kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পর্যটন বর্ষেও দেখা নেই পর্যটকের

মাসুদ রুমী   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পর্যটন বর্ষেও দেখা নেই পর্যটকের

দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যে সরকার ২০১৬ সালকে ‘পর্যটন বর্ষ’ ঘোষণা করলেও কাঙ্ক্ষিত পর্যটক আসেনি বাংলাদেশে। পর্যটন বর্ষ উপলক্ষে ১০ লাখ পর্যটক আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কিন্তু ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো প্রচারই শুরু হয়নি। পর্যটন বর্ষে বাড়তি পর্যটক আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তা অর্জন করা যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেছেন, অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা, দক্ষতা, পেশাদারত্ব, পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে দেশের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা কাজে আসছে না। পাশাপাশি গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতা দেশের পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

দেশের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের তারকা হোটেল সি গালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুমী সিদ্দিকী গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটন বর্ষ ঘোষণায় তেমন কোনো লাভ হয়নি আমাদের। কারণ আগামীকাল যে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালন করতে যাচ্ছি, সেদিন আমাদের হোটেলে ১৭৯ রুমের মধ্যে ১৫০ রুমই খালি থাকছে। পর্যটন বর্ষের পর্যটন দিবসে কক্সবাজার আলো ঝলমল করার কথা ছিল। দেশের সর্ববৃহৎ এই সমুদ্রসৈকত ঘিরে নানা আয়োজন থাকবে বলে আমরা আশা করলেও তার কোনো ছিটেফোঁটাও নেই। ’ তিনি আরো বলেন, ‘পর্যটন বর্ষ শুধু ঘোষণাই হয়েছে, কিন্তু কার্যত কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমরা কক্সবাজার নিয়ে শুধু আশার বাণী শুনে যাচ্ছি। ’

কক্সবাজারের নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্থপতি মজিবুর রহমান স্বপন বলেন, ‘পর্যটন বর্ষকে কেন্দ্র করে দেশের পর্যটন খাতে যে পরিবেশ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা আমরা করেছিলাম তা পূরণ হয়নি। তবে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর, কক্সবাজারের সাবরংয়ে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন স্থাপন ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের কাজ শুরু, মেরিন ড্রাইভের সম্প্রসারণসহ অবকাঠামো খাতে কিছু উন্নতি হচ্ছে যার সুফল হয়তো আমরা ভবিষ্যতে পাব। ’

দেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম সংগঠন ট্যুর অপারেটরস্ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) প্রথম সহসভাপতি মো. রাফিউজ্জামান বলেন, ‘কোনো দেশের সরকার পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করলে দু-তিন বছর আগ থেকেই তাদের প্রস্তুতি থাকে এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের সরকার পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করার আগে সে ধরনের প্রস্তুতি নেয়নি, ফলে

তা সফল হয়নি বলা যায়। ’ তিনি বলেন, ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে, আর সেই ঘোষণা এসেছে ২০১৫ সালের মার্চে। এত অল্প সময়ে পর্যটন বর্ষ সফল করার প্রস্তুতি নেওয়া যায় না। মূলত এ কারণেই সরকার এ বর্ষকে বাড়িয়ে ২০১৮ পর্যন্ত বার্ধিত করেছে।

রাফিউজ্জামান বলেন, ‘জঙ্গি হামলাও পর্যটক সেভাবে না আসার একটি বড় কারণ। পর্যটক আসে সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে। এ ভরা মৌসুমে শোলাকিয়া ও হলি আর্টিজানের ঘটনা আমাদের পর্যটন সম্ভাবনায় পেরেক ঠুকে দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বুকিং বেশির ভাগই বাতিল হয়েছে। জাপান, ইতালিসহ ইউরোপের বেশির ভাগ দেশই তাদের পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্ক করেছে, ফলে তারা বুকিং বাতিল করে দিয়েছে। সরকারসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট আমরা যারা আছি এবং মিডিয়া মিলে যদি আবারও দেশের ইমেজকে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে বিশ্বে তুলে ধরতে পারি তাহলে আমরা আবারও পর্যটক পেতে পারি। ’

এদিকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) জানিয়েছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশি ভিজিটর আগমনের সংখ্যা ছয় লাখ ৪২ হাজার। এই সংখ্যা ২০১৪ সালে ছিল প্রায় পাঁচ লাখ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতিবছর বাংলাদেশ ভ্রমণে আসে মাত্র ৯ লাখ ভিজিটর, আর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যায় ১৫ লাখ।

বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট (বিএফটিডি) এবং ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল একরাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটন বর্ষ ঘোষণার ফলে ৫ শতাংশ পর্যটক আগমন বাড়েনি। দেশে যেসব পর্যটক এসেছে তাদের বেশির ভাগই বিজনেস ভিজিটর। এর মধ্যে কতজন প্রকৃত পর্যটক আছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ’

পর্যটক আগমন বাড়াতে আঞ্চলিক পর্যটনের ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করে রেজাউল একরাম বলেন, বাংলাদেশ সিঙ্গেল ডেস্টিনেশন কান্ট্রি নয়। এখানে বিদেশি পর্যটক আনতে হলে সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। শুধু ভারত, মিয়ানমার, চীনের বাজার ধরতে পারলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের আয় দ্বিগুণ হবে। এ জন্য এসব দেশে ফ্যাম ট্যুর, রোড শো, সেলস মিশন জোরদার করার দাবি জানান তিনি।  

পর্যটন বর্ষ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিডাব) চেয়ারম্যান মো. জামিউল আহমেদ জামিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করলেও পর্যটন বর্ষই তো হয়নি। পর্যটন বর্ষ মানে একটি কর্মসূচি, কিন্তু কর্মসূচি কি কিছু হয়েছে? মূলত জিনিসটি দৃশ্যমান হয়নি। যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়নি, তার সম্পর্কে আমরা কী বলতে পারি? সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল কিন্তু কেন হয়নি সেটা সরকার বলতে পারবে। ’

পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করার পর পর্যটক আগমন বেড়েছে বলে অবশ্য দাবি করেছেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও আখতারুজ জামান খান কবির। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটক যেভাবে বাড়বে আশা করা হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। দেশে সন্ত্রাসী হামলা ও জঙ্গি আতঙ্কসহ অনেক দেশে রেড অ্যালার্ট জারি করায় পর্যটক আগমন সেভাবে বাড়েনি। ’ তিনি বলেন, ‘জাপান থেকে আমাদের দেশে প্রচুর পর্যটক আসত, আমরা এবার সেখান থেকে হোঁচট খেয়েছি হলি আর্টিজানের ঘটনায়। একইভাবে ইতালিসহ ইউরোপীয় অনেক দেশ এখনো সতর্কতামূলক অবস্থানে আছে। ফলে ব্যাপকভাবে পর্যটক টানা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে চীন। গত বছর চীন থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি ভিজিটর এসেছে এবং তা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। আগে চীনের পর্যটক সেভাবে না এলেও বর্তমানে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ইত্যাদির কারণেই পর্যটক আগমন বেড়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমরা পর্যটক বাড়ানোর জন্য বিশেষ কোনো বরাদ্দ পাইনি, তার পরও আমরা আশাবাদী। ’


মন্তব্য