kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মতিঝিলে যুবলীগে খুনাখুনি

নেপথ্যে আট খাতের দুই কোটি টাকার চাঁদাবাজি

এস এম আজাদ   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নেপথ্যে আট খাতের দুই কোটি টাকার চাঁদাবাজি

রাজধানীর মতিঝিলে এজিবি কলোনি ও আশপাশের এলাকার আটটি খাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য যুবলীগের চার গ্রুপ মরিয়া। এ খাতগুলো থেকে প্রতি মাসে প্রায় দুই কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় বলে অভিযোগ আছে।

এই ‘চাঁদা বাণিজ্য’ নিয়ন্ত্রণের বিরোধে নিজ দলের সহকর্মীরা হয়ে উঠছে শত্রু। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। সর্বশেষ গত ১৬ সেপ্টেম্বর গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয় যুবলীগকর্মী রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোঁচা বাবু ও আহসানুল হক ইমনকে। ইমন প্রাণে বেঁচে গেলেও বাবু মারা গেছেন। একই ধরনের বিরোধের জেরে তিন বছর আগে খুন হন মহানগর যুবলীগের নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী। তাঁর বিরোধী জাহিদ সিদ্দিকী তারেক র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এখনো সেই বিরোধ অব্যাহত আছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিল্কী-তারেকের মৃত্যুর পর মতিঝিল যুবলীগের অনুসারীরা চার গ্রুপে ভাগ হয়ে গেছে। এগুলো হলো—সাগর গ্রুপ, মিলন গ্রুপ, হীরক গ্রুপ ও আমিনুল গ্রুপ। সাগর গ্রুপের প্রধান মারুফ রেজা সাগর ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। তিনি নিহত মিল্কীর সহযোগী ছিলেন। আনোয়ার হোসেন মিলন ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। মহানগর ছাত্রলীগ দক্ষিণের সহসভাপতি হীরক এবং আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা আমিনুল অন্য দুই গ্রুপের প্রধান। অভিযোগ আছে, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল আজীম তুষার, আওয়ামী লীগ নেতা আহকাম উল্লাহ এসব গ্রুপের পেছনে মদদ দিচ্ছেন। নিহত বাবু আগে মিলন ও হীরকের গ্রুপে থাকলেও সম্প্রতি সাগরের সঙ্গে যোগ দেন।

বাবু হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ যুবলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ব্যাপক তথ্য পেয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাগর ও তাঁর চার সহকর্মীকে। সম্প্রতি তাদেরই ঘনিষ্ঠ ছিলেন বাবু। দুই দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর গত বুধবার তাহযীব আহম্মেদ শাবাব (২৯) নামের এক আসামি ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সহকর্মীরাই হত্যা করেছে বাবুকে। এরপর প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তারা একপক্ষ অন্য পক্ষকে দোষারোপ করছে। একপক্ষ মামলায় অভিযুক্ত হলে অন্য পক্ষ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেবে।

মতিঝিল থানার ওসি ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বিরোধে খুন হয়েছে বাবু। সে আগে মিলন ও হীরকের গ্রুপে ছিল। সেখান থেকে বিট্রে করে সাগরের গ্রুপে যোগ দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আগের গ্রুপ মারতে পারে। আবার বর্তমান গ্রুপ ওই পক্ষকে ফাঁসাতে এ কাজ করতে পারে। ’ জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘ডিবির সঙ্গে যৌথ অভিযানে আমরা পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করি। আদালতের নির্দেশে দুই দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের মধ্যে শাবাব ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আসামিদের বক্তব্যে খুন ও খুনির বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়, তাই জানাচ্ছি না। ’

বাবুর বাবা ও মামলার বাদী আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের মধ্যে বিরোধে আমার ছেলে খুন হয়েছে। এর বেশি আমি কিছু জানি না। আমার সন্দেহের কথা পুলিশকে জানিয়েছি। আমি খুনি চিনি না। পুলিশ খুঁজে বের করবে কারা খুনি। পুলিশ যদি বলে সাগররা করেছে, আমার কী বলার আছে?’

গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের এজিবি কলোনির সামনের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন বাবু। আহত হন তাঁর বন্ধু ইমন। ঘটনার পরদিন বাবুর বাবা আবুল কালাম বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার এজাহারে আসামি অজ্ঞাতপরিচয় রাখা হলেও সন্দেহভাজন হিসেবে হীরক, মিলন, সানী, আমিনুল, রাজা ও আলমের নাম রাখা হয়। হত্যাকাণ্ডের পরই ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মারুফ রেজা সাগর অভিযোগ করেন, তাঁরা নিহত যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক মিল্কীর অনুসারী। মিল্কী হত্যায় জড়িত জাহিদ সিদ্দিকী তারেকের সহযোগী জাহিদুল ইসলাম টিপুর নির্দেশে মিলন, তুষার, হীরক, সানী, রাজাসহ আট-দশজন এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। অন্যদিকে টিপুসহ কয়েকজনের দাবি, সাগর ও তাঁর সহযোগীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে।

গত সোমবার সাগর-শাবাবসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্যরা হলো শেখ আবু মাহামুদ (৩৫), নাসির উদ্দিন (৩৩) ও আসিফ মোশারফ অন্তু (২৪)। আদালতের নির্দেশে তাদের দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গত বুধবার তাদের আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় শাবাব ঢাকা মহানগর হাকিম গোলাম নবীর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে শাবাব গ্রুপগুলোর বিরোধের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। এতে জানা গেছে, বাবু যেকোনো গ্রুপেরই টার্গেট হতে পারেন। তবে সাগরসহ তাঁর ঘনিষ্ঠরাও তাঁর বিপদের কারণ ছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবু তাহের ভূঁইয়া বলেন, ‘এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মূলত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সাগরের সঙ্গে একসময় বাবুর বিরোধ ছিল। পরবর্তী সময়ে তারা আবার এক গ্রুপ করে। এখানে অনেক হিসাব-নিকাশ আছে। শাবাব বিরোধগুলোর ব্যাপারে আমাদের কাছে এবং আদালতে বলেছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে নাম আসার পর থেকেই কয়েকজন পলাতক। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ’

স্থানীয় ও পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, মতিঝিলে চাঁদাবাজির আটটি বড় খাত নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় যুবলীগ। এগুলো হলো—মতিঝিল এলাকার সরকারি দপ্তরগুলোর ঠিকাদারি কাজ, বিআরটিসি বাস কাউন্টার, গার্মেন্ট কারখানা, গণপরিবহনগুলোর বাস কাউন্টার, আইডিয়াল স্কুলের সামনে থেকে শুরু করে মতিঝিল-গুলিস্তানের ফুটপাতের দোকান, ডিশ ব্যবসা, পানির ব্যবসা, আরামবাগ এলাকার ক্লাবগুলোর জুয়া ও হাউজির চাঁদাবাজি। এসব খাত থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে দুই কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হয়, যা বিভিন্ন মাধ্যমে বণ্টন হয়। একসময় মিল্কী ও তারেক মিলিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন মতিঝিলের এই চাঁদা বাণিজ্য। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তারেক-মিল্কী দুজনই পালিয়েছিলেন ভারতে। ওই সময় পরিসর ছোট হলেও চাঁদা আদায় করতেন সাগর। সাগর ছিলেন মিল্কীর কাছের লোক। তারেক ফিরে এসে চাঁদার টাকার হিসাব চাইলে সাগরের পক্ষ নেন মিল্কী। এ নিয়ে মিল্কী-তারেকের বিরোধ চরমে পৌঁছায়। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই গুলশানে মিল্কীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পরপরই র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তারেক।

সূত্র মতে, মিল্কী-তারেকের মৃত্যুর পর চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয় মতিঝিল যুবলীগের অনুসারীরা। হীরক, আমিনুল ও সম্প্রতি খুন হওয়া বাবু ছিলেন ক্রসফায়ারে নিহত যুবলীগ নেতা তারেক সিদ্দিকীর অনুসারী। মিল্কী খুনের পর ক্রসফায়ারে তারেকও নিহত হলে অনুসারীরা এলাকাছাড়া হয়ে যায়। এ সময় এলাকার বাণিজ্য-বেসাতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মিল্কী অনুসারী সাগর ও মিলনের হাতে। সম্প্রতি তাঁদের মধ্যেও বিরোধ বাধে।

সূত্র জানায়, তারেকের অনুসারী ছিলেন জাহিদুল ইসলাম টিপু। টিপুর অনুসারী মিলন। সাগরের সঙ্গে মিলে বাবু তাঁদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ান।

এদিকে টিপু, আহকাম উল্লাহ ও বাবু আগে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ফলে টিপু ও আহকাম উল্লাহর অনেক তথ্যই জানতেন বাবু। দুই পক্ষে একাধিক হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটেছে। সাগর গ্রুপের হাতে আহত হয়েছেন সানী নামের এক যুবলীগ নেতা। সাগরের নামে মামলা করেন মিলন। আবার পাল্টা সাগরও মিলনের নামে মামলা করেছেন। এর পরও যুবলীগ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ বা পুলিশ প্রশাসনের টনক নড়েনি।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা বলেন, বাবু হত্যাকাণ্ড তৃতীয় কোনো গ্রুপের কাজ হতে পারে। চাঁদা বাণিজ্যের দখল নিতে সব প্রতিপক্ষ গ্রুপ প্রধান ও তাদের ক্যাডারদের আসামি করা হয়েছে, যাতে তারা এলাকা ছাড়লে চাঁদা বাণিজ্য নির্বিঘ্ন হয়। ওই যুবলীগ নেতা জানান, এখন যারা খুনোখুনি করছে তারা বলতে গেলে মাঠের কর্মী। তাদের নিয়ন্ত্রক ও আশ্রয়দাতা ঢাকা মহানগর যুবলীগের একাধিক গডফাদার।


মন্তব্য