kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

তরুণ কবির চোখে

তারে কই বড় বাজিকর

জুয়েল মোস্তাফিজ   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তারে কই বড় বাজিকর

১৯৮৭ সালে স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হক। ছবি : সংগৃহীত

‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর। ’ হাতের তালুতে ছিল একটা কাঁচা পেয়ারা।

আর পেয়ারার গায়ে চলছিল নখের আঁচড়। সামনাসামনি কম্পন চলছিল দুই হৃদয়ে। মাঝখানে পেয়ারার নখে কাটা গায়ে ঝরছিল রস। প্রেম কি মৃত্যুর মতো মহৎ? জীবন তাহলে কে? পাশাপাশি দাঁড় করালে কবিতা আর জীবন যমজ ভাইবোন। আমাদের চুলগুলো তখনো উড়তে শেখেনি। আমাদের কাঁচা পেয়ারার হৃদয় তখনো মজবুত হতে পারেনি। আমরা বেশি কথা বলতাম। যেখানে ঠাঁই, সেখানেই অন্তরকে মোমের মতো আগুন দিয়ে গলিয়ে দিতাম। ‘হ্যাঁ’কে ‘না’ করতে বড়জোর একটা তুড়ি। ‘না’কে ‘হ্যাঁ’ করতে ছুরির দরকার ছিল না। সেই কাজ সারত আমাদের ধারালো জিহ্বা। আমরা একদল তরুণ কবিতাকর্মী। আমাদের জন্ম বড়জোর ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে।

২০০২ থেকে ২০০৯ সাল। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট। পাঠক সমাবেশের সামনে কিংবা দোতলায় লিটলম্যাগ কর্নার ‘লোক’কে ঘিরে তুমুল আড্ডা। কথায় কথায় আসত শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক। কেউ ‘সোনালী কাবিন’, কেউ বা ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, আবার পরান ফাটিয়ে কেউ কেউ চেঁচিয়ে উঠত—আরে না, ‘পরানের গহীন ভিতর’। এমন শব্দ, অন্তর হয়ে মগজ, মগজ হয়ে অন্তরে ওঠানামা করেছে। একদিন আমাদের অগ্রজ কবি শামীম রেজা একটি বই হাতে দিলেন। ছোট আকৃতির বই। নাম ‘পরানের গহীন ভিতর’। বইটি হাতে নিতে বন্ধুরা কেউ কেউ বলল—পড়েছি, আহা, সেই রুমাল, সেই পরান। কেউ কেউ পড়েনি বলেই, বইটি নিয়ে টানাটানি। আমি ছিলাম না পড়ার দলে। বইটি হাতে নিয়ে কাঁচা পেয়ারার মতো নখে আঁচড় কাটতে শুরু করি। যেন অসংখ্য হৃদয়যুগল সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে। কয়েক দিন ধরে মনে হয়েছিল বইটির কোনো কোনো কবিতা জীবনের চেয়েও উঁচু।

সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরানের গহীন ভিতর’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০ সালে। বলা চলে আমাদের একটু আগে-পরে জন্মবছর। শুধু ‘পরানের গহীন ভিতর’ নয়, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হকের অংসখ্য রচনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জে কলেজে পড়ার সময় ‘খেলারাম খেলে যা’ বড়জনের মুখে মুখে শুনেছি। পড়ার আবদার করলে বড়জনরা বলেছেন, ‘আরো একটু বড় হও। আগে কেমিস্ট্রিতে পাস করো। ’ কাঁচা মগজ এই উপদেশ লঙ্ঘন করতে চাইত। বারবার মনে হতো কী আছে তার ভেতর, কী আছে তার বাইরে। রোজ বিকেলে জেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশতাম। সেখানে আমাদের প্রিয় স্যার প্রফেসর এনামুল হক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নূরলদীনের সারা জীবন’-এর কথা বলতেন। অনেক পরে জেনেছি বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা।

ঢাকায় আমরা তরুণ কবিতাকর্মীরা তখন কবিতার নেশায় বুঁদ। কবিতার প্রতি জেদ। কবিতার রাতে ঘুম আসে। কবিতা না এলে জেগে থাকি দিনরাত। লিটলম্যাগ কিংবা কাগজে কবিতা ছাপা হলে আমাদের পায় কে? কিন্তু আমরা যখন আমাদের খুঁজে পেলাম। মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখলাম। নাহ! কবিতা তো এমন নয়, কবিতা অন্য রকম। অন্য রকম মানে কেমন? কবিতার হাটে অন্তরের কাঁচা পেয়ারা দেখেছি। দেখেছি ‘পরানের গহীন ভিতর’-এ কবিতার বাস। একটু স্পেসিফিক করে যদি বলি—একুশ শতকের শুরুর তরুণ কবিদের কাছে সৈয়দ শামসুল হক কেমন ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে বলতে চাই, তাঁর কবিতা জীবনের চাইতে উঁচু।

একবার আজিজ মার্কেটে। ২০০৫ সালের কথা। একদল কবিতাকর্মীর আড্ডা। সফেদ ফরাজী, মামুন খান, মৃদুল মাহবুব, মাহমুদ শাওন, আপন মাহমুদ, বিজয় আহমেদ, রুদ্র আরিফ, আমজাদ সুজন, মাসুদ হাসান, ফেরদৌস মাহমুদসহ আরো অনেকে। ওই সময়ে আমাদের লেখা দেখা অনুধাবনে কাব্যগ্রন্থ ‘পরানের গহীন ভিতর’ ছিল কবিতার পতাকার মতো। আমাদের আড্ডার অগ্রজ কবি মাসুদ খান, শামীম রেজা, মজনু শাহ, মাহবুব কবির, আলফ্রেড খোকন, পাবলো শাহি, কুমার চক্রবর্তী, কামরুজ্জামান কামু পাঠের পথ দেখাতেন। সেই পথে হেঁটে সৈয়দ হকের নানা রচনা আমরা পড়েছি। আন্দোলিত হয়েছি। বিশেষ করে তাঁর কবিতা। পঙিক্তর পর পঙিক্ত আমাদের উঠতি তরুণের পথকে আরো প্রসারিত করেছে।

ব্যক্তিগতভাবে বহুবার তাঁকে সামনে থেকে দেখেছি। লেখার সৈয়দ হক আর সামনাসামনি সৈয়দ হকের ব্যবধান অনেক ঠেকেছে। দেশবরেণ্য সব্যসাচী লেখকের সামনে গিয়ে নিজের সিনাটা চওড়া হয়েছে। একবার কবি শামীম রেজার সঙ্গে গুলশানের বাসায় গিয়েছিলাম। আমরা নিচে বসা। ডুপ্লেক্স বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে নামছিলেন তিনি। প্রথম দৃশ্যটি চোখে এসে যখন লাগল—তখন ঘাড়ে থাকা একটি কাশ্মীরি সাদা চাদর এপাশ-ওপাশ করলেন। নেমেই বললেন, ‘শামীম এসেছ? পাশের ছেলেটা কে?’ শামীম ভাই বললেন, ‘ওর নাম জুয়েল, কবিতা লেখে। ’ বললেন, ‘বাহ! শামীম, তোমার চারপাশে কবি আর কবি। ’ এ কথা শেষ হতে না হতে আমরা একটা ফুলের তোড়া এগিয়ে বললাম, ‘শুভ জন্মদিন। ’ তিনি শামীম ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘আর কত, এই আছি। জানো শামীম, আমি আজ কিছু ফোন পেয়েছি। ওদের আমি চিনি না। সব ফোন মফস্বল থেকে এসেছে। ওরা আমাকে এত ভালোবাসে? এত ভালোবাসে। সবাই জন্মদিনটা মনে রেখেছে। ’ শামীম ভাই বললেন, ‘হক ভাই, আপনাকে লাখো মানুষ মনে রাখে। ’ তিনি এর উত্তরে বললেন, ‘শামীম, আজ যে ফোনগুলোর কথা তোমাকে বলছি, সেগুলো বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে জন্ম তারিখ দেখে ওরা ফোন করেছে। এটা আমার খুব ভালো লেগেছে। ’

সৈয়দ শামসুল হক ও শামীম ভাইয়ের কথার ফাঁকে একটু সুযোগ খুঁজছিলাম। কবিকে প্রশ্ন করেছিলাম, “আপনার ‘পরানের গহীন ভিতর’ কত শত রুমাল আছে?” তিনি হো হো করে হাসলেন। বাঁ কাঁধে জড়িয়ে ধরলেন। কবিকে বলেছিলাম, ‘আমি আজ বড় এক বাজিকর দেখলাম। ’ সেদিন ছিল কবির জন্মদিন। বহু বহুকাল আগেও ছিল কবির জন্মদিন। আজও কবির জন্মদিন। গতকাল কিংবা আগামীকালও কবির জন্মদিন। পরানের ভেতর রুমাল নাড়ছে প্রিয় কবি। প্রেম মৃত্যু কি প্রেমের চাইতেও মহৎ?


মন্তব্য