kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অসমাপ্ত সৃষ্টির ভার

এই শেষের শুরু কোথায়

আজিজুল পারভেজ   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এই শেষের শুরু কোথায়

অসমাপ্ত রইল মঞ্চনাটক অনুবাদ গল্প উপন্যাস কবিতা লেখা ছবি আঁকা

‘অত্যন্ত নাটকীয় সময়ে আমি জন্ম নিয়েছি। আমার জন্মের পরপরই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ।

আমার যখন প্রথম কৈশোর তখন দেশভাগ। আবার কৈশোর থেকে যখন যৌবনে পা রাখছি তখন ভাষা আন্দোলন। যৌবনটা যখন বেশ জমে উঠেছে তখন সামরিক শাসন। কী বলব? তারপরে আমি হিন্দুপ্রধান জায়গায় জন্মেছি, মুসলিম ঘরে জন্মেছি, ব্রিটিশ আমলে জন্মেছি। কাজেই আমি মনে করি যে সবদিক থেকেই এটা আমাকে লেখালেখিতে সাহায্য করেছে। আর মানব-মানবীর প্রেমও তো সবার জীবনেই আসে, এবং আমার জীবনের দুটি ঘটনা—একটা হচ্ছে দেশভাগ আরেকটা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। এই দুটি বিশাল মাপের ঘটনা আমাকে তৈরি করে দিয়েছে। ’

সম্প্রতি কবি শামীম রেজাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। সাক্ষাৎকারটি গতকাল বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত হয়েছে। জীবনভর দুই হাত ভরে লিখেছেন তিনি। এমনকি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লিখেছেন। কাঙ্ক্ষিত লেখার কাজগুলো শেষ করার জন্য ব্যাকুল হয়েছিলেন।    

শরীরে দুরারোগ্য ক্যান্সার বাসা বাঁধলেও জীবনের জয়গান করেছেন। লেখার জন্য ব্যাকুল থেকেছেন। শেষ সময়ের কলম কখনো কবিকে সায় দিয়েছে, কখনো বা থেকে গেছে অসমাপ্ত। তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে শুয়ে ছিলেন বটে। কিন্তু তার অফুরান প্রাণশক্তি ছিল অবিচল। শেষ মুহূর্তে যখন নিজ হাতে লিখতে পারতেন না, স্ত্রী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হককে দিয়ে লিখিয়েছেন। সেসব লেখার কিছু শেষ হয়েছে, কিছু লেখা শেষ করে যেতে পারেননি।

গত এপ্রিল মাসে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সৈয়দ হক লন্ডনে যান। সেখানে বসে তিনি অনুবাদ করেন  শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’। নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, “চরম অসুস্থতার মধ্যেও তিনি ভাষা, শব্দ ও বিষয় ঠিক রেখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ‘হ্যামলেট’ নাটকের অনুবাদ করেছেন। তবে ‘কিং লিয়ার’-এর অনুবাদ করতে পারলেন না। তার আগেই তাঁকে চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে। এটা আমাদের জন্য যে কত বড় ক্ষতি। ” 

সৈয়দ শামসুল হক নতুন আরেকটি মঞ্চনাটক লেখায়ও হাত দিয়েছিলেন। নামও ঘোষণা করেন ‘শেষ যোদ্ধা’। নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ লন্ডনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে নাটকটি ঢাকা থিয়েটারকে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ কালের কণ্ঠকে জানান, হাসপাতালে বসে সৈয়দ হক ‘শেষ যোদ্ধা’র পাঁচটি পর্ব পর্যন্ত লিখতে পেরেছেন। এই অবস্থায় থেমে গেছে তাঁর জীবনীশক্তি। ফলে আর হয়তো মঞ্চের আলোয় উদ্ভাসিত হবে না ‘শেষ যোদ্ধা’।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রোগশয্যার মধ্যেই শতাধিক কবিতা রচনা করেছিলেন তিনি। লিখেছেন গানও। এর মধ্যে একটি গান লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে। গানটি সুর করেছেন খ্যাতিমান সুরকার সুজেয় শ্যাম। গানটি গতকাল শিল্পকলা একাডেমিতে শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গাওয়ার কথা ছিল রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার। সৈয়দ হকের মৃত্যুতে অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে।

রোগশয্যায় শুয়ে শুয়ে গল্পও লিখেছেন। যার একটি গল্প গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় কালের কণ্ঠ’র সাহিত্য সাময়িকী দশদিকে। ওই অবস্থায় একটি উপন্যাস লেখার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কবি শামীম রেজার নেওয়া সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে সৈয়দ হকের কাছে প্রশ্ন ছিল তাঁর চিত্রকলা নিয়ে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘অনেক ছবি এঁকেছি, যা নিতান্তই শখে, অবসর সময় কাটানোর জন্য আড্ডা দিয়ে নয়। আড্ডা দিয়েছি আমার স্টুডিওর ছবির ক্যানভাসে। আমার আশিতম জন্মবার্ষিকীতে প্রদর্শনী করব। ’ কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তিনি তা দেখে যেতে পারলেন না।

বিশিষ্ট গবেষক ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘শত অসুস্থতার মধ্যেও সৈয়দ হক লিখেছেন। তাঁর প্রজন্মের যত লেখক-কবি আছেন কেউ তাঁর মতো লিখে যেতে পারেননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি লিখেছেন। আমার সঙ্গে যখন শেষ দেখা হলো তখনো তিনি জানালেন, তাঁর হাতে চারটি নাটকের রসদ রয়েছে। সব তিনি লিখে যেতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর হতে বেশি সময় নেই। ’

সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক সুবর্ণ জয়ন্তী দেখে যেতে পারেননি কিন্তু সুবর্ণ সময় দেখে গেছেন। উনি যে দেশ দেখতে চেয়েছিলেন তার সুবর্ণ সময় শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশের সুবর্ণ সময় তিনি দেখে যেতে পেরেছেন। সৈয়দ হক তাঁর জীবদ্দশায় দেখতে চেয়েছিলেন অসামপ্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। একটি শুরু তিনি দেখে গেলেন। ’ 

 


মন্তব্য