kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সখীপুরে আইসিটি আইনে সাজা

নির্যাতনের বর্ণনা দিল শিক্ষার্থী ইউএনও-ওসির অস্বীকার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নির্যাতনের বর্ণনা দিল শিক্ষার্থী ইউএনও-ওসির অস্বীকার

হাইকোর্টে হাজির হয়ে নির্যাতনের বর্ণনা দিল টাঙ্গাইলের সখীপুরের সেই শিক্ষার্থী, যাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে দুই বছরের সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এই আইনে তাকে সাজা দেওয়া হয়নি এবং নির্যাতনও করা হয়নি বলে দাবি করেছেন আদালতের বিচারক ও স্থানীয় থানার ওসি।

এই শিক্ষার্থীকে কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে আগামী ১৮ অক্টোবর আদেশের দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদেশের এই দিন ধার্য করেন। এ সময়ের মধ্যে ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’-এর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে তাঁর প্রতিবেদনের সপক্ষে প্রমাণ আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের সংসদ সদস্য অনুপম শাজাহান জয়কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্কুল ছাত্র সাব্বির শিকদার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে কারাদণ্ড দেন।

এ নিয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর ডেইলি স্টার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর তা উচ্চ আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান। এরপর আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দেন। আদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং একই থানার ওসি মোহাম্মদ মাকসুদুল আলমকে তলব করা হয়। তাঁদের গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় সশরীরে হাইকোর্টে হাজির হতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত স্কুল ছাত্রকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই ছাত্রকেও আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছিল। এ নির্দেশে দুই পক্ষই গতকাল আদালতে সশরীরে হাজির হয়।

সাজাপ্রাপ্ত সাব্বির শিকদার সখীপুর উপজেলার প্রতীমা পাবলিক হাই স্কুলের ছাত্র। তাকে সাজা দেওয়ার আদেশের নথিপত্র, মাদকের মামলার কাগজপত্র, সংসদ সদস্যের করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি), শিক্ষার্থীর বয়স প্রমাণের জন্য তার পাসপোর্টের কপি এবং ওই দুই কর্মকর্তার লিখিত ব্যাখ্যা গতকাল আদালতে দাখিল করা হয়। তাঁদের পক্ষে অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন ও অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম এসব দাখিল করেন এবং আদালতের শুনানিতে অংশ নেন। আর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান।

আদালতের নির্ধারিত কার্যক্রম শুরুর পর এ মামলা উত্থাপিত হয়। সে সময় আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকেন ইউএনও ও ওসি। এরপর ওসির আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন শুনানি শুরু করেন। তিনি বলেন, পত্রিকায় যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তা সঠিক নয়। পত্রিকায় বলা হয়েছে যে আইসিটি আইনে সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। গাঁজা পাওয়ায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ কথা পত্রিকায় লেখা হয়নি। সংসদ সদস্যকে হেয় করার জন্যই এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সঠিক নথিপত্র না দেখেই প্রতিবেদন লেখা হয়েছে। আদালতকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।

এরপর নুরুল ইসলাম সুজন থানায় করা সংসদ সদস্যের জিডি পাঠ করেন। তিনি বলেন, অভিযোগ গুরুতর। এই ছেলের আইডি থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তখন আদালত বলেন, ‘নথিপত্র দেখে প্রশ্ন জাগছে, মোবাইল কোর্ট কম্পিউটার নিয়ে দৌড়ায় কি না। ’ এ পর্যায়ে ইউএনওর আইনজীবী অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘না, তা নয়। একটি নির্ধারিত ছক থাকে। তাই এ রকম মনে হতে পারে। ’ এ সময় আদালত বলেন, ‘পুলিশ কনস্টেবল দেলোয়ার কিভাবে ঘটনাস্থলে কম্পিউটার নিয়ে গেলেন এবং অভিযোগ টাইপ করা হলো, তা দেখতে হবে। ’

শ ম রেজাউল করিম আরো বলেন, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে সাব্বিরকে আটক করা হয়। তার কাছে গাঁজা পাওয়া যায়। সংসদ সদস্যের জিডির সঙ্গে এ ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, পত্রিকার প্রতিবেদনে স্কুল শিক্ষার্থীকে নাবালক বলা হয়েছে। এ কথা সত্য নয়। এ সময় তিনি সাব্বিরের পাসপোর্টের কপি দেখিয়ে বলেন, ওই শিক্ষার্থীর পাসপোর্টেই জন্মতারিখ লেখা রয়েছে ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫।

এ সময় ওসির আইনজীবী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার জন্য যারা ধরা পড়েছে তাদের বয়স কত তা দেখুন। যারা অসত্য প্রতিবেদন করেছে তাদের আদালতে ডাকুন। ’

এরপর আদালত শিক্ষার্থী সাব্বির শিকদারকে ডাকেন। সাব্বির সামনের দিকে গেলে আদালত জানতে চান যে তার সঙ্গে কী করা হয়েছে। জবাবে সাব্বির বলে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাত ৯টার সময় সে বাড়িতে ছিল। এমন সময় বাইরে থেকে কেউ তাকে ডাক দেয়, ‘সাব্বির, বাড়িতে আছো। ’ সে তখন বাইরে এসে দেখে সাদা পোশাকে একজন এবং পোশাকধারী আরেকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। দুজনই তাকে বলেন, ‘তোমাকে থানায় যেতে হবে। ’ এরপর তাকে থানার ওসির কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। ওসি তাকে মোবাইল ফোন দেখিয়ে বলেন, ‘এগুলো কী লিখছোস। ’ সে বলেছে যে, এগুলো সে লিখেনি।

সাব্বির আদালতকে বলে, “এরপর আমাকে এমপির বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। আমি এমপির বাসায় গিয়ে দেখি তিনি সোফায় বসে আছেন। আমাকে তাঁর সামনে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি আমাকে বলেন, ‘তুই আমার বিরুদ্ধে কী লিখছোস?’ এরপর এমপি আমাকে দুইটি বাড়ি মারেন। ” এরপর সংসদ সদস্য তাকে থানায় নিয়ে যেতে বলেন। ওসি তাকে থানায় নিয়ে চোখ বেঁধে বেদম নির্যাতন করেন এবং ক্রসফায়ারে দেওয়ার ভয় দেখান। এই ভয়ে ও নির্যাতনে সে অভিযোগ স্বীকার করে নেয় বলে সাব্বির আদালতকে জানায়।

সাব্বির আরো জানায়, এ ঘটনার পরদিন তাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন ওই কর্মকর্তা তাকে বুকে লাথি মেরে ফেলে দেন। তখন তার হুঁশ ছিল না। কে যেন তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যায়। থানায় নেওয়ার পর ওসি তাকে বলে, ‘তোমাকে দুই বছরের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। ’

ঘটনাটি আদালতে নজরে আনা আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘আমি কারো বিপক্ষে বা পক্ষে নই। একজন আইনজীবী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছি। ’


মন্তব্য