kalerkantho


পরিচয় থাকলেও জঙ্গিদের লাশ বেওয়ারিশ!

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পরিচয় থাকলেও জঙ্গিদের লাশ বেওয়ারিশ!

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাকারী ছয় জঙ্গির লাশ ঘটনার ৮১ দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা করেছে। বেওয়ারিশ লাশ দাফনকারী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

গত ২ জুলাই সকালে গুলশানের ওই রেস্তোরাঁয় সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোর নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এ নিহত হয় তারা। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ (সিএমএইচ) লাশগুলো মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করে।

এসব সশস্ত্র জঙ্গিরা গত ১ জুলাই গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ঢুকে দেশি ও বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে। রাতভর জঙ্গি হামলায় ১৭ জন বিদেশি, তিনজন বাংলাদেশি ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। পরে কমান্ডো অভিযানে জঙ্গিরা নিহত হয়। এর পর থেকে ওই ছয়টি লাশ সিএমএইচে ছিল। ঘটনার মাসখানেক পর এদের  অভিভাবকদের দেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু  নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে লাশ নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আবেদন না করায় তাদের লাশ আঞ্জুমান মুফিদুলের মাধ্যমে দাফন করা হলো।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান এ বিষয়ে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, গুলশানের জঙ্গি হামলার পর অভিযানে নিহত ছয়জনের পরিবারের কেউই নিহতদের লাশ নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করেনি।

এমনকি তারা নিজেদের নিহতদের স্বজন হিসেবেও আইনগতভাবে দাবি করেনি। এ কারণে আজ (গতকাল) আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশগুলো দাফন করা হয়েছে।

সম্প্রতি গুলশানের জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা, কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত জঙ্গিদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা রাখা হয়েছে। তবে তাদের লাশ গ্রহণ করতে কোনো স্বজন আসছে না। তাই লাশ হস্তান্তর ও দাফন বিলম্বিত হচ্ছে। ’

এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক লে. কর্নেল রাশিদুল হাসান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হুমায়ূন কবীরের কাছে দুপুর ১২টার দিকে ছয়টি লাশ হস্তান্তর করা হয়। এ সময় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের লোকজনও উপস্থিত ছিলেন।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নির্বাহী পরিচালক ইলিয়াস আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ওয়ারিশ, বেওয়ারিশ জানি না। পুলিশ আমাদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করেছে এবং আমরা আজ দুপুরে (গতকাল) জুরাইন কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করি। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ লাশই দাফন করে থাকে। ’

প্রসঙ্গত, গত ২ জুলাই সফল কমান্ডো অভিযানে ছয় জঙ্গি নিহত হয় বলে ওই দিন দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে মিলিটারি অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী জানান।  

ওই দিন আইএসের মুখপত্র আমাক নিউজ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঙ্গি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ গুলশানের ওই রেস্তোরাঁতে হামলাকারী পাঁচ যুবকের ছবি ও নাম প্রকাশ করে। তাতে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তারা হলো আবু উমর, আবু সালাম, আবু রহিম, আবু মুসলিম ও আবু মুহারিব। এদিন পুলিশের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিহত জঙ্গিরা হলো আকাশ, বিকাশ, ডন, বাঁধন ও রিপন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন জন তাদের নাম-পরিচয় তুলে ধরে। পরে পুলিশও এসব ছবির পরিচয় নিশ্চিত করে। এরা হচ্ছে রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও সাইফুল ইসলাম চৌকিদার। এ ছয়জনের মধ্যে নিবরাস ইসলাম নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী, রোহান ইমতিয়াজ ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল স্কলাসটিকা থেকে পাস করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল। মীর সামিহ মোবাশ্বের স্কলাসটিকায় পড়ত। এ ছাড়া রায়হান মিনহাজ ও আন্দালিব আহমেদ মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে। এদিকে ওই ছয়জনের মধ্যে সাইফুলকে পুলিশ জঙ্গি বললেও তার পরিবার দাবি করছে সে দেড় বছর ধরে হলি আর্টিজানে পাচক হিসেবে কর্মরত ছিল।

গতকাল দাফন হওয়া জঙ্গিদের মধ্যে রোহান ইবনে ইমতিয়াজের বাবা এস এম ইমতিয়াজ খান ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা। মা শিক্ষিকা। দুই ভাইবোনের মধ্যে রোহান বড়। রোহান ঢাকার স্কলাসটিকা থেকে ‘এ’ লেভেল শেষ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিল। সামিহ মোবাশ্বেরের পরিবারের বাসা বনানী ডিওএইচএসে। তার বাবা একটি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত মীর এ হায়াতের বক্তব্য অনুসারে সামিহ স্কলাসটিকা স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল পাস করেছিল এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

নিবরাসের মা-বাবার বসবাস ঢাকার উত্তরায়। সে মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিল। বাবা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নিবরাস বড়। তার নিকটাত্মীয়রা সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে কর্মরত।

খায়রুলের পরিবারের বসবাস বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার চুতিনগর ইউনিয়নের ব্রিকুষ্টিয়া গ্রামে। তার দিনমজুর বাবার নাম আবু হোসেন। খায়রুল ব্রিকুষ্টিয়া দারুল হাদিস সালাদিয়া কওমি মাদ্রাসায় কিছুদিন পড়েছিল।   এরপর ডিহিগ্রম ডিইউ সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে।  

শফিকুলের বাড়ি বগুড়ার ধুনটে। শফিকুলের বাবা বদিউজ্জামানের বক্তব্য অনুসারে সে ধুনটের গোঁসাইবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও গোঁসাইবাড়ী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। এরপর বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হয়।

আর সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত আবুল হাসেম চৌকিদার।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সাইফুল ছিল দ্বিতীয়। তার ছোট ভাই বিল্লাল মালয়েশিয়ায় থাকে। দীর্ঘ ১০ বছর জার্মানিতে থাকার পরে দেশে ফিরে আসে সাইফুল। এরপর সে দেড় বছর আগে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় পিজা তৈরির বাবুর্চি হিসেবে কাজে যোগদান করে।

গুলশানে সাইফুল নিহত হওয়ার পর তার স্বজনরা মুষড়ে পড়ে। গতকাল বেওয়ারিশ হিসেবে তার লাশ হস্তান্তরের খবরে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। তার স্ত্রী সোনিয়া বেগম বারবার কেঁদে মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

সাইফুলের মামাতো ভাই আবু সাঈদ বলেন, ‘আমার ভাই জঙ্গি ছিল না। পুলিশের রিপোর্টে এটা আসছে। আমাদের লাশ দেওয়ার কথা ছিল। তার পরও দিল না...। ’

এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পড়ে রয়েছে আরো ১৪ জঙ্গির লাশ । তাদের মধ্যে কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হয় ৯ জন। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় নিহত নব্য জেএমবির প্রধান সমন্বয়ক তামিম আহমেদ চৌধুরীসহ তিন জঙ্গির লাশও আছে ঢামেকে। এ ছাড়া রাজধানীর রূপনগরে নিহত মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ও আজিমপুরে নিহত জেএমবি নেতা তানভীর কাদেরী ওরফে আব্দুল কাদিরের লাশও হস্তান্তর করা হয়নি।


মন্তব্য