kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জুবিলী ব্যাংকে বঙ্গবন্ধুর খুনি বজলুল হুদারও শেয়ার রয়েছে

আবুল কাশেম   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কুষ্টিয়ার জুবিলী ব্যাংকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আরেক খুনি মেজর (অব.) বজলুল হুদারও শেয়ার রয়েছে। এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে সরকার।

বজলুল হুদা দুই বছর ব্যাংকটির পরিচালক ছিলেন। ব্যাংকটির ১৯৯২ সালের বিবরণীতে তাঁকে আর পরিচালক উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর শেয়ারের কী হয়েছে, সে বিষয়েও সরকারকে কোনো তথ্য দেয়নি তারা।

জুবিলী ব্যাংকে বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল (অব.) ফারুক ও কর্নেল (অব.) আব্দুর রশিদের নামে ৮৫ হাজার শেয়ার রয়েছে। এগুলো বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ব্যাংকটিতে বিভিন্ন সময়ে কাদের মালিকানা ছিল, পরিচালনা পর্ষদে কারা ছিল, খুনিদের শেয়ারের কী অবস্থা—এসব জানানোর জন্য সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন যৌথ মূলধন কম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জুবিলী ব্যাংকের বার্ষিক মূলধন বিবরণী যাচাই করে। তারা জেনেছে,  ব্যাংকটিতে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি মেজর (অব.) বজলুল হুদারও শেয়ার রয়েছে।

আরজেএসসির নিবন্ধক মো. আতিকুর রহমান ওই যাচাই প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালের বার্ষিক মূলধনের বিপরীতে মেজর (অব.) বজলুল হুদাকে জুবিলী ব্যাংকের পরিচালক দেখানো হয়। কিন্তু সে সময় তার কী পরিমাণ শেয়ার ছিল তার উল্লেখ নেই। কর্নেল (অব.) ফারুক ও কর্নেল (অব.) আব্দুর রশিদের নামে কী পরিমাণ শেয়ার ছিল, তার তথ্যও আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের বিবরণীতে পরিচালকের তালিকায় বজলুল হুদার নাম নেই। এরপর পরিচালকের তালিকায় ঘন ঘন পরিবর্তন এসেছে।

কম্পানিটি ১৯১৩ সালের ১৫ এপ্রিল ‘খোকসা জানিপুর জুবিলী ব্যাংক লিমিটেড’ নামে আরজেএসসিতে নিবন্ধিত হয়, নিবন্ধন নম্বর : সি-২৩৭৩। ১৯৮৭ সালের ২৬ জানুয়ারি নাম পরিবর্তন করে ‘জুবিলী ব্যাংক লিমিটেড’ করা হয়। নিবন্ধনের পর থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত এটির হিসাব আরজেএসসির রেকর্ডপত্রে নেই। ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হিসাব আরজেএসসিতে দাখিল করা হয়।

১৯৯১ সালের ২৩ জানুয়ারি জুবিলী ব্যাংকের দাখিল করা ১৯৯০ সালের বার্ষিক মূলধন বিবরণী অনুযায়ী, এর অনুমোদিত মূলধন ১০ কোটি টাকা, যা ২৫ টাকার মোট ৪০ লাখ শেয়ারে বিভক্ত। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল (অব.) ফারুক ও কর্নেল (অব.) আব্দুর রশিদ পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত ছিল। ১৯৯২ সালের বার্ষিক মূলধন বিবরণী অনুযায়ী, ১০ কোটি টাকা মূলধনের ৪০ লাখ শেয়ারের (প্রতিটি ২৫ টাকার) মালিকানা ছিল ১৬৫ জনের। ১৯৯৫ সালের হিসাবে দেখানো হয়েছে, অনুমোদিত মূলধন আট কোটি টাকা, যা ৩২ লাখ শেয়ারে (প্রতিটি ২৫ টাকার) বিভক্ত। শেয়ারধারীর সংখ্যা দেখানো হয় ১৬৯ জন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের বিবরণীতে শেয়ারের সংখ্যা অপরিবর্তিত। মালিকানা ১৮১ জনের।

আইনসচিব আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, বঙ্গবন্ধুর দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিদের কিছু সম্পদ ইতিমধ্যে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অন্যান্য সম্পদও বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তাদের নামে আর কোথায়, কী সম্পদ রয়েছে তা খুঁজে বের করা হচ্ছে।

গত আগস্ট মাসে জুবিলী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার এম বি আই মুন্সি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ ও কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান এক সময় এ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ছিল। সরকার তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য আলাদা আইন করেনি। সে কারণে আমরা উদ্যোগ নিয়ে কম্পানি আইন ও ব্যাংকিং আইনের আলোকে ২০১১ সালে জাতীয় পত্রিকায় দুবার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সব শেয়ারহোল্ডারকে মূল শেয়ার সার্টিফিকেটের ফটোকপি জমা দিতে অনুরোধ জানাই। রশিদ, ফারুক বা তাদের পরিবারের কেউ তা জমা দেয়নি। ফলে পরিচালনা পর্ষদে ও বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) তাদের শেয়ার অবৈধ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করা হয়। এখন রশিদ ও ফারুকের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। এ বিষয়ে জুবিলী ব্যাংকের কিছু করার নেই। ’

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে সাজা ঘোষণার পাশাপাশি খুনিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন আদালত। এই পরিপ্রেক্ষিতে জুবিলী ব্যাংকে থাকা দুই খুনির শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার জন্য গত ২৯ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত না থাকায় বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে অপারগতা জানিয়ে গত ২৬ জুলাই মন্ত্রণালয়কে ফিরতি চিঠি দেয় বিএসইসি। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, জুবিলী ব্যাংক দেশের কোনো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নয়। ফলে ওই সব শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, এরপর ব্যাংকটিতে থাকা বঙ্গবন্ধুর দুই খুনির শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বলা হয়। যৌথ মূলধন কম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধককেও (আরজেএসসি) এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের শেয়ার খুঁজতে গিয়ে আরজেএসসি জুবিলী ব্যাংকে দুটি বড় অনিয়ম দেখতে পায়। বড় একটি শিল্প গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যানের নামে ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটিতে ৩০ হাজার শেয়ার ছিল। ২০০৭ সালের বার্ষিক মূলধন বিবরণীতে হঠাৎ তার নামের বিপরীতে ১০ হাজার শেয়ার দেখানো হয়। বাকি ২০ হাজার শেয়ারের মধ্যে ১৫ হাজারের একটি হিসাব দেওয়া হলেও পাঁচ হাজার শেয়ারের তথ্য দিতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় অনিয়ম হলো—বিপ্লব ইসলাম মুন্সি নামের এক ব্যক্তি কখনো পরিচালক, আবার কখনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে উল্লিখিত। কিন্তু বার্ষিক মূলধন বিবরণীতে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন।


মন্তব্য