kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নাগরিক শোকসভায় আলোচকরা

সৈয়দ হকের রচনা অনন্ত প্রেরণার উৎস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সৈয়দ হকের রচনা অনন্ত প্রেরণার উৎস

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক স্মরণে গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাগরিক শোকসভা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় সৈয়দ শামসুল হককে স্মরণ করে আলোচকরা বলেন, এক জীবনে সৈয়দ শামসুল হক যত রচনা উপহার দিয়েছেন, তা অমূল্য সম্পদ। তাঁর রচনা অনন্ত প্রেরণার উৎস।

যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন তাঁর সৃষ্টিমুখর কর্ম ও রচনা আলোর মতো জ্বলবে আনন্দে, সংকটে, সুখে-দুঃখে।

সৈয়দ শামসুল হক স্মরণে গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ শোকসভার আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। শিল্পী বুলবুল ইসলামের কণ্ঠে ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’—এই রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মরণ অনুষ্ঠান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন জাতির পথপ্রদর্শক। তাঁর প্রয়োজনীয়তা কখনোই ফুরাবার নয়। তিনি না থাকলেও তিনি আমাদের মাঝেই আছেন। তাঁর লেখা আমাদের সব সময় অনুপ্রেরণা দেবে, পথ দেখাবে তরুণ প্রজন্মকে। ’

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে শোক নয়, তাঁকে নিয়ে উদ্‌যাপন করা উচিত। তিনি জাতিকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৌর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। লিখেছেন ‘আমার পরিচয়’-এর মতো কালজয়ী কবিতা। তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে, তাঁর সৃজনশীল কর্মের মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, সৈয়দ শামসুল হক কালের সব ধারাকে তাঁর লেখায় স্থান দিয়েছেন। বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির ইতিহাসকে সমকালীন সাহিত্যে তুলে এনেছেন। মানুষের চিন্তার জগেক প্রসারিত করে এমন স্থানে পৌঁছে গেছেন যাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করতে হবে।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ‘হক ভাই চিরজীবিত। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর চেয়ে সৃষ্টিশীল কোনো মানুষ দেখিনি। পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন, সৃষ্টিশীল ছিলেন, নান্দনিকতার পক্ষে ছিলেন। তাঁর মঙ্গল চেতনা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে সঠিক শ্রদ্ধা জানানো হবে। ’

নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, ‘রবীন্দ্র-উত্তর সাহিত্যে যে হাতে গোনা কয়েকজন রয়েছেন তিনি তাঁদের অন্যতম। চার শ বছর হয়েছে শেকসপিয়ার বেঁচে রয়েছেন। সৈয়দ হকের সৃজনের মৃত্যু হবে না। তিনি বেঁচে রইবেন আমাদের প্রেরণা হয়ে। ’

চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম বলেন, প্রথম জীবনে চলচ্চিত্রকার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি অসামান্য কিছু চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্মেষকালের তিনি প্রথম সারির একজন।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হক সাংস্কৃতিক কর্মীদের আত্মার আত্মীয় ছিলেন। তিনি আমাদের নিরন্তর প্রেরণার উৎস ছিলেন, সব সময় তাই থাকবেন। ’

সৈয়দ শামসুল হকের স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, ‘সৈয়দ হক সম্পর্কে আমার খুব বেশি কিছু বলার নেই। আপনারা অনেকেই আমার চাইতেও ভালো জানেন। তাঁর সঙ্গে আপনারা আন্দোলনে ছিলেন, রাজপথে ছিলেন; যেটা আমি ছিলাম না। আমি নিজের কাজ নিয়ে, নিজের লেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এখন সে জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে, অনুতাপ হচ্ছে। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ ছিলেন। তিনি সব সময় নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সে জন্য তাঁকে অনেক সময় দূরের মানুষ মনে হতো। কিন্তু তিনি সব মানুষের দিকে খেয়াল রাখতেন। আমার ভেতরে অনেক অপরাধবোধের জন্ম দিয়ে চলে গেছেন। মানুষটিকে ভালো করে বুঝলাম না, ভালো করে সময় কাটালাম না। দেশের মানুষের মনেই তিনি বেঁচে থাকবেন। ’

পিতার স্মৃতিচারণা করে দ্বিতীয়-সৈয়দ হক বলেন, ‘বাবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি। দেশের নাগরিকরাই তাঁর কাছে ছিল প্রধান বিষয়। সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই মানুষদের ভালোবাসা দেখে আমরা কৃতজ্ঞ। ’

অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করে আরো বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য মুক্তাদির চৌধুরী, নাট্যজন মামুনুর রশীদ, চলচ্চিত্রাভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মুহাম্মদ সামাদ, কবি নাসির আহমেদ, গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজের উপাচার্য কামরুল হাসান খান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, নাট্যজন ম হামিদ, পথনাটক পরিষদের সভাপতি মান্নান হীরা, ছড়াকার আলম তালুকদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়রাম্যান কবি মোহাম্মদ সাদিক, কবি আসাদ মান্নান, মহিলা পরিষদের নেত্রী রেখা চৌধুরী প্রমুখ। সভায় সভাপতিত্ব করেন জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাসকুর-এ সাত্তার কল্লোল।

আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহকামউল্লাহ পাঠ করেন সৈয়দ হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠ করেন ‘নুরলদীনের সারা জীবন’ নাটকের অংশবিশেষ। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘অনেক সাধের ময়না আমার’ গানটি গেয়ে শোনান মামুন জাহিদ খান। ফকির আলমগীর ও তাঁর দল ঋষিজের শিল্পীরা সৈয়দ হকের লেখা ‘ভয় নেই, জয় সাম্যের জয়’ গণসংগীত পরিবেশন করেন। সৈয়দ হক স্মরণে স্বরচিত কবিতা ‘তোমার প্রেমের আলো’ আবৃত্তি করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মুহাম্মদ সামাদ। ‘আমাকে আপনারা ক্ষমা করবেন’ শীর্ষক সৈয়দ হককে উৎসর্গীকৃত স্বরচিতা কবিতা আবৃত্তি করেন কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত।

সৈয়দ শামসুল হকের কুলখানি আজ : সৈয়দ হকের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে আজ রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় গুলশান ১ নম্বরে তাঁর বাসভবনে (বাড়ি-৮, সড়ক-৬)। পরিবারের পক্ষ থেকে তাতে ঘনিষ্ঠজনদের অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

টিএসসিতে সপ্তাহব্যাপী স্মরণ অনুষ্ঠান : আজ রবিবার থেকে সপ্তাহব্যাপী সৈয়দ হক স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। টিএসসির সবুজ চত্বরে বিকেল ৫টায় আয়োজনের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ ছাড়া ৬ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি চত্বরে জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজনে বিকেল ৫টায় স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। ৯ অক্টোবর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে জাতীয় জাদুঘরে বিকেল সাড়ে ৫টায় সৈয়দ হক স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে।

বাংলা একাডেমিতে শোকসভা ৭ অক্টোবর : বাংলা একাডেমি এবং জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি যৌথভাবে সৈয়দ শামসুল হক স্মরণে শোকসভার আয়োজন করছে আগামী ৭ অক্টোবর বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে।


মন্তব্য