kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সন্ধ্যা নদীতে ২৩ মৃত্যু

লঞ্চ উদ্ধার পাওয়া গেল শিশুসহ আরো ৯ লাশ

বরিশাল অফিস   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



লঞ্চ উদ্ধার পাওয়া গেল শিশুসহ আরো ৯ লাশ

বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে ডুবে যাওয়া ‘এমএল ঐশী’ নামের লঞ্চটি উদ্ধার হয়েছে গতকাল। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সন্ধ্যা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় পাঁচ শিশু ও দুই নারীসহ আরো ৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমএল ঐশীকে উদ্ধার করে।

এ সময় লঞ্চের ভেতরে চার শিশুর লাশ পাওয়া যায়। পরে সন্ধ্যায় ও রাতে উদ্ধার হয় এক শিশু ও দুই নারীসহ পাঁচজনের লাশ। এ নিয়ে গতকাল রাত ১১টা পর্যন্ত ২৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হলো। তালিকা অনুযায়ী নিখোঁজ রয়েছে আরো ১০ জন। এর মধ্যে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

গতকাল উদ্ধার হওয়া নিহতরা হলো সৈয়দকাঠি গ্রামের মিলন ঘরামীর ছেলে সাফওয়ান (৩), জীরাকাঠি গ্রামের রহিম হাওলাদারের ছেলে রিয়াদ (৬), আলমগীর সরদারের সাড়ে তিন বছরের মেয়ে মাফিয়া, মশাং গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে রাব্বি (৫), ১৪ মাস বয়সের শিশু মাইশা, সাতবাড়িয়া গ্রামের মজিদ হাওলাদার (৫৫) ও রুহুল আমিন (৩৫), মসজিদবাড়ি গ্রামের খুকু মনি (৩০) এবং উজিরপুরের কেশবকাঠি গ্রামের খলিল হাওলাদারের স্ত্রী হামিদা বেগম (৪০)। এর আগে বুধবার রাতে ফিরোজা বেগম নামের আরেক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে সন্ধ্যা নদীর তীরে ট্রলার নিয়ে অপেক্ষা করছে স্বজনরা। অন্যদিকে লঞ্চ দুর্ঘটনার ১৯ ঘণ্টা পার হলেওগতকাল রাত পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সকাল ৭টায় নির্ভীকের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। পৌনে ৮টায় লঞ্চটি উদ্ধার করা হলে এর  ভেতরে চার শিশুর মৃতদেহ পাওয়া যায়।

উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত : গতকাল সকাল পৌনে ৮টায় ঐশী উদ্ধারের পরও ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান শেষে সকাল ১১টায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘নৌবাহিনীর ডুবুরি দল, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য ও ডুবুরি দল, কোস্ট গার্ড সদস্য, পুলিশ সদস্য ও জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা যৌথভাবে এ উদ্ধারকাজ পরিচালনা করেছেন। এর নেতৃত্ব ছিলেন জেলা প্রশাসক। তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে আমি (এডিএম) ঘটনাস্থলে থেকে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছি। লঞ্চটি উদ্ধারসহ আর কোনো মৃতদেহ না পাওয়ার কারণে সকাল ১১টায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি ইকরা নামে একটি লঞ্চ রয়েছে এ রুটে। সেই লঞ্চটি মেরামতের জন্য তোলা হলে এমএল ঐশীকে ভাড়া করে যাত্রী পারাপার করা হতো। তদন্ত কমিটি সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। পাশাপাশি নৌযানটির মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

ট্রলার নিয়ে নদীতে স্বজনরা : এদিকে নিখোঁজ সন্ধানে সন্ধ্যা নদীর তীরে অপেক্ষা করছে স্বজনরা। উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করায় স্বজনরা ছোট ছোট ট্রলার নিয়ে নদীতে অনুসন্ধান শুরু করেছে। স্বজনদের একমাত্র ভরসা লাশ ভেসে ওঠার ওপর।

স্বরূপকাঠির আলকির হাট এলাকার নিখোঁজ হিরা বেগমের স্বামী কালাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও স্ত্রীর কোনো সন্ধান পাইনি। আশা ছিল লঞ্চটি উদ্ধার হলে অন্তত লাশটি লঞ্চের ভেতর থেকে উদ্ধার হবে। কিন্তু সেখানেও পাওয়া যায়নি। ’ এখন স্ত্রীর লাশের সন্ধানে ট্রলার দিয়ে ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছেন তিনি।

আলপনা রানীর স্বামী মনি শঙ্কর বলেন, ‘সারা রাত নদীর তীরে অপেক্ষায় রয়েছি স্ত্রীর খোঁজের জন্য। কিন্তু কিছুই হলো না। ’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান স্থগিতের পর থেকে শুনে আসছি এই উদ্ধারকাজ শুরু হবে। কিন্তু উদ্ধারকারী জাহাজ আসে ভোররাতে। সকাল ৭টা পর্যন্ত উদ্ধারের কোনো নমুনা দেখা যায়নি। ’ 

স্থানীয় আনোয়ার হোসেন, শাজাহান সরদার ও কমল মিত্র বলেন, বিলম্বে উদ্ধার অভিযান শুরু করা নিখোঁজদের স্বজন ও স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে লঞ্চের ভেতরে কেবল চার শিশুর লাশ পাওয়ায়।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ ঐশী ছিল অবৈধ : স্থানীয় লোকজন জানায়, বানারীপাড়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইউসুফ আলী ঐশী ভাড়া করে চালাতেন। মূলত এটি একটি ট্রলার ছিল। ছাউনি দিয়ে এমএল টাইপের লঞ্চ বানিয়ে বানারীপাড়া-হারতা রুটে এটি চলাচল করত।

বরিশাল নদীবন্দরের কর্মকর্তা এবং বিআইডাব্লিউটিএ নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঐশী নামের ওই নৌযানটির সার্ভে সনদ, রুট পারমিটসহ কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। এটি একটি ইঞ্জিনচালিত ছোট ট্রলার, যার ওপর লঞ্চের মতো ছাউনি দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যেখানে-সেখানে যাত্রী পারাপার করা হতো; যা সম্পূর্ণ অবৈধ। সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রেখে এটি চলাচল করত।

৩৫ ফুটের লঞ্চ ওঠাতে নির্ভীক : ছোট আকারের লঞ্চটি উদ্ধার করতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে আনা হয়েছিল উদ্ধারকারী যান নির্ভীক। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, ছোট একটি লঞ্চ উদ্ধারের জন্য নির্ভীকের মতো বিশাল আকারের উদ্ধারকারী যান ব্যবহার অর্থহীন। স্থানীয় মোতালেব হোসেন বলেন, বরিশাল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত আসা এবং লঞ্চটি উদ্ধারে ব্যবহার করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রশাসন ইচ্ছা করলে স্থানীয় বিভিন্ন নৌযান ব্যবহার করে এটি উদ্ধার করতে পারত।

নৌবন্দর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের অনুরোধ ও বিআইডাব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নির্ভীককে ঐশী উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা হয়েছে। আর লঞ্চটি যে এত ছোট সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল না। ’

মামলা হয়নি এখনো : ঐশী দুর্ঘটনার ১৯ ঘণ্টার পার হলেও এখন পর্যন্ত থানার পুলিশ কিংবা বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ কোনো মামলা দায়ের করেনি। তবে উভয় সংস্থাই জানিয়েছে, মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। বানারীপাড়া থানার ওসি জিয়াউল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনার পর থেকে থানার প্রায় সব সদস্যই উদ্ধারকাজে পালাক্রমে ঘটনাস্থলে ছিলেন। এখনো থাকতে হচ্ছে। ফলে এখন পর্যন্ত মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দু-এক দিনের মধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হবে।

বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ মেরিন আদালতে ঐশীর মালিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিয়েছে। দুই দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করা হবে।

নৌকা ডুবে নিখোঁজ বেল্লালের মরদেহ উদ্ধার : ঐশী দুর্ঘটনার দিন রাতে বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদী থেকে ঢাকাগামী এমভি মর্নিং সান-৫ লঞ্চের ধাক্কায় নৌকা ডুবে নিখোঁজ যাত্রী বেল্লালের (২৭) মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বিকেল ৪টায় সন্ধ্যা নদীর ব্রাহ্মণকাঠি খালের প্রবেশমুখ থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়। বেল্লাল বানারীপাড়ার খেজুরবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আবু বকর বেপারীর ছেলে।

বানারীপাড়া থানার ওসি জিয়াউল আহসান বলেন, সন্ধ্যা নদীর ব্রাহ্মণকাঠি খালের প্রবেশমুখে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে স্বজনরা বেল্লালের মরদেহ বলে শনাক্ত করে। পরে থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। ঐশী দুর্ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে বানারীপাড়া বন্দরবাজার এলাকা অতিক্রমকালে একটি ট্রলারকে ধাক্কা দেয় মর্নিং সান লঞ্চটি।

এ সময় ট্রলারে থাকা যাত্রীদের মধ্যে পাঁচজন নদীতে পড়ে যায়। চারজন সাঁতরে নদীর তীরে উঠতে পারলেও বেল্লাল নিখোঁজ ছিলেন। ঘটনার পরপরই লঞ্চটি বানারীপাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা মীরের হাটে আটক করা হয়েছিল। পরে যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে কাগজপত্র রেখে লঞ্চটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ওসি জানান।


মন্তব্য