kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রাইম মুভার-ট্রেইলর ধর্মঘটের চার দিন

১৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য আটকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



১৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য আটকা

ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য আটকা পড়েছে। এর মধ্যে গত চার দিনে তিন হাজার কোটি টাকার পণ্যের জাহাজীকরণের সময়সীমা অতিবাহিত হয়েছে।

বাকি ১০ হাজার কোটি টাকার পণ্য জাহাজীকরণের পর্যায়ে আছে। এগুলো চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর ও কলম্বো বন্দর হয়ে ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের কাছে পৌঁছার কথা ছিল। এ কারণে এরই মধ্যে বেশ কিছু জাহাজ কনটেইনার না নিয়েই বন্দর ছেড়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ হাজার কোটি টাকার আমদানি পণ্য আটকা পড়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের শিল্প-কারখানা।

গত সোমবার সকাল থেকে এই ধর্মঘট ডাকে সড়কপথে কনটেইনারবাহী বৃহৎ যান প্রাইম মুভার ও ট্রেইলর মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। মহাসড়কে ‘অতিরিক্ত’ মাসুল আদায়ের প্রতিবাদে এ ধর্মঘট চলছে। ধর্মঘট অবসানে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ডাকা আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যেই চট্টগ্রাম সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন আচমকা হুমকি দিয়েছে, আজ শুক্রবারের মধ্যে দাবি আদায় না হলে শনিবার থেকে তারাও একই কারণে ধর্মঘটে যাবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সহ-সভাপতি মাহবুবুল আলম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের পণ্য পরিবহনকে যে যার ইচ্ছেমতো জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছে। এটা অন্যায় ও অনৈতিক। সরকারের ভাবমূর্তির ক্ষতি করার অপচেষ্টা কি না খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ এমন বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি যে চার দিন ধরে ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। ’

মাহবুবুল আলম বলেন, ‘চট্টগ্রাম-ঢাকা চার লেন সড়কে বাড়তি ওজনের পণ্য পরিবহনের ফলে যে জরিমানা গুনতে হচ্ছে সেটা আমরা আমদানি-রপ্তানিকারকরা দেব। কিন্তু ১২ হাজার টাকার জরিমানা বন্ধ করতে গিয়ে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার ক্ষতি করছে কারা? জানা উচিত। ’

নিয়মানুযায়ী, সারা দেশ থেকে কাভার্ড ভ্যানে পণ্য এনে চট্টগ্রাম বন্দরসংশ্লিষ্ট ১৬টি ডিপোতে (অফ ডক) রাখা হয়। এরপর সেখানে রপ্তানি পণ্য কনটেইনারে বোঝাই করে সিলগালা করে দেওয়া হয়। পরে প্রাইম মুভার বা ট্রেইলরে করে এসব কনটেইনার বন্দরে নিয়ে জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ শতাংশ রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়। এর বাইরে ৫ শতাংশ আনা হয় দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলো (ইপিজেড) থেকে। এ ছাড়া ৩৫ ধরনের আমদানি পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে সরাসরি ডিপোতে নিয়ে সরবরাহ করা হয়। ধর্মঘটের কারণে এসব ডিপোতে ব্যাপক কনটেইনারজটের সৃষ্টি হয়েছে।

কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার সচিব রুহুল আমিন সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধর্মঘটের কারণে গত চার দিনে দুই হাজার ৭০০ একক (২০ দৈর্ঘ্যের একক) কনটেইনার রপ্তানির জন্য প্রস্তুত হলেও জাহাজে ওঠানো যায়নি। এগুলোর মূল্য আনুমানিক তিন হাজার কোটি টাকা। আর এক দিন ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে এসব পণ্য হয়তো বিমানে বিদেশে পাঠানো লাগতে পারে। ’

রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘এর বাইরে পৌনে সাত হাজার একক কনটেইনার রপ্তানির জন্য জাহাজীকরণের অপেক্ষায় আছে। আর আমদানি পণ্য আছে পাঁচ হাজার ২০০ একক। সব মিলিয়ে আর এক দিন ধর্মঘট থাকলে আমরা আমদানি-রপ্তানি কোনো পণ্যই নিতে পারব না। ’

এদিকে সোমবার সকাল থেকে ধর্মঘটের কারণে প্রতিদিনই জাহাজগুলো রপ্তানি পণ্য না নিয়েই বন্দর ছেড়ে যাচ্ছে। আর আমদানি পণ্য এলেও কনটেইনারগুলো বের হতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা উভয় সংকটে পড়েছেন।

বিজিএমইর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক মালিকরা আমদানি পণ্য আসা ও রপ্তানি পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছা পর্যন্ত প্রতি মিনিট হিসাব কষে শিডিউল ঠিক করেন। এই চ্যানেলে কোথাও ব্যাঘাত ঘটলে পুরো উৎপাদনেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর আর্থিক ক্ষতির বোঝা বইতে হয় আমাদের। ’

জানা গেছে, দেশের মহাসড়ক ও সেতুর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ গত ১৬ আগস্ট প্রজ্ঞাপন দিয়ে গাড়িভেদে পণ্য পরিবহনের সীমা বেঁধে দেয়। নির্ধারিত সীমা অতিক্রান্ত হলেই গাড়িগুলোকে স্তরভেদে দুই হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারিত হয় প্রজ্ঞাপনে। কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি প্রাইম মুভার ও ট্রেইলরগুলো ১৪ চাকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এ ধরনের গাড়ি মালামালসহ ৩৩ টন পর্যন্ত পরিবহন করতে পারবে। এর বেশি হলে জরিমানা গুনতে হবে। গত ২৩ আগস্ট এ প্রজ্ঞাপন কার্যকর করতে গিয়ে শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে হোঁচট খায় সড়ক পরিবহন বিভাগ। কোরবানি ঈদের কারণে সে সময় সাময়িক স্থগিত করে গত শনিবার থেকে এ প্রজ্ঞাপন কার্যকর করতে গেলে প্রায় আট হাজার প্রাইম মুভার ও ট্রেইলরের মালিক ও শ্রমিকরা একজোট হয়ে রবিবার রাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে সোমবার থেকেই ধর্মঘট পালন শুরু করে।

চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজার গোলাম মোহাম্মদ সারোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘পণ্য পরিবহনের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী একটি ২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনার ২৪ টন পর্যন্ত পণ্য বহন করতে পারে। ট্রেইলর ও প্রাইম মুভার গাড়ির ওজন ১২ টন যোগ করলে পণ্যসহ মোট ওজন দাঁড়ায় ৩৬ টন। কিন্তু মহাসড়কে বিনা জরিমানায় ৩৩ টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। ফলে এখানে তিন টনের ব্যবধান নিয়েই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা বিষয়টি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। ’  তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন রপ্তানি পণ্য না নিয়ে জাহাজগুলোর বন্দর ছাড়া একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বিশ্ববাণিজ্যে। এটা আমাদের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলছে। ’

ধর্মঘট নিয়ে আলোচনা করতে আগামী ৪ অক্টোবর ঢাকায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সেই বৈঠকের আগ পর্যন্ত চলমান ধর্মঘট স্থগিতের দাবি জানানো হয় গতকাল জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে। কিন্তু ধর্মঘটীদের দাবি ছিল, চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে চার লেনের ওজন স্কেলগুলো ৪ অক্টোবর পর্যন্ত কার্যকর না করলে আজ থেকেই পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল শুরু হবে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ে কথা বলে এর কোনো সুরাহা করতে না পারায় সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।  

 


মন্তব্য