kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভাঙারি সোহেল অধরা হয়নি সেই অস্ত্র

এস এম আজাদ   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভাঙারি সোহেল অধরা  হয়নি সেই অস্ত্র

বছর ঘুরে এলেও ইতালির নাগরিক সিজারে তাভেল্লা হত্যা মামলার কিনারা হয়নি এখনো। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

সেই অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে যে ভাঙারি সোহেলের নাম এসেছে, তাকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি।

তদন্ত শেষে পুলিশ গত ২৮ জুন আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দিয়েছে। তাতে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর এম এ কাইয়ুমকে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী উল্লেখ করা হয়েছে। চার্জশিটে আসামি করা হয়েছে সাতজনকে। তবে ঘটনার পর থেকে কাইয়ুম পলাতক। মামলার অভিযোগ গঠন করে সোহেল ও কাইয়ুমকে গ্রেপ্তারে সম্প্রতি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

তবে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের স্বজন ও বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন, এ মামলায় অভিযুক্ত সবাই বিএনপির নেতাকর্মী। তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। গুলশানে তাভেল্লা হত্যার পাঁচ দিন পর রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি খুনের ঘটনায়ও বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীকে ফাঁসানো হয়। অথচ পরে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্যরা ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয় এবং দায় স্বীকার করে।

পুলিশ তাভেল্লা খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করছে। তবে এখনো হত্যাকাণ্ডের প্রধান আলামত সেই অস্ত্রটি উদ্ধার না হওয়ায় এবং বিএনপির পক্ষ থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ফাঁসানোর অভিযোগ ওঠায় ধোঁয়াশা পুরোটা কাটেনি। এমন অবস্থায় আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ বুধবার।

গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরের ৯০ নম্বর সড়কে তাভেল্লাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তাভেল্লা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এনজিও ইন্টারচার্চ কো-অর্ডিনেশন কমিশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন করপোরেশনের (আইসিসিও) প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি (প্রুফ) কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। ঘটনার পরদিন সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি হেলেন সাফ ভ্যান ডাক বিক বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। এরপর ৩ অক্টোবর সকালে রংপুরে খুন হন জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি। পর পর দুই বিদেশি হত্যার ঘটনা দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। বাংলাদেশে বিদেশি দূতাবাসগুলো নিজ নিজ নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কতাও জারি করেছিল সে সময়।

তাভেল্লা খুনের প্রায় এক মাস পর চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করে। সে সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছিলেন, এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে বিদেশি একজন শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করে আসামিরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। ’

শুরুতে গ্রেপ্তার চার আসামি হলো—রাসেল চৌধুরী ওরফে চাক্কী রাসেল ওরফে বিদ্যুৎ রাসেল, মিনহাজুল আরিফিন রাসেল ওরফে ভাগ্নে রাসেল ওরফে কালা রাসেল, তামজিদ আহম্মেদ রুবেল ওরফে শ্যুটার রুবেল ও শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরিফ। তারা রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বিএনপির কর্মী বলে জানা গেছে। হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) পর চার আসামিই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় কাইয়ুমের ভাই মতিনকে। গত ২৮ জুন এম এ কাইয়ুমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক গোলাম রাব্বানী।

চার্জশিটে বলা হয়, হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল একজন শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করে দেশে-বিদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এ পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনামতে ভাঙারি সোহেলের কাছ থেকে পিস্তল ভাড়া নিয়ে খুনিরা তাভেল্লাকে হত্যা করে। কমিশনার কাইয়ুমের ভাই আবদুল মতিনের নির্দেশে ২৮ সেপ্টেম্বর (২০১৫) শাখাওয়াতের মোটরসাইকেল নিয়ে মিনহাজুল, তামজিদ ও রাসেল চৌধুরী গুলশান-২-এর ৯০ নম্বর সড়কে যায়। ওই সড়কের গভর্নর হাউসের সীমানা প্রাচীরের বাইরে ফুটপাতে নিরিবিলি ও অন্ধকার স্থানে তামজিদ গুলি করে তাভেল্লাকে হত্যা করে। তাকে সহায়তা করে রাসেল চৌধুরী ও মিনহাজুল। মোটরসাইকেলের চালক ছিল মিনহাজুল। বিএনপি নেতা এম এ কাইয়ুমের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে তাভেলা সিজারকে হত্যা করা হয়। কাইয়ুম পরিকল্পনা করলেও তা বাস্তবায়ন করে তাঁর ছোট ভাই আবদুল মতিন। মামলার আলামত হিসেবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়। সোহেল গ্রেপ্তার না হওয়ায় ব্যবহৃত পিস্তলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়। সেই ফুটেজ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিবির উপকমিশনার (ডিসি উত্তর) শেখ নাজমুল আলম গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ মামলায় চার্জ গঠন করে দুই আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। পরোয়ানা স্থানীয় থানায় গেছে। আমরা তদন্তকাজ শেষ করেছি। সোহেলকে ধরতে পারিনি। ইতিমধ্যে দুটি অস্ত্র উদ্ধার করে পরীক্ষা করা হয়েছে,  তবে সেগুলো ওই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়নি। ’

জানা গেছে, কাইয়ুম ও সোহেলের বাসা রাজধানীর বাড্ডা থানা এলাকায়। ওই থানার ওসি আবদুল জলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাইয়ুম কমিশনারের পরোয়ানা তাঁর স্থায়ী ঠিকানা নরসিংদীতে গেছে বলে জানি। আর সোহেল এখানে ভাসমান ছিল। তার কোনো ঠিকানা নেই। সেই পরোয়ানা কোথায় গেছে তাও আমার জানা নেই। ’

এ মামলায় গ্রেপ্তার রাসেল চৌধুরী দক্ষিণ বাড্ডার ব-৮৯ বাসার বাসিন্দা শাহজাহান চৌধুরীর ছেলে। রাসেলের মা আফরোজা আক্তার আভা দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে তাভেল্লা খুনে জড়িত না। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। ’

বিএনপি কর্মী তামজিদ আহম্মেদ ওরফে রুবেল মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় মামা তৌহিদ মিয়ার বাসায় থাকত। তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের বাগলি এলাকায়।   রুবেলের মামা তৌহিদ মিয়া বলেন, ‘আমার ভাগ্নে কোনো খারাপ কাজে জড়িত, তা আগে শুনিনি। ’


মন্তব্য