kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভুয়া সনদে সাবরেজিস্ট্রার

পেকুয়ায় স্বামী গ্রেপ্তার, স্ত্রী পালিয়েছেন

আরো ১৯ সাবরেজিস্ট্রার গ্রেপ্তার হতে পারেন

আপেল মাহমুদ   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পেকুয়ায় স্বামী গ্রেপ্তার, স্ত্রী পালিয়েছেন

জাল সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে এক সাবরেজিস্ট্রারকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রামের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরিতোষ কুমার দাস নামের এই কর্মকর্তাকে গত বুধবার কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন।

এমএসসি ও মুক্তিযোদ্ধার জাল সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে পরিতোষসহ ২০ জন সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে। দুদক চট্টগ্রাম অঞ্চল-১-এর উপসহকারী পরিচালক আহামদ ফরহাদ হোসেন জানান, পরিতোষ কুমার দাস চকরিয়া সাবরেজিস্ট্রার অফিসের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পেকুয়া উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার অফিসে কর্মরত ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পরিচয়ে চাকরিতে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাবরেজিস্ট্রার অফিসে খণ্ডকালীন সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

আহামদ ফরহাদ হোসেন জানান, চাকরিতে যোগদানের সময় এসএসসি পাসের সনদ দিলেও ১৯৮৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীদের চাকরি আত্তীকরণের জন্য পরিতোষ কুমার দাস সাবরেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পেতে এমএসসির সনদ দিয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। পরে সনদটি জাল প্রমাণিত হয়। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকার শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়েছে।

শুধু পরিতোষ নন, তাঁর স্ত্রী মিনতি রানীর বিরুদ্ধেও দুদকে মামলা হয়েছে। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের পটিয়ায় সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত। স্বামীর গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে তিনি পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। চট্টগ্রামের দুদক তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না। তাঁর বিরুদ্ধে ভুয়া ঠিকানা ও মুক্তিযোদ্ধার জাল সনদ দিয়ে সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিতোষের প্রকৃত বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। অথচ তিনি ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করে সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি নিয়েছেন। তিনি চাকরির ফাইলে উল্লেখ করেছেন যে তাঁর জন্ম ১৯৬৬ সালে। সেই হিসাবে একাত্তরে তাঁর বয়স ছিল মাত্র চার বছর। দুধের শিশু হিসেবে তিনি মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী ছিলেন। আর সেই যোগ্যতায় তিনি সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি নিয়েছেন।

পরিতোষ-মিনতি দম্পতি ছাড়াও সারা দেশে আরো অনেক সাবরেজিস্ট্রারের মুক্তিযোদ্ধার সনদ ও একাডেমিক সনদ জাল ধরা পড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভুয়া সনদধারী এসব সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন ভুয়া সনদ ও তথ্য গোপনের দায়ে ১৩-১৪ জন সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি চলে যায়।

নিবন্ধন পরিদপ্তরের নথি সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে মুজিবনগর সরকারের ১৯০ জন কর্মচারী সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি নিয়েছেন। চাকরির নথিতে তাঁরা মুজিবনগর সরকারের ‘কুরিয়ার’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সনদ সংযুক্ত করেন। এই চাকরি নেওয়ার জন্য তাঁরা উচ্চ আদালতে রিট এবং আদালত অবমাননা মামলা পর্যন্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, এসব সনদের অধিকাংশই জাল। মুক্তিযোদ্ধার সনদ ছাড়াও তারা বিএ ও এমএ পাসের যে সনদ জমা দেন সেগুলোরও কিছু কিছু ভুয়া প্রমাণিত হয়। তাদের দেওয়া ম্যাট্রিকের সনদ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় কারো বয়স চার বছর, কারো বয়স পাঁচ বছর আবার কারো বয়স ছিল ছয় বছর।

আইন মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রেশন ডিএস অফিস সূত্রে জানা যায়, ভুয়া সনদধারী এসব সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই তাঁরা উচ্চ আদালতে রিট করে সব কিছু থামিয়ে দেন। এবার ভুয়া সাবরেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছে দুদক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মুজিবনগরী সাবরেজিস্ট্রার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক দিন আগে আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় নিয়ে দুদক আমাদের হয়রানি করছে। বিগত দিনে উচ্চ আদালতের নির্দেশে আইন মন্ত্রণালয় আমাদের সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি দিয়েছে। এখন উচ্চ আদালতকে চ্যালেঞ্জ করে দুদক যা করছে তা ঠিক হচ্ছে কি না সে বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনে আবার আমরা আদালতে যাব। ’


মন্তব্য