওতায় আমাদের অনেক সেন্টার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বেসরকারি এই সহায়তা প্রত্যন্ত এলাকায় মা ও নবজাতক সেবায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। আমরা এখন এই কার্যক্রম ও পদ্ধতিকে মডেল হিসেবে নিয়ে সারা দেশে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছি। ’


মন্তব্য