kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

পেশা

জীবনের ঘানি টেনে

আহসান হাবিব, আঞ্চলিক প্রতিনিধি   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জীবনের ঘানি টেনে

শিবগঞ্জের হাজারবিঘী গ্রামে ৩০ বছর ধরে ঘানি টানছে একটি পরিবার। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘পেটের দায়ে মানুষ কত কী করে। ’ একসময় এমন কথা জীবনসংগ্রামের প্রজ্ঞা ছিল।

এখন পেটের দোহাই দিয়ে কত রকম বাজে পেশায় নিয়োজিত মানুষ। পাড়ার চায়ের দোকানে হরহামেশা বয়োজ্যেষ্ঠদের আফসোস করতে শোনা যায়—‘বড় বড় কথা ছাড়? এই দুনিয়ায় আর ভালো মানুষ নাই। সব কিছুতে ভেজাল। ’ আবার এমনও শোনা যায়—‘ভালো মানুষ আছে বলেই দুনিয়া এখনো টিকে আছে। ’ ঠিক তাই; হরিপদ, শম্ভুপদ ও তারাপদ তিন ভাই। মানুষকে ভেজাল খাওয়াবেন না বলে ৩০ বছর ধরে টানছেন তেলের ঘানি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর হাজারবিঘী গ্রাম। এই গ্রামে বংশপরম্পরায় সরিষার তেল বিক্রি করে জীবন কাটাচ্ছে একটি পরিবার। বাড়িতে তারা নিজেরাই ঘাড়ে জোয়াল তুলে ঘানি টানে। যদিও প্রাকৃতিক এ পদ্ধতি এখন অনেকটাই উঠে গেছে। আগে মূলত দুটি গরু দিয়ে ঘানি টানানো হতো। কিন্তু এই পরিবারটি ব্যতিক্রম। গরু কেনার সামর্থ্য তাদের নেই।

গ্রামের অনেকেই বলেছে, ‘আরে এভাবে কি জীবন চলে? অন্য কাজ কর। হাতে বেশি টাকা আসবে, পেটে ভাতের অভাব হবে না। ’ সীমান্ত এলাকায় যখন বাড়ি তখন চোরাচালান, মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কত মানুষ রোজগার করছে। কিন্তু পরিবারটি তা করেনি। বাপ-দাদার পেশার প্রতি আনুগত্য থেকে এই পেশা তারা ছাড়েনি। তারা মনে করে, মানুষকে ভেজাল তারা খাওয়াবে না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হরিপদ, শম্ভুপদ ও তারাপদ সাহার বয়স ৫৫ থেকে ৬৫-এর ঘরে। তাঁদের স্ত্রীরাও এখন প্রায় বৃদ্ধ। ৩০ বছর ধরে তাঁরা ঘানি টানছেন। উৎপাদিত তেল গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। কয়েক শতক জমির ওপর পৈতৃক ভিটায় ঠাসাঠাসি করে বাস করেন তাঁরা।

হরিপদ সাহা ও তাঁর স্ত্রী মিনতি রানী সাহার সম্বল ছোট দুটি ঘর ও একটি ঘানি। এক ঘরে বসবাস আর অন্য ঘরে তেল উৎপাদন। হরিপদ সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবা রসোরাজ ঘানি থেকে সরিষার তেল উৎপাদন ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। বংশপরম্পরায় ঘানি থেকে সরিষার তেল উৎপাদনে জড়িয়ে পড়েছি। বাপ-দাদার উপদেশ মানতে অন্য পেশায় যাইনি। খুব কষ্ট হয় কিন্তু শান্তি আছে। মানুষকে ভেজাল খাওয়াতে চাই না। ’

হরিপদ সাহা আরো জানান, প্রতিদিন সাড়ে তিন কেজি সরিষার এক কেজি তেল এবং আড়াই কেজি খইল বিক্রি করে লাভ পান ১০০ টাকা। তাই দিয়ে পাঁচজনের সংসার কোনো রকমে চলে। কোনো কারণে তেল বিক্রি করতে না পারলে সেদিন না খেয়েই থাকতে হয়। দিনে দুইবার সরিষা ভাঙাতে হয়। উন্নত মানের ১০ কেজি সরিষায় তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি তেল হয়। ’

হরিপদ সাহার স্ত্রী মিনতি রানী সাহা বলেন, ‘টাকার অভাবে গরু কিনতে পারিনি। তাই স্বামীর পাশাপাশি নিজেও ঘানি টানি। অহংকার একটাই—কাজ করি, ভিক্ষা করি না। ’

তারাপদ সাহার বয়স এখন ৬০ বছর। তাঁরও রয়েছে একটি ঘানি আর চার হাজার টাকা পুঁজি। ঘানি টানার জন্য তাঁরও কোনো গরু নেই। গ্রামে গ্রামে ঘুরে স্বামী-স্ত্রী দুই কেজি তেল ও পাঁচ কেজি খইল বিক্রি করেন। সেখান থেকে লাভ যা আসে তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে।

তারাপদ সাহা বলেন, ‘আমরা তিন ভাই এভাবেই সংসার চালিয়ে আসছি। নিজেরা ঘানি টেনে এখন একটুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এক দিনে একটি গরু চার ঘণ্টা ঘানি টেনে ছয় কেজি সরিষা ভাঙাতে পারে। এতে তেল হয় প্রায় পৌনে দুই কেজি। ছয় কেজি সরিষা ভাঙাতে গরুটিকে ঘুরতে হয় প্রায় ২৮ কিলোমিটার পথের সমান। গরু দিয়ে ঘানি টানাতে পারলে দ্বিগুণ তেল পাওয়া যেত। কিন্তু আমাদের গরু কেনার সামর্থ্য আর হয়ে ওঠে না। ’

গ্রামের বাসিন্দা খাদেমুল জানান, পরিবারের এই তিন ভাইয়ের রয়েছে আরো পাঁচ ভাই। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। তাঁরা খুব পরিশ্রমী। নিজেরাই পালাক্রমে ঘানি টেনে সরিষা ভাঙিয়ে তেল বিক্রি করে কোনোমতে দিন যাপন করেন।

জানা যায়, ৩০ বছর আগে শিবগঞ্জে খাঁটি সরিষার তেলের জন্য প্রায় ২০০টি ঘানি ছিল। বর্তমানে টিকে রয়েছে ৫০টির মতো। নতুন আলিডাঙ্গা গ্রামের সত্যরঞ্জন সাহা, স্বাধীন চন্দ্র সাহা, যতীন চন্দ্র সাহা, রসুলপুরের জহুরুল, সোহবুল ও মতি এখনো এই পেশায় জড়িত।

 


মন্তব্য