kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ট্রাফিক পুলিশ

রাজপথের শৃঙ্খলায়ও নারী

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রাজপথের শৃঙ্খলায়ও নারী

চট্টগ্রাম মহানগরে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে নারী ট্রাফিক পুলিশ। ছবি : রবি শংকর

কুমিল্লার মেয়ে লাকি দেব এইচএসসি পাসের পর পুলিশ কনস্টেবল পদে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তখনও ভাবতে পারেননি একদিন সড়কে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণ করবেন।

কিন্তু সেই দিনের স্বপ্ন এখন বাস্তবে। চট্টগ্রাম নগরীর জিইসির মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। লাকি স্বপ্ন দেখেন, একদিন তিনি আরো উচ্চ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন।

লাকির মতো সালমা আক্তারও স্বপ্ন দেখেন। সালমা চট্টগ্রাম নগরীর ট্রাফিক পুলিশে কাজ করছেন। সালমা বলছিলেন, ‘সকাল ৬টার মধ্যেই দায়িত্ব পালন শুরু করতে হয়। এ কারণে ৫টা থেকেই প্রস্তুতি শুরু করি। এরপর সহকর্মীদের সঙ্গে কর্মস্থলে পৌঁছি। নিজের দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করছি। স্যারেরাও সহযোগিতা করছেন। প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছি। ’

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত হয়েছেন নারী কনস্টেবল। গত ২০ আগস্ট থেকে নগরীতে ২০ জন নারী ট্রাফিক কনস্টেবল দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। তাঁদের সাফল্যের পর আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই আরো ১৫-২০ জনকে ট্রাফিক বিভাগে বদলি করতে যাচ্ছে নগর পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার  আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ উল হাসান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ক সভায় ট্রাফিক বিভাগে নারী কনস্টেবলদের দায়িত্ব পালন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার পর নতুন করে আরো ১৫-২০ জন নারী কনস্টেবলকে ট্রাফিক বিভাগে বদলির সিদ্ধান্ত হয়। আগামী দুই-তিন কর্মদিবসের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। ’

এক প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উল হাসান কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘তাঁদের দায়িত্ব পালনে সন্তুষ্ট হয়েই নতুন করে ট্রাফিক বিভাগে নারী কনস্টেবল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে নারী সার্জেন্টকেও নগরীর সড়কে দেওয়া যেতে পারে। তবে কিছুটা সময় লাগবে। ’ তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে একজন নারী সার্জেন্ট নগর ট্রাফিক বিভাগে যোগদানের কথা ছিল, তবে সেটা পরে আর হয়নি। ’

নগর ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) সুজায়েত ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী কনস্টেবলরা মাঠপর্যায়ে ভালোভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন। পুরুষ কনস্টেবলদের পাশাপাশি নারী কনস্টেবলরা সাবলীলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। শুরুতে তাঁরা একটু বিড়ম্বনার শিকার হলেও এখন সময়ের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। ’ তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নারী কিংবা পুরুষ কনস্টেবল হিসেবে বিবেচ্য হচ্ছে না। সবাই সরকারি দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করছেন, মানুষকে সেবা দিচ্ছেন। ’

গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর জিইসির মোড়, বহদ্দারহাট, পুনাক মোড়ে নারী সদস্যরা পুরুষ কনস্টেবলদের পাশাপাশি সড়কে দায়িত্ব পালন করছেন। চট্টগ্রামে হাতের ইশারায় সড়ক বন্ধ কিংবা চালু করার ব্যবস্থা আছে। সেই নারী কনস্টেবলরাও হাতের ইশারায় গাড়ি থামাচ্ছেন কিংবা চালানোর অনুমতি দিচ্ছেন। গতকাল জিইসির মোড় এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় নারী কনস্টেবল লাকি দেব ও সালমা আক্তারকে। একাধিক নারী কনস্টেবল জানিয়েছেন, তাঁরা পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ট্রাফিক বিভাগে কাজ করছেন। সকাল থেকে দুপুর ২টা এবং ২টা থেকে রাত পর্যন্ত পৃথক শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন।

নগর ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে গত ২০ আগস্ট ২০ জন নারী কনস্টেবলকে মাঠে নামানো হয়। দুই ট্রাফিক বিভাগে ১০ জন করে ২০ জন এক মাস দায়িত্ব পালনের পর এখন নতুন করে আরো অন্তত ২০ জনকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া নারী কনস্টেবলদের বিষয়ে অতিরিক্ত কমিশনার মাসুদ উল হাসান জানান, নগর পুলিশের নারী কনস্টেবল আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে নতুন করে ১৫-২০ জনকে ট্রাফিক বিভাগে বদলি করা হবে। যাঁরা ট্রাফিক বিভাগে বদলি হয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করবেন তাঁদের পুলিশ বিভাগে চাকরির বয়স পাঁচ-ছয় বছর করে হয়ে যাচ্ছে।

ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নগরীর ট্রাফিক বিভাগ উত্তর ও বন্দর বিভাগে বিভক্ত। একজন উপকমিশনারের নেতৃত্বে একটি বিভাগের কার্যক্রম চলে। দুই বিভাগের দায়িত্ব দেখভাল করেন অতিরিক্ত কমিশনার। মাঠপর্যায়ে মোট কনস্টেবল আছেন ৫৯৩ জন। সার্জেন্ট ১৪২ জন। এর সঙ্গে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে ১৫-২০ জন নারী কনস্টেবল যুক্ত হতে পারেন। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা এবং দুপুর ২টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে নগরীর বহদ্দারহাট, জিইসির মোড়, পুনাক মোড়, নিউ মার্কেট, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, ইপিজেড ও অলংকার মোড়ে নারী কনস্টেবলরা দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন করে বদলি হওয়া নারী কনস্টেবলদের দায়িত্ব এলাকা পরবর্তী সময় বণ্টন করা হবে।

নারী কনস্টেবলদের দায়িত্ব পালন দেখে মুগ্ধ হয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে হঠাৎ দেখি গাড়ি থামানোর সিগন্যাল দিয়েছেন এক নারী কনস্টেবল। শুরুতে মনে হয়েছে, চোখের ভুল। পরে খেয়াল করে দেখি, সত্যিই নারী কনস্টেবল। তাঁরা সাবলীলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আশা করছি, পুরুষ কনস্টেবলদের চেয়েও নারী কনস্টেবলরা শান্ত হবেন।


মন্তব্য