kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জঙ্গিনেতাদের নাম প্রকাশ পায় দেড় বছর আগেই

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জঙ্গিনেতাদের নাম প্রকাশ পায় দেড় বছর আগেই

বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্যসহ জঙ্গি এরশাদ হোসেনকে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে গ্রেপ্তার করেছিল চট্টগ্রাম মহানগরের আকবর শাহ থানা পুলিশ। এরশাদ হোসেন তখনই পুলিশকে জানিয়েছিল জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নতুন পরিকল্পনার কথা।

ওই বছরের ২৯ মার্চ চট্টগ্রামের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ডা. নজরুল, রিপন, ফারদিন, রাজীব গান্ধীসহ শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিনেতাদের নাম প্রকাশ করে এরশাদ।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালে যখন এরশাদ এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করে, তখন জেএমবির পরিকল্পনার বিষয়টি খোদ পুলিশের কাছেই খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। তখনো নব্য জেএমবির তাণ্ডব শুরু হয়নি।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরশাদ হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি যদি সর্বাধিক গুরুত্ব পেত, তাহলে হয়তো আজ জাতিকে এত মাসুল দিতে হতো না। ’ তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, যে ফারদিনের কথা এরশাদ মার্চে প্রকাশ করেছে, সেই ফারদিনের অস্ত্র বাণিজ্য, ছিনতাইসহ সব কিছুই ফাঁস হয়েছে বছরের শেষার্ধে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। ওই সময়ে ফারদিন চট্টগ্রামেই ছিল। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে ধরতে পারেনি। উপরন্তু নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে ওই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল আদালতে। আর এরশাদের জবানিতে যে রাজীব গান্ধীর নাম এসেছে, তাকে এখন গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড দাবি করা হচ্ছে। উমায়েরের নাম প্রকাশ পেয়েছিল তখনই। পরে একজন উমায়ের গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছে। কিন্তু তাকে ডা. নজরুল হত্যার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদই করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই র‌্যাব কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘এরশাদ যে পরিকল্পনার কথা ফাঁস করেছিল, সেটি সঠিক ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম নগর পুলিশ (সিএমপি) সর্বাধিক গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই এরশাদের স্বীকারোক্তি রাষ্ট্রের কাজে আসেনি। ’

চট্টগ্রামে জঙ্গি দমনে কাজ করেন এমন এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ডা. নজরুলকে কোথায় কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল কিংবা লাশের টুকরোগুলো কোথায় ফেলা হয়, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশও হত্যা মামলা দায়ের করতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। এ ছাড়া এরশাদ যে নামগুলো প্রকাশ করেছিল, তার বেশির ভাগই ছদ্মনাম। সে কারণেই পুলিশকে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যদিও পরে ফারদিন ও রাজীব গান্ধীর নাম আলোচনায় এসেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ফারদিনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় ১০টি মামলা হয়েছিল। গত ডিসেম্বরে হাটহাজারীর জঙ্গি আস্তানায় পুলিশ হানা দেওয়ার আগেই ফারদিন পালিয়ে গিয়েছিল। সর্বশেষ ৩ এপ্রিল শেরপুরের একটি বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে ফারদিনের মৃত্যু হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজীব গান্ধী একটি ছদ্মনাম। তার আরো কয়েকটি নামের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তাকে উত্তরাঞ্চলের নেতা বলা হলেও এরশাদের জবানবন্দিতে উঠে আসে, রাজীব গান্ধীও অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত। চট্টগ্রাম থেকে ফারদিন তার জন্য ঢাকায় একে-২২, একে-৪৭ রাইফেল ও গুলি পাঠিয়েছিল। বান্দরবান থেকেই ফারদিনরা অস্ত্র সংগ্রহ করত এবং ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করত। এতে রাজীব গান্ধীও জড়িত।

রাজীব গান্ধী সম্পর্কে ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী ওরফে গান্ধী ওরফে আদিল ওরফে শান্ত নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গের কমান্ডার। গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় সে সন্ত্রাসী পাঠিয়েছিল। যখন কোনো হামলায় দক্ষ সন্ত্রাসীর প্রয়োজন হয়, তখন সে তা সরবরাহ করে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘গুলশানে দুজন এবং শোলাকিয়ায় একজন সন্ত্রাসী পাঠিয়েছিল এই গান্ধী। সে উত্তরাঞ্চলের কোথাও আত্মগোপন করে আছে বলে ধারণা করছি। ’

এরশাদের এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক জঙ্গি বুলবুল আহমেদ সরকার ওরফে ফুয়াদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। তার জবানবন্দিতে উঠে আসে আরেক জঙ্গি নেতা হাফেজ আবু রায়হানের নাম, যাকে এখন চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতা মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের মতে, চট্টগ্রামে জেএমবির শীর্ষ নেতা ছিল মো. রাইসুল ইসলাম খান নোমান ওরফে ফারদিন। দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা বুলবুল আহমেদ ফুয়াদ। ফারদিনের মৃত্যু এবং ফুয়াদের কারাজীবন শুরুর পর চট্টগ্রামে হাফেজ আবু রায়হানই জেএমবির হাল ধরেছে বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

ফুয়াদের জবানীতে ডা. নজরুলের সঙ্গে সাংগঠনিক বিরোধ শুরু হওয়ার আভাস পাওয়া যায়। ২০১৪ সালের জুন-জুলাইয়ে ফারদিন আবু রায়হানকে দায়িত্বে আনার ১০-১২ দিন পর ডা. নজরুল নগরের জিইসির মোড়ে ডেকে নেয় ফুয়াদকে। সে ওই সময় ফুয়াদের কাছে জানতে চায়, ফুয়াদ তাদের সঙ্গে থাকবে কি না। তখন ফুয়াদ বুঝতে পেরেছিল, জেএমবিতে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছে। এর পর থেকেই ফারদিন ও ডা. নজরুলের হয়ে কাজ করছিল ফুয়াদ। পরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সে।

ফুয়াদকে জিজ্ঞাসাবাদকারী একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ফুয়াদ পরে শুনেছে ডা. নজরুলকে ওপরের স্তরের নেতা করা হয়েছিল। জিইসির মোড়ে দেখা হওয়ার পর ডা. নজরুলের সঙ্গে ফুয়াদের আর দেখা হয়নি। ৪০ লাখ টাকা আর্থিক অনিয়ম এবং জেএমবির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ডা. নজরুলকে হত্যা করা হয়। রাজীব গান্ধী ও ফারদিনের ওপরের স্তরের জঙ্গি নেতা ছিল নজরুল। তাকে পাঁচজন মিলে হত্যা করার বিষয়টি এরশাদ জবানবন্দি দিয়ে জানানোর পরও ডা. নজরুল হত্যার তদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

দেড় বছর আগে নাম পাওয়ার পরও কেন জঙ্গি নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি জানতে চাইলে সিএমপির জঙ্গি কার্যক্রম মনিটরিং কমিটির প্রধান ও নগর পুলিশের বিশেষ শাখার উপকমিশনার মোখলেসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, নগর পুলিশ সক্রিয়ভাবেই জঙ্গি দমন অভিযান চালাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জঙ্গিরা ছদ্মনাম ব্যবহার এবং নাশকতার পর দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে। এ ছাড়া জঙ্গিরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। আবার করলেও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রাখে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফলে তাদের গ্রেপ্তার করতে বেগ পেতে হয়। ২০১৫ সালের মার্চে জানার পরও কেন ফারদিন, রাজীব গান্ধীসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফারদিন ও রাজীব গান্ধী দুটিই ছদ্মনাম। ছদ্মনাম ব্যবহারকারী ব্যক্তিকে ধরা কিছুটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। পুলিশ কাজ করছে। আশা করি, পলাতক জঙ্গিরা গ্রেপ্তার হবে। ’


মন্তব্য