kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কালীগঞ্জে কাজ না করে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন

হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কালীগঞ্জে কাজ না করে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন

প্রত্যন্ত এলাকার সুবিধাবঞ্চিত ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মানুষের মাঝে বিনা মূল্যে সৌর বিদ্যুৎ প্রদানের কার্যক্রম চালাচ্ছে সরকার। এর আওতায় কাবিখা ও টিআর কর্মসূচি বাস্তবায়নে মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ব্যয় করা হচ্ছে সৌরবিদ্যুতের পেছনে।

সরকারের এই ‘মহাপরিকল্পনা’ ভেস্তে যেতে বসেছে উত্তরের জেলা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে। এ উপজেলায় সোলার হোম সিস্টেম বাস্তবায়নে কোনো কাজই শুরু করা হয়নি। অথচ বরাদ্দের টাকা ফেরত যাওয়ার ভয়ে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই নিয়মবহির্ভূতভাবে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে সেই টাকা ‘লোপাটের’ আশঙ্কা করছে। যদিও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, পুরো টাকা তুলে একটি যৌথ অ্যাকাউন্টের ব্যাংক হিসাবে তা জমা রাখা হয়েছে। এ বাস্তবতায় একদিকে যেমন প্রত্যাশায় থাকা সুবিধাভোগীরা টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের এ প্রকল্প এখানে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) ও গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা/কাবিখা) প্রকল্পের আওতায় কালীগঞ্জ উপজেলার আটটি ইউনিয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। বরাদ্দের টাকার অর্ধেক দিয়ে ৩৭টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় সোলার প্যানেল স্থাপনের। এর মধ্যে বিভিন্ন স্কুল-মাদ্রাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বাড়িতে মোট ৪০০টি প্যানেল স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব স্থাপনে মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯০ লাখ টাকা। যার পুরোটাই গত ৩০ জুন উত্তোলন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাহীনুর আলম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রাশেদুল ইসলাম যৌথভাবে সোনালী ব্যাংকের কালীগঞ্জ শাখায় ‘সোলার প্যানেল স্থাপন কর্মসূচি’ নামে একটি হিসাব খুলে উত্তোলনকৃত ওই টাকা জমা রেখেছেন। কাজ না করে ফেরত যাওয়ার ভয়ে এভাবে টাকা তুলে ফের যৌথ হিসাবে জমা রাখা নিয়মবহির্ভূত কাজ বলে মনে করেন খোদ সরকারি কর্তকর্তারাই। যদিও পিআইও দাবি করেছেন, ‘ওই নিয়মে টাকা জমা রাখা যায়। ’ কিন্তু এর পক্ষে কোনো সরকারি নিয়ম দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, ইডকলসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মাধ্যমে জানা গেছে, টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে একটি নির্দেশনা ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর জারি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। প্রথমে ইডকল অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে প্যানেল কেনার নির্দেশ থাকলেও সর্বশেষ ওই প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট করে দেয়। সে অনুযায়ী গত অর্থবছরে কালীগঞ্জে ওই ৪০০টি প্যানেল স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হয় ‘পল্লী শক্তি ফাউন্ডেশন লিমিটেড (পিএসএফএল)’ নামের ইডকল অনুমোদিত একটি প্রতিষ্ঠানকে।

অর্থবছর শেষ হওয়ার পরও প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগটির বিষয়ে সরেজমিন ঘুরে সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রকল্প তালিকায় নাম আছে এমন একাধিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের কেউই সোলার প্যানেল পায়নি বলে জানা গেছে। অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও তা স্বীকার করেছেন অকপটে। তবে কী কারণে ঠিক এমনটি হয়েছে তা কেউ স্পষ্ট করে জানাতে পারেননি। তবে উপকারভোগীর তালিকায় থাকা অনেকে মনে করে, প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে পুরো টাকা লোপাটের কারণেই দায়িত্বরতরা এ কাজ করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গত ২১ সেপ্টেম্বর কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রাশেদুল ইসলামের কার্যালয়ে গেলে তিনি প্রথমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে প্রমাণ দেখানোর পর তিনি স্বীকার করেন, এখন পর্যন্ত একটি সোলার প্যানেলও লাগানো হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই পুরো টাকা উত্তোলন এবং তা পিআইও-ইউএনওর যৌথ হিসাবে রাখার সরকারি কোনো নিয়ম আছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল আমি আপনাদের জানাব। ’ কিন্তু ওই দিন থেকে নিজের কার্যালয়ে ওই কর্মকর্তাকে আর পাওয়া যায়নি। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তাঁকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি। জানা গেছে, ওই পিআইও অন্যত্র বদলির জন্য ঢাকায় চেষ্টা চালাচ্ছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী ৩০ জুনের মধ্যে ওই অর্থবছরের প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া ঠিক হয়নি স্বীকার করে বলেন, ‘স্থানীয় একটি ঝামেলার কারণে এমনটি হয়েছে। তবে তা বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলে কালীগঞ্জের পিআইও আমাকে জানিয়েছেন। ’

বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা খোঁজখবর শুরু করার পরই তা নিয়ে তৎপর হন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা এত দিন পরে এসে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা কৌশল ঠিক করা শুরু করেছেন। সে অনুযায়ী পল্লী শক্তি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে প্রকল্প কমিটিগুলো যাতে দ্রুত চুক্তি করে সে জন্য তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন পিআইও। তবে সেই চুক্তি ৩০ জুনের আগেই করা হয়েছে—কাগজপত্রে এমনটি দেখানো হবে বলে জানা গেছে। তবে অর্থবছর শেষ হওয়ার পর তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে স্থানীয়দের অনেকেই।


মন্তব্য