kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রদর্শনী

কালো পাহাড়ের নীরবতা

নওশাদ জামিল   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কালো পাহাড়ের নীরবতা

ধানমণ্ডিতে গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে একক চিত্রকলা প্রদর্শনীতে শিল্পী হামিদুজ্জামান ও অন্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কারো কারো কাছে শারীরিক বয়স হার মানে। শিল্পী হামিদুজ্জামান খান মননের সজীবতা ও শ্রমের নিষ্ঠায় বয়সকে হার মানিয়েছেন।

শিল্পের পথে নিরন্তর হেঁটে যাওয়া পথিক সত্তরে পা দিয়েও সদা সৃষ্টিমুখর। কী ক্যানভাস, কী ভাস্কর্য—শিল্পের আঙ্গিনা ভরে তুলছেন নতুন সম্ভারে। কঠিন ধাতব পদার্থ বা পাথরের বুক চিরে গড়ে তুলছেন নিত্যনতুন শিল্পকর্ম। তাঁর হাতের স্পর্শে পাথর খণ্ডে যেন প্রাণ সঞ্চারিত হয়। প্রকাশিত হয় অসীম প্রাণের ব্যঞ্জনা। অবয়বের গুণে জড় বস্তুটি প্রাণসঞ্চারী হয়ে নজর কাড়ে শিল্পানুরাগীর। ভাস্কর্য চর্চার পাশাপাশি তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছেন আপন মনের মাধুরী। ভাস্কর্যের পাশাপাশি চিত্রশিল্পী হিসেবেও শিল্পরসিকদের কাছে সমাদৃত হামিদুজ্জামান খান। বিশেষ করে জলরঙে চিত্রিত শিল্পীর চিত্রকর্মগুলো অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বরেণ্য এ শিল্পীর ৭০টি চিত্রকর্ম নিয়ে ভিন্নধর্মী প্রদর্শনী শুরু হলো রাজধানীর শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, নিকষ কালো অন্ধকারে যেন বাতিঘরের মতো জেগে উঠেছে সাগর। সেখানে চকিত আলোর ঝলকানিতে আবছা দেখা যায় নৌকা, পানিতে ঢেউয়ের দোল, আকাশের মেঘ। চরাচরের নিঃসীম শূন্যতার মাঝে রহস্যময় প্রকৃতি। অন্ধকারে ফুটে ওঠে কালো পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি। মনে হয় যেন, অসীম নীরবতা নিয়ে হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়টি। হামিদুজ্জামান খানের ল্যান্ডস্কেপ নিছক ছবি নয়, তাঁর ক্যানভাস কবিতার মতোই রহস্যময়, নান্দনিক। শিল্পী বাংলাদেশের রূপবৈচিত্র্যে মুগ্ধ। এবারের প্রদর্শনীতে তাঁর ছাপ স্পষ্ট। অন্ধকার নদীতীরের কাব্য, কালো পাহাড়ের নীরবতা এক সুরেলা আবহ তৈরি করে। জলরঙে অসংখ্য মুখ মনে করিয়ে দেয় বিচিত্র জীবন ও মানুষের কথা।

রাজধানীর গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে শুরু হয়েছে হামিদুজ্জামানের ‘অফ নেচার, বোটস এন্ড ফেসেস’ শীর্ষক চিত্রপ্রদর্শনী। গতকাল এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহম্মদ আজিজ খান। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী, শিল্পসমালোচক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন শিল্পাঙ্গনের পরিচালক রুমী নোমান।

শিল্পী হামিদুজ্জামান খান প্রধানত ভাস্কর। তবে জলরঙের প্রতি তাঁর ভালোবাসা থেকে এ মাধ্যমেও অনেক দিন ধরে ছবি আঁকছেন। তাঁর ক্যানভাসে ভাস্কর্যের প্রভাব দেখা যায়। শিল্পী হামিদুজ্জামান খান এই সত্তরেও তরুণ শিল্পীর মতো নিজের কাজ নিয়ে নিরীক্ষা করেন, ভেঙেচুরে গড়েন। এবারের প্রদর্শনীতে নারীর ফিগারেটিভ কাজ তাঁর নতুন সংযোজন। ব্রাশের টানে সেসব ফিগারে কবিতার ছন্দ ফুটে উঠেছে।

হামিদুজ্জামান খান বললেন, ‘আমি না ঘুরলে ছবি আঁকতে পারি না। যেখানেই যাই মানুষ দেখি। তাদের জীবনযাপন, চলাফেরা, বাজার, বাড়িঘর সব। এসব কিছুই মনের মধ্যে একটা ছাপ ফেলে। সে সবই উঠে আসে ক্যানভাসে। ’

ভ্রমণ তাঁর শিল্পসাধনার প্রধানতম উৎস। গোটা বাংলাদেশকে ছুঁয়ে-ছেনে দেখেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান। পাশাপাশি ঘুরেছেন পৃথিবীর নানা দেশ। ভ্রমণকালে তিনি দেখেন প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্যাবলি, দেখেন মানুষ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার নানা নিদর্শন। ঘুরেফিরে শিল্পীর ক্যানভাসে উঠে আসে সেই ভ্রমণের নান্দনিক অভিজ্ঞতা। রাজধানীর শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে থরে থরে সাজানো তাঁর জলরঙের নানা ছবি। তাতে উঠে এসেছে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর নানা দেশের অনুপম দৃশ্যাবলি। পাশাপাশি উঠে এসেছে ফিগারেটিভ কাজের অপূর্ব নিদর্শন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুহম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘শিল্পী হামিদুজ্জামানের কাজের প্রতি নিষ্ঠা, ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর এই নিষ্ঠা, শ্রম দেখছি। শিল্পসমালোচক নই, তবে তাঁর ছবির আমি গুণমুগ্ধ ভক্ত। ’

শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী বলেন, ‘হামিদুজ্জামান সব সময় ব্যতিক্রম। তাঁর ক্যানভাস নিছক ছবি নয়, ফটোগ্রাফ নয়। তাঁর ছবিতে ভিন্নতা থাকে। নতুনত্ব থাকে। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি শিল্পীর ক্যানভাসকে কাব্যময় করে তোলে। ’

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শিল্পের প্রকাশে হামিদুজ্জামান খান অক্লান্ত। তাঁর নিজেকে প্রকাশের বাসনা শুধু মুগ্ধই করে না, তাঁর অধ্যবসায় ও নিষ্ঠা আমাদের গর্বিত করে। ’

রুমী নোমান বলেন, ‘হামিদুজ্জামান খান বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী। এবারের প্রদর্শনীতে শিল্পীর নতুন ধরনের ছবি শিল্পরসিকদের আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে নারী ফিগারেটিভ ছবি আর মুখোশ। ’

প্রদর্শনীতে সাম্প্রতিক আঁকা ৭০টি জলরঙ আর স্কেচ স্থান পেয়েছে। ধানমণ্ডির ৩০ নম্বর সড়কের গ্যালারি শিল্পাঙ্গনে প্রদর্শনী চলবে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত।


মন্তব্য