kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে ছয় রোগের বাহক মশা

তৌফিক মারুফ   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে ছয় রোগের বাহক মশা

মশা দেখলেই ভয় ধরে যায় ডেঙ্গুর। একইভাবে ডেঙ্গু হলেই দায়ী করা হয় মশাকে।

ডেঙ্গুর ভয়ে শহর-নগরে চলে কামান দাগানো—ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে মশা নিধন কার্যক্রম। এ ছাড়া আছে তরল কীটনাশক। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। বরং দিনে দিনে মশা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত ১০ বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও।

কেবল ডেঙ্গু নয়, মশা হয়ে উঠেছে একাধারে ছয়টি মারাত্মক রোগের বাহক। অন্য আরো কিছু দেশে বিচ্ছিন্নভাবে এসব রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলেও বাংলাদেশে ছয়টি রোগেরই ঝুঁকি রয়েছে মশার ব্যাপকতার কারণে। প্রধানত এডিস এজিপ্টি, কিউলেক্স ও অ্যানোফিলিস প্রজাতির মশার মাধ্যমেই ছড়ায় এসব রোগ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এই ছয় রোগের ঝুঁকি থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সূত্র অনুসারে এই তিন জাতের মশা অন্তত ৯টি রোগের বাহক ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে সারা বিশ্বে বছরে ১০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। গত বছর কেবল ম্যালেরিয়াতেই মারা গেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ। আর একমাত্র ডেঙ্গুর ঝুঁকিতেই রয়েছে ১০০টি দেশের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ। আর ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

জনস্বাস্থ্য ও রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মারাত্মক ছয়টি রোগ বিস্তারে মশা সবচেয়ে বড় বাহক হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও ফাইলেরিয়ার প্রাদুর্ভাব আগে থেকে রয়েছে। নতুন যুক্ত হয়েছে জাপানিজ এনসেফালাইটিস, চিকনগুনিয়া এবং সর্বশেষ জিকার ঝুঁকি। এর মধ্যে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া আর জিকা এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। অন্য রোগগুলো ছড়ানোর জন্য দায়ী অন্যান্য প্রজাতির মশা। তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য এখন যত ধরনের মশা হুমকিস্বরূপ, এর সবই বাংলাদেশে রয়েছে। ফলে মশাকে এখন আর কম গুরুত্ব দেওয়ার কোনো উপায় নেই। এ অবস্থায় মশা নির্মূলে সর্বাত্মক কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ সামসুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, মশা এখন প্রাণঘাতী একটি বাহক। আর মানুষের মতো মশার জীবনধারণের কৌশলও অনেকটা পাল্টেছে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণে গতানুগতিক ধারায় কাজ করলে পুরোপুরি সফলতা পাওয়া যাবে না। নতুন প্রযুক্তি ও পথ খুঁজতে হবে।

ডেঙ্গু : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ৭৫৭ জন। মারা গেছে ছয়জন। এর মধ্যে গত আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল গত ১০ বছরে (কোনো এক মাসে) সর্বোচ্চ এক হাজার ১৮৮ জন। এটা খুবই উদ্বেগজনক। ওই সূত্র জানায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশের শরীরেই ডেঙ্গুর নমুনা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সাধারণত জুন-জুলাই থেকে শুরু করে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার থাকে। আর পরিস্থিতি বেশি খারাপ থাকে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাচ্ছি। ডেঙ্গুর উৎস বন্ধ হচ্ছে না বলেই এমনটা হচ্ছে। এসব উৎস বন্ধ না করতে পারলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যাবে। ’ তিনি বলেন, অন্য অনেক ভাইরাল রোগের মতো সরাসরি এরও কোনো প্রতিষেধক নেই। লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে এর মোকাবিলা করা হয়। অন্য ভাইরাল ফিভারের মতো এটিও আপনা-আপনি সেরে যায় সাত দিনের মধ্যে। তবে যদি রোগীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে এবং হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী পর্যায়ে চলে যায় তখন দ্রুত ফ্রেশফ্রোজেন প্লাজমা কিংবা কনসেনট্রেটেড প্লেটলেট, অথবা প্রয়োজনে পূর্ণ রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

জিকায় তোলপাড় : গত ১ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে অন্য দেশের নাগরিকদের সঙ্গে ১০ জনের বেশি বাংলাদেশি জিকায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে জিকা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। সিঙ্গাপুরের পরপরই যুক্ত হয় থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার নাম। এসব দেশ থেকে আসা যাত্রীদেরও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এসব দেশ থেকে আসা সব যাত্রীকে বিমান থেকে নেমে ইমিগ্রেশন লবিতে প্রবশের পথেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ টিমের মুখোমুখি হতে হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ওই ব্যবস্থা কার্যকর হয়। তবে তাদের কারো শরীরে তাৎক্ষণিক জিকার কোনো  উপসর্গ দেখা যায়নি। তবে গত মার্চ মাসে চট্টগ্রামে জিকায় আক্রান্ত একজন রোগী পাওয়া যায়। পরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ৩০টি দেশসহ ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে জিকা ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে গত ১ ফেব্রুয়ারি এই ভাইরাসের সংক্রমণকে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগজনক জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

চিকনগুনিয়া : ভারতের দিল্লিসহ আশপাশের একাধিক এলাকায় এডিস মশাবাহিত চিকনগুনিয়ার প্রকোপে ৩০ জনের মৃত্যু ও এক হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার খবরে সতর্ক হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশে আগে থেকেই চিকনগুনিয়ার বিস্তার রয়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। আইইডিসিআরের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুসারে রাজধানীর প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে চিকনগুনিয়ার আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে ভারতে যেভাবে চিকনগুনিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে তার কারণ নিয়ে সংশয়ে আছেন বাংলাদেশের গবেষকরা। তাঁদের মতে, শুধু চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সরাসরি মানুষের মৃত্যু হওয়ার কথা নয়।

আইইডিসিআরের গবেষকরা জানান, ২০০৫ সালে ভারতে এক দফা চিকনগুনিয়ার ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয়। তখন এক দফা সমীক্ষা চালানো হলেও তখন দেশে এর কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। দেশে চিকনগুনিয়ার প্রথম রোগী ধরা পড়ে ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে আবারও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঢাকার দোহারে এর প্রকোপ দেখা দেয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে ঢাকার দোহারে ৫২ জনের রক্ত পরীক্ষা করে ৩১ জনের দেহে চিকনগুনিয়ার ভাইরাস পাওয়া যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১২ জনের দেহে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ওই সময় তিনজন রোগীর দেহে চিকনগুনিয়ার ভাইরাস ধরা পড়ে।

ম্যালেরিয়া : ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়া আর মৃত্যু—দেশের পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিবছরের ঘটনা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা নানামুখী উদ্যোগের কথা বললেও মৃত্যু থামছে না। কোনো বছরে প্রকোপ একটু কমলেও পরের বছরেই আবার তা বেড়ে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ১৩টি জেলার প্রায় এক কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর ৯৮ শতাংশই রয়েছে পার্বত্য চার জেলা ঘিরে। ২০০৮ থেকে ২০১৫ সালের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখানো হয়, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুর হার অনেক কম। ২০১৪ সালে মারা যায় ৪৫ জন। ২০১৫ সালে তা কমে ৯ জনে নেমে আসে। একই সঙ্গে কমে আসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার। ২০১৪ সালে আক্রান্ত ছিল ৫৭ হাজার ৪৮০ জন, ২০১৫ সালে তা কমে ৩৯ হাজার ৭১৯ জনে নেমে আসে।

দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করতে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত ইস্যুতে সমন্বিত জরুরি উদ্যোগ নেওয়া না গেলে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করার লক্ষ্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

ফাইলেরিয়া : দেশে ফাইলেরিয়ার ঝুঁকি পুরনো। সাধারণত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। ২৯টির বেশি জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে এই রোগ। আক্রান্ত ৫০ লাখেরও বেশি। সরকার পাঁচটি জেলাকে ফাইলেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করলেও এখনো ১৪ জেলার পরিস্থিতি গুরুতর। এসব এলাকার আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই বিকলাঙ্গ হওয়ার পথে। আর রাজধানী ঢাকায়ও এ রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে।

ফাইলেরিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, দেশে ফাইলেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখা ৫০ লাখের মতো। মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সর্বস্তরে জোরদার না থাকায় এই রোগের বিস্তার ঠেকানো মুশকিল হয়ে পড়ছে।

ডা. মোয়াজ্জেম জানান, চার প্রজাতির স্ত্রী মশা ফাইলেরিয়ার পরজীবী জীবাণু বহন করে থাকে। তবে বাংলাদেশে বেশি মাত্রায় এই পরজীবী (উচেরেরিয়া ব্যানক্রোফটি) বহন করে থাকে কিউলেক্স প্রজাতির স্ত্রী মশা। মানুষের ঘরবসতির মধ্যেই এ ধরনের মশার বেশি বাস। ঘরের আশপাশের নোংরা জলাশয় ও নালা-নর্দমায় এই মশা ডিম পাড়ে ও প্রজনন ঘটায়। এই মশায় আক্রান্ত মানুষের দেহের লসিকা গ্রন্থিতে থাকা কৃমি থেকে জন্ম নেয় ফাইলেরিয়ার পরজীবী। কালক্রমে লসিকাগ্রন্থি ফুলে ও বন্ধ হয়ে লসিকা প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটায়। ধীরে ধীরে রোগীর হাত, পা, অণ্ডকোষ, যৌনাঙ্গ ও মেয়েদের ক্ষেত্রে স্তন ফুলে উঠে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যায়। ফলে এই রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

এনসেফালাইটিস : দেশের ৩১টি জেলায় জাপানিজ এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এর মধ্যে রাজশাহী, রংপুর, নওগাঁ, নীলফামারীসহ আরো কয়েকটি এলাকায় এই ভাইরাসে সংক্রমণের হার বেশি। আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ৩০-৩৫ শতাংশ। তবে যারা বেঁচে যায় তাদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই পরবর্তী সময়ে স্নায়ুতন্ত্রবিষয়ক নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, মশাবাহিত ভাইরাসের মধ্যে একমাত্র এই জাপানিজ এনসেফালাইটিসপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এই ভ্যাকসিন সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।


মন্তব্য