kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রাইম মুভার ধর্মঘট স্থগিত

১০০ ঘণ্টা পর সচল হলো রপ্তানি পণ্য পরিবহন

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



১০০ ঘণ্টা পর সচল হলো রপ্তানি পণ্য পরিবহন

প্রায় ১০০ ঘণ্টা পর পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন আবার সচল হয়েছে। গতকাল শুক্রবার কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ির মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘট স্থগিত করেন।

এতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চার দিন ধরে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা কেটে গেছে।

সকালে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক হয় ওই গাড়ির মালিক-শ্রমিকদের। এর পরই তাঁদের সংগঠন চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ট্রেইলার মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেয়। দুপুর ১২টায় এই ঘোষণার পর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার চলাচল পুরোদমে সচল হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা ইকবাল বাহার চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, মহাসড়ক দিয়ে চলাচলের সময় ১৪ চাকার একটি প্রাইম মুভার গাড়ি কনটেইনার ও পণ্যের ওজনসহ সর্বোচ্চ সাড়ে ৪২ টন বহন করতে পারবে। এর বাইরে নিতে হলে দুই হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে, আর এই জরিমানা পরিশোধ করবেন পণ্যের মালিক।

চট্টগ্রাম-ঢাকা চার লেন সড়কের স্থায়িত্ব রক্ষায় প্রজ্ঞাপন জারি করে পণ্য পরিবহনের পরিসীমা বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে একই গাড়ির সর্বোচ্চ ৩৩ টন বহনের অনুমতি ছিল। এর বেশি পণ্যের জন্য টনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে স্তরভেদে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হতো।

কিন্তু জরিমানা না দিয়ে বেশি পণ্য বহনের দাবি আদায়ে সোমবার সকাল ৮টা থেকে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন বন্ধ করে দেন গাড়ির মালিক ও শ্রমিকরা। শুধু আন্দোলনের জন্য ‘চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ট্রেইলার মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’ গঠন করে হঠাত্ করে ধর্মঘট শুরু করেন তাঁরা। এ কারণে প্রায় আট হাজার প্রাইম মুভার ট্রেইলারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে দেশের পুরো আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন।

সমস্যা সমাধানে সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার দিনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশনের মেয়র, জেলা প্রশাসকও একাধিকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সর্বশেষ গতকাল সকালে নিজ বাসভবনে ধর্মঘটীদের ডেকে নিয়ে বিষয়টির সাময়িক সমাধান করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার চৌধুরী।

জানা গেছে, মহাসড়কের পণ্য পরিবহনের এই জটিলতা নিয়ে আলোচনা করতে আগামী ৪ অক্টোবর ঢাকায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ট্রেইলার মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মাওলা বলেন, আগামী ৪ অক্টোবরে বৈঠক পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে। ওই দিন ঢাকায় মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জেনে পরবর্তী কর্মসূচি দেওয়া হবে।

এর আগে গতকাল সকাল পর্যন্ত পণ্যবাহী কনটেইনার নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ব্যবসায়ীরা। বের হতে না পারায় এত বেশি কনটেইনার বন্দরের ভেতর জমে গিয়েছিল যা গত ৩৯ বছরের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা পড়ে। এর মধ্যে সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার দিনে তিন হাজার কোটি টাকার পণ্যের জাহাজীকরণের সময়সীমা অতিবাহিত হয়ে যায়। বাকি পণ্যগুলো জাহাজীকরণের পর্যায়ে ছিল।

জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বন্দরে জমা হয়ে যায় ৪০ হাজার ২৫০টি কনটেইনার (প্রতিটি ২০ ফুট দীর্ঘ)। অথচ বন্দরে কনটেইনার রাখার জায়গা রয়েছে ৩৬ হাজার ৩৫৭টির।

এই অবস্থায় ধর্মঘট আর এক দিন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি সামাল দিতে জাহাজ জেটিতে ভিড়িয়ে খালি কনটেইনার সরানোর পরিকল্পনা পর্যন্ত নিয়েছিল বন্দর।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বাভাবিক সময়ে শুক্রবার সাধারণত পণ্যবাহী এক হাজার ২০০ একক কনটেইনার বন্দর থেকে সরবরাহ দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল শুক্রবার তিন হাজার একক কনটেইনার বন্দর থেকে সরবরাহ দেবে বলে ঠিক করে কর্তৃপক্ষ। আজ শনিবার এই সংখ্যা আরো বাড়বে। এতে বন্দরে কনটেইনারজট কমে আসবে।

ধর্মঘটের কারণে ১৬টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো থেকে কনটেইনার জেটিতে না পৌঁছায় গত চার দিনে অন্তত ১৮টি জাহাজ পর্যাপ্ত পরিমাণ রপ্তানি পণ্য না নিয়েই বন্দর ছেড়ে যায়। গতকাল সকালেও ধর্মঘট স্থগিত করার আগে বন্দর থেকে তিনটি কনটেইনার জাহাজ ছেড়ে গেছে, যেগুলোতে পর্যাপ্ত রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার ছিল না।

জানা গেছে, দেশের মহাসড়ক ও সেতুর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ গত ১৬ আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারি করে গাড়িভেদে পণ্য পরিবহনের সীমা বেঁধে দেয়। নির্ধারিত সীমার বেশি পণ্য পরিবহনের জন্য গাড়িগুলোকে স্তরভেদে দুই হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়।

কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি প্রাইম মুভার ও ট্রেইলারগুলো ১৪ চাকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এ ধরনের গাড়ি মালামালসহ ৩৩ টন পর্যন্ত পরিবহন করতে পারবে। এর বেশি হলে জরিমানা গুনতে হবে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনারে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৪ টন পণ্য নিতে পারে। আর কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি প্রাইম মুভার ও ট্রেইলারের ওজন হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২ টন। সব মিলিয়ে তারা পরিবহন করতে পারে ৩৬ টন। কিন্তু ওজন স্কেলে জরিমানা ছাড়া সর্বোচ্চ পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে ৩৩ টন। এতে করে তিন টন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ১৪ চাকার গাড়িগুলো ১৮ চাকার করলেই জরিমানা ছাড়াই পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।


মন্তব্য