kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মসজিদে বোমা হামলা শীর্ষ জঙ্গিদের নির্দেশে

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মসজিদে বোমা হামলা শীর্ষ জঙ্গিদের নির্দেশে

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি বানৌজা ঈসা খানের ভেতরে বানৌজা পতেঙ্গা মসজিদে জুমার নামাজের সময় বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ২৪ জন মুসল্লি আহত হন।

আহতদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বেসামরিক লোকজনও ছিল। ওই ঘটনার প্রায় আট মাস পর সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানায় মামলা হয়েছে। ওই দিন ঘটনাস্থল থেকেই আবদুল মান্নান (২০) ও মো. রাজমান আলী রাজু (২৩) নামের দুজন আটক হয়েছিল। তারা দুজনই সনদ ও তথ্য গোপন করে নৌবাহিনীতে চাকরি নিতে সক্ষম হয়েছিল। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে। তারা জেএমবির শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশেই এ ঘটনা ঘটায় বলেও জানায়।

নৌঘাঁটিতে সেদিন যা ঘটেছিল : গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর নৌবাহিনীর ঘাঁটির দুটি মসজিদে বোমা হামলা চালিয়েছিল নৌবাহিনীর দুজন সদস্য। ওই দিন হামলার পরপরই আবদুল মান্নান ও রমজান আলী নামের দুজন সদস্যকে আটক করা হয়, যারা নৌবাহিনীর বেসামরিক কর্মচারী পদে ২০১২-১৩ সালে নিয়োগ পেয়েছিল।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ১৮ ডিসেম্বর ঘটনার দিন মান্নান ও রমজানকে আটক করার পর নৌবাহিনী তাদের নজরদারিতে রাখে এবং বিভাগীয় অনুসন্ধান চালায়। নৌবাহিনীর অনুসন্ধানকালে ওই দুজন তাদের দোষ স্বীকার করে ঘটনার বিষয়ে তথ্য দেয়।

ঘটনার প্রায় সাড়ে আট মাস পর গত ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানায় একটি মামলা দায়ের করেন চট্টগ্রাম নেভাল প্রভোস্ট মার্শাল কমান্ডার এম আবু সাঈদ। ঘটনার এত দিন পর মামলা দায়ের করার ব্যাখ্যা দিয়েছেন মামলার বাদী এম আবু সাঈদ। তিনি এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ‘ঘটনার ধরন, ব্যাপকতা এবং ঘটনার টার্গেট নৌবাহিনীতে কর্মরত সামরিক/বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ ছিল বিধায় ব্যাপকভাবে বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। আসামিদের নজরদারিতে রেখে নৌবাহিনীর বিধি মোতাবেক ব্যাপক অনুসন্ধানের পর তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এর পরই তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজুকরণের নিমিত্তে অত্র এজাহার দায়ের করতে বিলম্ব হলো। ’ মামলার তদন্তভার ইপিজেড থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল কালাম নিজেই গ্রহণ করেন।

মামলার এজাহার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে আবদুল মান্নান মসজিদে মুসল্লিদের ওপর দুটি বোমা (গ্রেনেড) নিক্ষেপ করে। এ সময় একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়ে ঘটনাস্থলে অগ্নিগোলকের সৃষ্টি হয়। অন্য বোমাটি অবিস্ফোরিত থাকে। বোমা হামলার পর ভীতসন্ত্রস্ত মুসল্লিরা ছোটাছুটি শুরু করলে হামলাকারী নিজেও মুসল্লিদের সঙ্গে মিশে আত্মগোপনের চেষ্টা চালায়। পরে তাকে হাসপাতাল থেকে শনাক্ত করেন মুসল্লিরা।

হাসপাতালে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই মান্নান তার সহযোগী হিসেবে রমজান নামের একজনের নাম বলে। ওই দিন জুমার নামাজের সময় বানৌজার অন্য একটি মসজিদেও বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। নৌবাহিনী তল্লাশি চালিয়ে রমজান আলীকেও গ্রেপ্তার করে।

আটককৃত মান্নানের জ্যাকেট খুললে তার বুকে বোমাসহ সুইসাইডাল ভেস্ট ও হাতের কবজির কাছে সুইচ পাওয়া যায়। পরে বানৌজার ঈসা খানের এসএম-২ ব্যারাকের নিচতলায় একটি টয়লেট থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় অবিস্ফোরিত বোমাসহ আরো একটি সুইসাইডাল ভেস্ট উদ্ধার করা হয়।

আবদুল মান্নান ও রমজান আলীর উদ্ধৃতি দিয়ে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, জেএমবির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিকল্পনা অনুসারে সংগঠনের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান সমন্বয়ক মো. রাইসুল ইসলাম খান নোমান ওরফে ফারদিন নৌবাহিনীর অভ্যন্তরে নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনা করে। আর এর জন্য আবদুল মান্নান ও রমজান আলীকে উদ্বুদ্ধ করে। নোমান ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার জোড়বাড়িয়া গ্রামের মো. নূরুল ইসলাম খানের ছেলে। মান্নান ও রমজান ছাড়াও সাতক্ষীরা জেলার তালা থানার বারইয়াটি গ্রামের আব্দুল গাফফার সরদারের ছেলে মো. বাবুল রহমান বাবু ওরফে কালাম ওরফে রনিসহ (২০) তিনজন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

২০১২-১৩ সালে আব্দুল মান্নান, রমজান আলী ও বাবুলের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ গোপন করে অস্থায়ী বেসামরিক কর্মচারী (ক্যান্টিন বয়/ব্যাটম্যান/বলপিকার) হিসেবে নৌবাহিনীর অভ্যন্তরে কাপ্তাইয়ের বানৌজা শহীদ মোয়াজ্জম ঘাঁটিতে প্রথম অনুপ্রবেশ করে জেএমবি। সেই অর্থে চার বছর আগে থেকেই জেএমবি নৌবাহিনীতে জঙ্গি অনুপ্রবেশ ঘটায়। এই সময়ের মধ্যে আরো কোনো জঙ্গির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল কি না সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রামে ফারদিনের সঙ্গে যোগাযোগ মান্নান ও রমজান চট্টগ্রামের বানৌজা ঈসা খানে আসার পর জেএমবি চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়ক রাইসুল ইসলাম খান ওরফে ফারদিনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ শুরু করে। ফারদিনের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ রাখত তারা। এ ছাড়া বন্দরটিলা, ইপিজেড ও নাসিরাবাদ ২ নম্বর গেট এলাকায় দেখা করে বিভিন্ন নির্দেশনা গ্রহণ করত।

হামলার পরিকল্পনা ও স্থান নির্বাচন ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাইসুল ইসলাম খান ওরফে ফারদিন নৌবাহিনীর অভ্যন্তরে হামলার পরিকল্পনার কথা মান্নান ও রমজানকে জানায়। এরপর নৌবাহিনীর বেশিসংখ্যক সদস্য সমাগম হয় এমন স্থান নির্বাচনের দায়িত্ব দেয় মান্নান ও রমজানকে। পরবর্তী সময়ে মান্নান ও রমজান ফারদিনকে জানায়, বেশিসংখ্যক নৌবাহিনীর সদস্য সমাগম হয় মসজিদে। শেষে শুক্রবার জুমার নামাজে হামলার জন্য স্থান নির্বাচন করে জঙ্গিরা।

বোমা সরবরাহ  হামলার আগের দিন ১৭ ডিসেম্বর দুপুরে জঙ্গি নেতা ফারদিন অন্য জঙ্গি মান্নান ও রমজানকে ব্যাগে রক্ষিত বোমাসহ সরঞ্জাম হস্তান্তর করে। এসব বিস্ফোরক সরঞ্জাম নিয়ে মান্নান ও রমজান আলী নিজেদের পরিচয়পত্র গেটে দেখিয়ে বানৌজা ঈসা খানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পরে সেগুলো নিজেদের কক্ষে নিয়ে রেখে দেয়। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর জুমার নামাজের সময় মান্নান ও রমজান মসজিদে গিয়ে বোমা নিক্ষেপ করে।

র‌্যাব থেকে পালিয়েছে সাখাওয়াত নৌবাহিনীর সদস্য এম সাখাওয়াত হোসেন এলএস (পিটি-২) গত ডিসেম্বর মাসে ঘটনার সময় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে প্রেষণে কর্মরত ছিল। কিন্তু ঘটনার পরপরই সাখাওয়াত র‌্যাব থেকে পালিয়ে যায়।

জঙ্গিদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ গত ৩ সেপ্টেম্বর মামলা দায়েরের পরদিন দুই জঙ্গিকে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে সোপর্দ করা হয়। ৫ সেপ্টেম্বর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম হারুন অর রশিদ। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর তাদের আবার আদালতে সোপর্দ করে আবারও রিমান্ড আবেদন জানায় পুলিশ। ওই দিন মহানগর হাকিম আবদুল কাদের আরো এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দুই দফা চার দিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ আরো তথ্য পাওয়ার আশায় আবার আদালতে রিমান্ড আবেদন জানায়। সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর দুই জঙ্গিকে তৃতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরো দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু ছালেম মো. নোমান। জিজ্ঞাসাবাদে দুজনই তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে। তারা এ বাহিনীতে কিভাবে এলো এবং কাদের প্ররোচনায় জঙ্গিবাদে দীক্ষা নিল তাও জানিয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ইপিজেড থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, জঙ্গিদের তিন দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়। এর মধ্যে দুই দফায় চার দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সর্বশেষ দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। দু-এক দিনের মধ্যে তাদের তৃতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।


মন্তব্য