kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শুভ জন্মদিন

সত্তরে পা দিলেন শেখ হাসিনা

তৈমুর ফারুক তুষার   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সত্তরে পা দিলেন শেখ হাসিনা

রূপকথাকেও হার মানায় তাঁর জীবনগাথা। গল্পের দুঃখিনী রাজকন্যার দুঃখকষ্ট, রোমাঞ্চকর নানা ঘটনাও যেন ম্লান তাঁর জীবনকাহিনীর কাছে।

তাঁর মা-বাবা, ভাইসহ নিকটাত্মীয়দের একই দিনে হত্যা করা হয়। নিজেও হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন ১৯ বার। খুব কাছ থেকে প্রিয় সহকর্মীদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন। অবৈধ শাসকের বিরোধিতা করতে গিয়ে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার এক নিভৃত পল্লী থেকে উঠে এসে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করেছিলেন পরাধীনতা থেকে, বাঙালিকে এনে দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশ। অথচ পিতার মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় সেই দেশে তিনি ফিরতে পারেননি। তাঁকে প্রতিবেশী একটি দেশে আশ্রিত জীবন যাপন করতে হয়েছে। এমন অসংখ্য ঘটনার অভিজ্ঞতায় পূর্ণ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৬৯ বছরের জীবন। তবে এসব কোনো কিছুই তাঁর পথচলাকে রুদ্ধ করতে পারেনি। দেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন দৃঢ়তার সঙ্গে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন আজ ২৮ সেপ্টেম্বর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিবের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। সেখানেই তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। তিনি ১৯৫৪ সালের পর ঢাকায় টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে (শেরে বাংলা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ভর্তি হন। শেখ হাসিনা ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন। ওই কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। কলেজ জীবন শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৬৮ সালে পরমাণুবিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে বিয়ে করেন শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী একদল সেনাসদস্য যখন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে তখন শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা জার্মানিতে ছিলেন ড. ওয়াজেদ মিয়ার বাসায়।

মা-বাবা, ভাইসহ নিকটাত্মীয়দের হারানোর পরের পথটা মোটেও সরল ছিল না শেখ হাসিনার। সে সময় তাঁকে দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন দেশ ঘুরে ভারতে আশ্রয় নেন তিনি। দেশের স্থপতির সন্তান শেখ হাসিনা সে সময় অর্থাভাবে যুক্তরাজ্যে নিজের একমাত্র ছোট বোনের বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। ছয় বছর ভারতে থাকার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফেরার আগেই আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তাঁকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ৩৪ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ দলের সভাপতির দায়িত্ব নেন। সে সময় প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ, পুরুষশাসিত সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তাঁকে বহু প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করতে হয়েছে। নিজ দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাও খুশি ছিলেন না কম বয়সী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে। দলের ভেতরে-বাইরে সব প্রতিবন্ধকতা তিনি কাটিয়ে উঠেছেন বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে।

১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। মেয়াদ শেষে নতুন নির্বাচনে তাঁর দল পরাজিত হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। মূলত এর পরই শুরু হয় শেখ হাসিনার লক্ষ্য পূরণের এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপনের আগেই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এরই মধ্যে সেই লক্ষ্য পূরণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। এ উন্নয়ন গোটা বিশ্বকেই অবাক করে দিয়েছে। এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা। সে লক্ষ্য পূরণ করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও আলোচনায় নিজের এ লক্ষ্যের কথা বারবার বলে থাকেন তিনি।

শেখ হাসিনার আরেকটি অবিশ্বাস্য অর্জন হলো মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার। স্বাধীনতার পর প্রায় ৪০ বছর এ দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, এ দেশে ওই অপরাধীদের বিচার সম্ভব নয়। শেখ হাসিনা মানুষের সেই ধারণা ও সন্দেহ দূর করে দিয়েছেন। বিপুল প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করে চলেছে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার। এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ শেখ হাসিনাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেও তিনি ছিলেন অবিচল। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সব ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল নসাৎ করে দিয়ে শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেছেন। এটি ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

শেখ হাসিনার সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধে বিজয় লাভ এবং ছিটমহল সমস্যার সমাধান। ছিটমহল বিনিময়ের ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মানচিত্র পরিবর্তন করতে হয়েছে।

১৯ বার হত্যাচেষ্টা : ১৯৮১ সালে জাতীয় রাজনীতিতে যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয় শেখ হাসিনাকে। তিনি প্রথম হামলার শিকার হন স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। ওই দিন চট্টগ্রামে আটদলীয় জোটের মিছিলে থাকা অবস্থায় গুলিবর্ষণ করে পুলিশ ও বিডিআর। এতে সাতজন নিহত ও অর্ধশতাধিক লোক গুরুতর আহত হয়। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ও গ্রেনেড ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচনে ভোট প্রদানের পর গ্রিন রোডে পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে ভোটের পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি গাড়ি থেকে নামার পরপরই গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা চালানো হয়। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদীতে গুলি ছোড়া হয় তাঁকে বহনকারী রেলগাড়ি লক্ষ্য করে। ১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শেখ রাসেল স্কায়ারে সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলের কাছে ও হ্যালিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। সমাবেশের আগেই তা নজরে পড়ে এক চা বিক্রেতার। ২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। জঙ্গিরা সেখানে বোমা পুঁতে রাখে, যা উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে শেখ হাসিনার জনসভা স্থল থেকে ৫০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই দুইজন মারা যায় এবং অনেকে আহত হয়।

শেখ হাসিনাকে হত্যা করার লক্ষ্যে সবচেয়ে বর্বরোচিত হামলাটি হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ওই দিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা ও গুলি চালানো হয়। দলের নেতাকর্মীরা সেদিন মানবঢাল তৈরি করে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করলেও মারা যান ১৯ জন। পঙ্গুত্ব বরণ করে অসংখ্য নেতাকর্মী। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি : তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। তিনি এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২৯টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ’ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘের ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’ লাভ করেন। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনের জন্য একই বছর শেখ হাসিনা ওম্যান ইন পার্লামেন্ট (ডাব্লিউআইপি) গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। নারী ও শিশু শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে ২০১৪ সালে ‘শান্তিবৃক্ষ পদক’ পুরস্কারে ভূষিত করে ইউনেসকো। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন পদক পান শেখ হাসিনা। এ ছাড়া নানা সময়ে শেখ হাসিনাকে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন পদক ও পুরস্কার দেওয়া হয়।

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন পালনের সব কর্মসূচি স্থগিত করেছে।


মন্তব্য