kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


স্কুলের জমি দখল রোধে ১৫ ছাত্রীর লড়াই

রফিকুল ইসলাম পটুয়াখালী থেকে ফিরে   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



স্কুলের জমি দখল রোধে ১৫ ছাত্রীর লড়াই

সাতসকালে পটুয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কিছু লোকের জটলা। তারা বহিরাগত, ভাড়া করা।

স্কুলের পশ্চিম কোণে বালু ফেলে সরকারি পুকুর ভরাট করতে শুরু করে। দখলের এই কর্মকাণ্ড দেখে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে স্কুলের কয়েকজন ছাত্রী। তারা ছুটে গিয়ে শিক্ষকদের খবর দেয়। শিক্ষকরা তাৎক্ষণাৎ এসে দেখেন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক গাজী হাফিজুর রহমান ওরফে সবির। তাঁর নেতৃত্বে চলছে স্কুলের জমি দখল। ওই সময় শিক্ষকরা ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাননি। পরে তাঁরা জেলা প্রশাসকের দারস্থ হন। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক নড়েচড়ে বসেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতার নাম শুনে তিনিও থেমে যান।

তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের পিছুটান ও জেলা প্রশাসকের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা দেখে দখলরোধে সাহসী লড়াই করে ১৫ জন ছাত্রী। তারা জড়ো হয়ে স্কুলের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। দখলদারের বিরুদ্ধে পৌর মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ করে। কিন্তু দখল সাময়িক বন্ধ হলেও আওয়ামী লীগ নেতার চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতা গাজী হাফিজুর রহমান সবিরের ভাইয়ের বাড়ি রয়েছে স্কুলের পাশে। সেই বাড়িতে যাওয়ার পথ তৈরি করতে চলছে সরকারি পুকুর ভরাটের কাজ। তাঁর ভাইয়ের নাম সাঈদুর রহমান গাজী। যিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাড়ি যাওয়ার পথ তৈরি করতে সরকারি পুকুরসহ স্কুলের জমি দখল করছেন আওয়ামী লীগ নেতা সবির।

স্কুলের ছাত্রীরা বলছে, দখলের ফলে তারা খেলাধুলা করতে পারছে না। এমনকি কম্পাউন্ডে বহিরাগতদের অবাধ চলাচলের কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ২৫ সেপ্টেম্বর রাত থেকেই সরকারি পুকুর ভরাটের পাশাপাশি স্কুল মাঠের একটা অংশ দখল করে রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছিল। পরের দিন সকালে বিষয়টি তাদের নজরে আসে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পটুয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের ভবনসংলগ্ন খেলার মাঠ, প্রধান শিক্ষকের বাসভবনসংলগ্ন পশ্চিম-উত্তর পাশে সরকারি পুকুর। সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক গাজী হাফিজুর রহমান সবির চলাচলের জন্য পুকুর ভরাট করে রাস্তা তৈরি করছিলেন। এজন্য বিদ্যালয় লাগোয়া বেশ কয়েকটি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সরকারি পুকুরটির উত্তর-পূর্বাংশে বালু ফেলে ভরাট করেছেন। সঙ্গে খেলার মাঠের একটা অংশ ভরাট চলছে। এসব ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন নীরব থাকলেও স্কুলের জমি দখল ঠেকাতে লড়ছে ১৫ জন ছাত্রী।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর ১৫ জন ছাত্রীর স্বাক্ষরিত একটি আবেদন মেয়রের কাছে পাঠানো হয়। আবেদনে বলা হয়, ‘বিদ্যালয়ের পশ্চিম দিকের ভবনসংলগ্ন গেটের পরেই আমাদের খেলার মাঠ। সেই মাঠটি আমাদের একমাত্র খেলার স্থান। ‘দুর্ভাগ্যবশত জনৈক প্রতিবেশী সরকারি পুকুর ভরাট করে রাস্তা তৈরি করছেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের রাস্তার সঙ্গে একত্র করে বিদ্যালয়ের জমি দখলের পাঁয়তারা করছেন। দখলের এই পদক্ষেপ বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি। ’

স্কুলের জমি দখল ঠেকাতে লড়াই করা ওই ১৫ ছাত্রী হলো—মালিহা বিনতে নজরুল, সাজিয়া আফরোজ ঐশী, সামিয়া শফিক প্রভা, অনানিম সাইমা রাইতা, উম্মে কুলসুম ফাল্গুনী, অনন্যা সরকার অন্তরা, সানজিদা আফরিন ঐশী, লামিয়া ইসলাম জাবিন, খন্দকার মাইশা, মৌমিতা দত্ত, মারিয়া জাহান সিনথিয়া, অধিকা দত্ত, ইমরানা জাহান ইতু, মারজান ইসলাম ও তাবিয়া জামান অর্পি।

ওই ছাত্রীরা কালের কণ্ঠকে বলে, ‘খেলার মাঠ উদ্ধারের জন্য আমরা প্রধান শিক্ষকের কাছে ছুটে গেছি। স্যার আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের সভাপতি জেলা প্রশাসকের কাছে দখলরোধে করণীয় ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। জেলা প্রশাসক বিদ্যালয়ের মাঠটি অবৈধ দখলদারদের রুখতে কোনো পদক্ষেপ নেননি। শুনেছি, ডিসি স্যার বিষয়টি নিয়ে জনপ্রতিনিধির সঙ্গে শিক্ষকদের আলোচনা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষকরা সাহস পাচ্ছিলেন না। আমরা তো শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করি, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই মেয়রের কাছে আবেদন করেছি। ’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্যদের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক এ কে এম শামীমুল হক সিদ্দিকী গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি পুকুর ভরাটের পাশাপাশি স্কুল মাঠের পাশ দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছিল। শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে সেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। রাস্তা নির্মিত হবে না বলে জনপ্রতিনিধিরা আশ্বস্ত করেছেন।

সরকারি পুকুর ভরাট ও গাছ কাটার ব্যাপারে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে এমনটা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘কাগজপত্র যাচাইয়ে কাজ চলছে, সে অনুযায়ী পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক গাজী হাফিজুর রহমান গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পৌরসভার মেয়র ডা. শফিকুল ইসলাম স্থানীয়দের চলাচলের সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প দিয়েছিলেন। সেই প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে রাস্তা নির্মাণের জন্য পুকুরের পাশের একটি অংশ ভরাট করেছি। স্কুলের কিছু জমি ভরাটের সময় শিক্ষার্থীরা বাধা দিয়েছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মেয়রের আলোচনা চলছে, তাই কাজ সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রয়েছে। ’

মৌখিকভাবে আমাকে ঠিকাদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এমনটি দাবি করে গাজী হাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘স্কুলের পাশে আমার কোনো জমি নেই। আমার ভাই সাঈদুর রহমান গাজীর (বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত) ১৫ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি রয়েছে। সবাই ভাবছে সেই সুবিধার্থে রাস্তা তৈরি করছি। ’

এ ব্যাপারে জানতে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পটুয়াখালী পৌরসভার মেয়র ডা. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে দুই দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।


মন্তব্য