kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাকিস্তানকে এবার পানিতে মারতে চায় ভারত!

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পাকিস্তানকে এবার পানিতে মারতে চায় ভারত!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল সোমবার ১৯৬০ সালের ভারত-পাকিস্তান পানিচুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক করেছেন। মোদি বৈঠকে বলেছেন, ‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে বইতে পারে না।

’ বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তনদীর পানি নিয়ে ‘কৌশলগত আক্রমণে’ যাচ্ছে ভারত। ফলে ভারত থেকে পাকিস্তানে প্রবাহিত ছয়টি নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হতে পারে। বৈঠকে মোদি চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে চুক্তি অক্ষুণ্ন রেখেই পাকিস্তানকে ‘পানিতে মারার’ কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সম্প্রতি কাশ্মীরের উরি সীমান্তে জঙ্গিদের হামলায় ভারতের ১৮ সেনা নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই ‘কৌশলগত আক্রমণের’ কথা ভাবছে ভারত। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদকে ওই হামলার জন্য দায়ী করা হয়। উরি হামলার ঘটনার প্রতিশোধ নিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুরু থেকেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের কূটনীতিকরা মনে করেন, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং বিশ্ব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই ভারত পাকিস্তানে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালাবে না। এ ছাড়া কাশ্মীর ইস্যুতে চীন পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে—পাকিস্তানের এমন দাবি আবারও চীনের তরফ থেকে নাকচ করা হয়েছে।

গতকাল নয়াদিল্লিতে ১৯৬০ সালের পানিচুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এতে ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর, পানিসম্পদক বিষয়ক সচিব শশি শেখরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের পর পানিচুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে চুক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এ সময় মোদি পাকিস্তানের সঙ্গে ওই

চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তবে চুক্তি অক্ষুণ্ন রেখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পানি নিয়ে কৌশলগত কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে তাও তুলে ধরা হয়। বৈঠকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পানি ইস্যুতে ৯টি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিকল্পগুলো হলো :

১. ১৯৬০ সালের চুক্তির পর ভারত কখনোই এর পূর্ণ সুবিধা গ্রহণ করেনি। এখন চুক্তির প্রতিশ্রুতি অক্ষুণ্ন রেখে এর পুরো সুবিধা নিতে ভারত একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে।

২. ভারত বর্তমানে ঝিলম, চেনাব ও সিন্ধু নদীর পানির প্রাপ্য অংশ ব্যবহার করেনি। এ ক্ষেত্রে ভারত পানিপ্রবাহ না আটকে তিনটি নদীর ওপর বাঁধ তৈরি করতে পারে।

৩. এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট বাঁধ কার্যকর হতে পারে, যা জম্মু ও কাশ্মীরে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচে কাজে লাগবে।

৪. চুক্তি অনুযায়ী ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের ১০৩ কোটি ৪০ লাখ একর জমিতে সেচ সুবিধা দিতে পারে। ভারত এখন পর্যন্ত সেই সুবিধা নেয়নি।

৫. চুক্তি অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের ৩০৬ কোটি একর-ফুট এলাকায় পানি সংরক্ষণ করার অধিকার রয়েছে। এ সুবিধাও এখন পর্যন্ত নেয়নি ভারত।

৬. চুক্তি অনুযায়ী ভারত শতদ্রু, বিপাশা ও রবি নদীর পানির পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারে। ভারত এখন এর সদ্ব্যবহার করতে পারে।

৭. রাজস্থানে ইন্দিরা গান্ধী খালের পানিও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কারণ এখন পর্যন্ত হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মধ্যে শতদ্রু ও যমুনা সংযোগের কারণে এই খালের পানির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। এর ফলে পাকিস্তানকে ৩০ লাখ ‘একর-ফুট’ পানি দিচ্ছে ভারত।

৮. বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মধ্যে পানি নিয়ে বিবাদের সমাধান করার আহ্বান জানান। সুতরাং শতদ্রু নদীর পুরো পানি শুধু শুধু পাকিস্তান আর পাচ্ছে না।

৯. ভারত-পাকিস্তান পানিচুক্তিটি পাকিস্তানের কৃষিখাতের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আর অভিন্ন এই ছয়টি নদীর অববাহিকায় অবস্থান করছে পাকিস্তানের প্রধান শস্য উৎপাদনের এলাকা।

প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানের মধ্যে সিন্ধু পানিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির মধ্যস্থতা করে বিশ্বব্যাংক। চুক্তি অনুযায়ী, উপমহাদেশের পশ্চিমমুখী ছয়টি নদীর মধ্যে শতদ্রু, বিপাশা ও রবি নদীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতের হাতে। অন্যদিকে প্রায় কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই অন্য তিন নদী ঝিলম, চেনাব ও সিন্ধুর পানি পাবে পাকিস্তান।

যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে না ভারত : পাকিস্তানি কূটনীতিকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে ভারতের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বৈশ্বিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ার করার পর এর জবাব দেওয়ার জন্য কাজ করছেন পাকিস্তানের কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, পাকিস্তানকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে ঘোষণা দিয়েছে ভারত, তা মূলত মিথ বা কল্পিত বিষয়। এ কাজ করতে গেলে উল্টো ভারতই বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

ডনের প্রতিবেদনে কূটনীতিকদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তাঁদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক বলেন, ‘কোনো যুদ্ধ হবে না। আমাদের এ ধরনের কোনো ইচ্ছা নেই এবং ভারত বুঝতে পেরেছে, এই মুহূর্তে যুদ্ধ হলে ভারতের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। ’

তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া মনে করে, উরির হামলার পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার পর বরং পাকিস্তানের করাচির শেয়ারবাজারেই ধস নেমেছিল।

পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, ‘ভারত ভুল উদাহরণ তৈরি করছে, যা সবাইকে আঘাত করবে। ভারত যদি এ পথে চলতে থাকে, তাহলে পাকিস্তানের পরিবর্তে তারাই বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ’

পাকিস্তানের দাবি আবারও অস্বীকার করল চীন : সম্প্রতি পাকিস্তানের গণমাধ্যমে খবর বের হয় লাহোরে চীনের কনসাল জেনারেল য়ু বোরেন বলেছেন, কাশ্মীর ইস্যুতে আক্রান্ত হলে পাকিস্তানের পাশে থাকবে চীন। পাকিস্তান মিডিয়ার এমন দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গতকাল চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়েং এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আমি ওই বিষয়টি সম্পর্কে (কনসাল জেনারেল ‘উদ্ধৃতি’) জানি না। তবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চীনের অবস্থান স্থিতিশীল ও পরিষ্কার। এক সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি আবারও অস্বীকার করল চীন। তিনি বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান দুটি দেশই আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু। আমরা আশা করি তাদের দূরত্ব আলোচনার মাধ্যমে দূর করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে দুই দেশ সম্মিলিতভাবে কাজ করবে। ’ কাশ্মীর ইস্যু সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি এটি ইতিহাসের একটি অমিমাংসীত ইস্যু। আমরা আশা করি, সংলাপ ও শলাপরামর্শের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো শান্তিপূর্ণ ও যথাযথ উপায়ে এ সমস্যার সমাধান করবে। ’ সূত্র : এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টুডে, পিটিআই, টাইমস অব ইন্ডিয়া।


মন্তব্য