kalerkantho


জীবন যেমন

বাঘের সঙ্গে বোঝাপড়া

কৌশিক দে, খুলনা   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাঘের সঙ্গে বোঝাপড়া

বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী তিনজন—কামাল, আবদুল হালিম ও গোলাম বারী। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাটিতে দাগ কেটে ছক বানিয়ে বাঘবন্দির সেই খেলা এখন হারিয়ে গেছে। এই খেলা যারা খেলত তারা জানে, ছকের ভেতর থাকে গুটির বাঘ, হরিণ।

এই খেলার চালে চালে হরিণ খেয়ে ফেলে বাঘ। কিন্তু কখনো কখনো মাথা খাটিয়ে বাঘকে বন্দি করা হয়। হরিণগুলো ছকের গুটি হয়ে এমনভাবে ঘিরে ফেলে যে বাঘের আর কিছুই করার থাকে না।

এ তো গেল হারিয়ে যাওয়া এক খেলার কথা। কিন্তু বাস্তবে বাঘ দেখেনি বা বাঘের কথা শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শৈশবে স্বপ্নের ভেতর বাঘ দেখা রাতের ঘুম কত না রোমাঞ্চকর। বড় হয়ে চিড়িয়াখানা, জিওগ্রাফিক চ্যানেল দেখার রোমাঞ্চ রীতিমতো সুখস্মৃতি। কিন্তু এমনটাও তো আছে, বাস্তবে বনের ভেতর সামনে এসে পড়েছে বাঘ। তখন? কী রোমাঞ্চ এবার? নিরাপদ স্থান থেকে বাঘ দেখা ভিন্ন কথা।

কিন্তু এই অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। বাঘ চায় ক্ষুধা মেটাতে, মানুষ চায় জীবন বাঁচাতে। এমন লড়াইয়ের ফল—বাঘ মুখের রক্ত মুছে হুংকার ছেড়ে চলে যায়।

তবে বনের ভেতর বাঘের সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ে ব্যতিক্রম তো আছেই। কিছু সাহসী, বিচক্ষণ শ্রমজীবী মানুষ বাঘের মুখ থেকে ফিরতে পেরেছে। বাঘবন্দি খেলার সেই হরিণের মতো কবজা হয়েছে বাঘ।

শুনে বীরত্বের নমুনা পাওয়া গেলেও বাঘের থাবা থেকে ফিরে আসা মানুষের জীবন খুবই করুণ। বিকলাঙ্গ জীবন কাটে তাদের। বনের ভেতরের এমন পেশা ছাড়তেও পারে না তারা। ভৌগোলিক কিংবা পারিবারিক পেশাগত পরম্পরার কারণেই তারা সুন্দরবন খুটে খাওয়া মানুষ।

সুন্দরবনে পেটের দায়ে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে, বনের পাশের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে অনেকেই বাঘের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে এসেছে। বাঘের ভয়াবহ থাবায় এখন অস্বাভাবিক জীবন তাদের। জীবন-জীবিকার সংগ্রামের সাহসী এই মানুষগুলো কেমন আছে এখন? সেদিনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? বাঘের মুখ থেকে ফিরে আসা এমনই কয়েকজনের কাছে শোনা যাক সেই সব বাস্তব গল্প—

খুলনার কয়রা উপজেলার গোলখালী গ্রামের গোলাম বারী (৪০)। জীবিকার জন্য সুন্দরবনে কতবার গেছেন এর হিসাব নেই। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে, ১৮ সেপ্টেম্বর সামনে এসে হাজির হয় বাঘ। এরপর যা হওয়ার কথা তাই। কৌশলে লড়াই করে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন তিনি। ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা মনে করতে গিয়ে তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে বেঁচে আছেন।

বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা কলতে গিয়ে গোলাম বারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুন্দরবন ঘিরেই আমার বেড়ে ওঠা, জীবন-জীবিকা। পাস-পারমিট নিয়েই সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। সাথে ছিল কয়েকজন সঙ্গী। সেদিন ছিল ১৮ সেপ্টেম্বর, রবিবার। দুপুর ১টা হবে। বনের কাছিকাটা এলাকার ভাইজোড়া খালে মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ করেই খালপাড়ের ঝোপের মধ্য থেকে একটা বাঘ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় আমার ডান হাত। সব কিছু সামলে নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাম হাত দিয়ে বাঘের গলা চেপে ধরি। বিপাকে পড়ে বাঘ। শ্বাস নিতে না পেরে আমাকে ছেড়ে পাল্টা লাফে জঙ্গলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপর চিৎকার শুরু করি। পাশে থাকা রবিউল, শফি মোড়ল, আপন ভাই গোলাম রসুল তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করে। বর্তমানে আমি চিকিৎসাধীন রয়েছি। ’

কয়রার স্থানীয় সাংবাদিক রিয়াছাদ আলী বলেন, ‘গোলাম বারী সাহসের জন্যই বেঁচে গেছেন। কিন্তু এখন তাঁর চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন। ’

২০১১ সালের এপ্রিল মাস। কয়রা গ্রামের বনজীবী কামাল হোসেন (৩৮) ও রুহুল আমিন সুন্দরবনের চালকি নদীর খালে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। এমন সময় হঠাৎ কামালের বুকের ওপর লাফিয়ে পড়ে বাঘ।

মাথার চুল থাবা দিয়ে ছিলে ফেলে। তাঁর বাঁ চোখ ও চোয়াল ছিলে যায়। এরপর কৌশলে বাঁ হাতে কাদা নিয়ে বাঘের চোখে ঢুকিয়ে দেন কামাল। বাঘ পালিয়ে যায়। পরে সঙ্গী রুহুল আমিন তাঁকে উদ্ধার করেন।

বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে শারীরিক সমস্যায় ভোগা কামাল সঠিক চিকিৎসার অভাবে স্বাভাবিক হতে পারছেন না। পাঁচ বছর আগের ক্ষত এখনো কামালকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে কামাল বলেন, ‘প্রায় ১০ মিনিট বাঘটি আমার পেটের ওপর বসে থাকে। তখনো আমার জ্ঞান আছে। ওর চোখের ওপর নিজের চোখ রাখি। বাঘটি দুর্বল হয়ে পড়ে। সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে। এখন বাম চোখে দেখতে পাই না। দুই শিশু সন্তানসহ পরিবার নিয়ে এখন কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। এখনো শরীরে তীব্র জ্বালা-যন্ত্রণা করছে। আমি একটু সুস্থ হওয়ার জন্য একটু ভালো চিকিৎসা চাই। ’

দাকোপ উপজেলার বানীশান্তা গ্রামের হালিমকে এখন সবাই বাঘা হালিম বলে ডাকে। কিন্তু বাঘের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসা বাঘা হালিমের অবস্থা এখন করুণ। ১৪ বছর ধরে সেদিনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিন। শারীরিক অক্ষমতায় ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। এখন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও পেটের ভাত জোটে না।

বাঘের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হঠাৎ খবর আসে, আমাদের সহপাঠী এক জেলেকে বাঘে ধরেছে। তাকে বাঘের মুখ থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা কয়েকজন বনে যাই। ঘটনাস্থলে যেতেই আকস্মিকভাবে আমার পেছন থেকে বাঘ এসে মাথায় থাবা মারে। ডান হাতের কবজিতে কামড়ে ধরে আছাড় মারে। আমার সাথে থাকা লোকজন দ্রুত সরে পড়ে। সবাই লাঠিসোঁটা, মশাল ও বাজি নিয়ে হাজির হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বন্দুক দিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। ১০-১২ মিনিট যুদ্ধের পর বাঘ আমাকে ফেলে চলে যায়। তখন আমি রক্তাক্ত, পুরো জ্ঞানও ছিল না। পরে খুলনার একটি ক্লিনিকে আমাকে ভর্তি করা হয়। ওই ক্লিনিকে মাথায় ৩২টি সেলাই পড়ে। হাতের কবজি কামড়ে ছিঁড়ে ফেলায় এখনো ডান হাতে তেমন বল পাই না। ’

হালিম বলেন, ‘তার পরও জীবনসংগ্রাম থামেনি। এখনো জাল নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ, কখনো কাঁকড়া ধরি। সহযোগিতার জন্য বন বিভাগ, স্থানীয় এমপিসহ বিভিন্ন স্থানে আবেদন করি কিন্তু কোথাও সহায়তা মেলেনি। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। জানি না কত দিন এভাবে কাটবে। ’

সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের সংরক্ষিত নথি অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণে ২৬০ জন নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে ৪৬ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪১। নিহতদের অধিকাংশই ছিল বনজীবী। তাদের বাড়ি সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা, বাগেরহাটের শরণখোলা, মংলা, রামপাল ও বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায়।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, বাঘ বা কুমিরের হামলায় কোনো ব্যক্তি নিহত হলে তার পরিবারকে এক লাখ টাকা ও আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. সাঈদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুন্দরবনে বাঘ ও কুমিরের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের বন বিভাগের নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে নিহতদের স্বজনদের এক লাখ ও আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ’


মন্তব্য